16.2 C
Toronto
রবিবার, জুন ১৬, ২০২৪

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : তেরো

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : তেরো

অবশেষে নির্ধারিত সময়ে আমরা ক্যানাডার টরোন্ট শহরের পিয়ারসন বিমান বন্দরে অবতরণ করলাম। বিমান বন্দরের ইমিগ্রেসান কাউন্টারে আমাদের ল্যান্ডিং ফর্ম ও নানাবিধ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমরা বিমান বন্দর থেকে বের হলাম। সিঙ্গাপুর থেকেই আমরা টরোন্ট ডাউন টাউনে ভ্রমণকারীদের জন্য স্বল্পকালীন একটা এপার্টমেন্ট বুক করে রেখেছিলাম। আমরা সরাসরি সে এপার্টমেন্টে উঠে এলাম। এখানে একদম কাছেই সব খাবার রেষ্টুরেন্ট , গ্রোসারী ষ্টোর , ফার্মেসী এবং সাব ওয়ে ষ্টেশন , গো ষ্টেশন সব কিছুই একদম কাছে। সে ভাবেই খুঁজ খবর নিয়ে আমরা এপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছিয়াম। আমরা এসেই টুকটাক বাজার করে ফেললাম। কিছু খাবার দাবার, চা কফি , দুধ, ডিম আরো বেশ কিছু জিনিষ ফ্রিজ ভরলাম। বাচ্চাদের কখন কি খেতে ইচ্ছে করে এবং আমাদেরও ,তাই নিরাপদে থাকার জন্য বাজারটা শেষ করে ফেললাম।

- Advertisement -

কিন্তু সব চাইতে খারাপ খবর যেটা ছিলো সেটা ক্যানাডায় তখন বেকারত্তের মহরা চলছিলো । কোথাও কোন চাকুরী নেই। অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। যেখানে ফাস্ট ফুড রেষ্টুরেন্ট গুলোতে মোটা মুটি সারা বছরই” হেল্প ওয়ানটেড” লেখা থাকে তখন সে লেখাটাও কোথাও ছিলো না । এতেই বুঝা যাচ্ছিলো ক্যানাডা কতোটা খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে । এসব দেখে আমার স্বামী মনে মনে খুশী এ ভেবে যাক আমাকেতো হারাতে পারছে। আমরা প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গাতে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি । টরোন্ট জু , ওয়ান্ডার ল্যান্ড , হারবার ফ্রন্ট আরো কতো কতো জায়গা আমরা ঘুরলাম। আমি কখনো সাব ওয়ে এবং গো ট্রেন এ উঠিনি । এবার উঠলাম । গো ট্রেন টা হোল এখানকার লোকাল ট্রেন। গো ট্রেনে চড়ে মানুষ গ্রেটার টরোন্টর বিভিন্ন জায়গাতে চলাচল করে। যার যে ষ্টেশনে নামার দরকার তারা সেখানে নেমে যায় । আমরাও কোন সময় গো ট্রেন এ কখনো সাব ওয়ে তে কখনো ট্যাক্সি করে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম । সাথে সাথে চললো আমার স্বামীর হালকা পাতলা ভাবে চাকুরি খুঁজা । তাঁর তো সিঙ্গাপুরে রয়ে গেছে বড় মাপের চাকুরী । কাজেই চাকুরী খুঁজার চাইতে বাচ্চাদের এবং আমাকে টরোন্ট শহরের সব কিছু ঘুরে দেখানো টাই ছিলো তার মহা আনন্দের বিষয় ।
কারো কারো কপালে চাকুরী শব্দটা চিরদিনের মতো বসে থাকে, সেটা আমার স্বামীর কপালেও লিখা ছিলো। ক্যানাডার চাকুরীর এমন কঠিন অবস্থাতেও দুইটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ইন্টারভিও কল আসলো তাঁর জবের জন্য অ্যাপলাই করার জবাবে। একটা কলেজে ও ইন্টার ভিও মিট করার সময় পেলো । সেখানে তার পর পর দুইটা ইন্টার ভিও হোল দুই দলের সাথে। উনারা ওকে পছন্দ করে মুখে মুখে চাকুরীর প্রস্তাব দিলো কিন্তু চাকুরীর অফার পেপার , বেতন এবং বিভিন্ন আনুষ্ঠিকতা জানিয়ে কাগজ তৈরি করতে সাপ্তাহ তিনেক লেগে যাবে বলে কলেজের অফিস থেকে জানালো হোল কিন্তু আমাদের দুই দিন পরই ফিরে যেতে হবে সিঙ্গাপুরে, সে ভাবেই টিকিট করা আছে। তাছাড়া ওর ছুটিও শেষ হয়ে যাবে। কাজেই সিঙ্গাপুরের মেইলিং ঠিকানা ও ফোন নাম্বার দিয়ে আমরা ফিরে আসলাম সিঙ্গাপুরে । আবার নিয়মিত ভাবে সবার কাজ শুরু হয়ে গেলো ।

আমার স্বামীর কাজ প্রদান এবং নিয়োগের পত্র আসলো প্রায় চার সাপ্তাহ পরে সাথে সুযোগ সুবিধা বেতন বিস্তারিত জানালো হোল । চিঠি পেয়ে ওর মনটা মনে হয় একটু খারাপই হোল । চাকুরীর আনুষ্ঠানিক অফার না আসলেই মনে হয় সে খুশী হতো । সিঙ্গাপুরের চাকুরীর চুক্তি অনুযায়ী চাকুরী ছাড়তে চাইলে কমপক্ষে তিনমাস আগে তাদের জানাতে হবে। সে ভাবেই ক্যানাডার অফিসে জানালো হোল ছয় মাসের আগে সে কাজে যোগ দিতে পারবে না কারন আমাদের নিজেদেরতো যাবার প্রস্তুতির ব্যাপার আছে। তখন আমার বুকে শুরু হয়ে গেলো প্রচণ্ড হাহাকার। এই চার বছরে আমাদের কতো জনের সাথে বন্ধুত্ব হোল আন্তরিকতা হোল ,আর কম্পাউন্ডের বন্ধুরাতো হয়ে গেছে আমাদের পরিবারের মতো । অষ্টেলিয়ার মেব্রি আমার কাছে মাছ খাওয়া শিখলো , হাত দিয়ে ভাত খাওয়া শিখলো । তাছাড়া এ্যান , লুতফা, জয়তি, অদিতি ওদের ফেলে আমি যাবো কি করে থাকবো কি করবো ভেবে আমার দুচোখ বেয়ে পানি ঝরলো । কিন্তু সবই গোপনে আমার স্বামী যেনো দেখতে না পায়, কারন সিধান্তটা যে সম্পূর্ণ আমার। আমি আমার বন্ধুদের ও কিছু জানালাম না কেমপাস ও বাইরের বন্ধুদের যতক্ষণ না ও চাকুরী থেকে পদত্যাগ না করে।

অবশেষে সে সময়টাও এসে গেলো । এর মধ্যে আমি বাড়ীর জিনিষ পত্র কমাতে শুরু করে দিয়েছিলাম। ও পদত্যাগ করার পরে সব বন্ধুদের জানালাম আমাদের সিধান্তর কথা। সবাই ভীষণ ভাবে মর্মাহত হোল আমার মতো করেই। আমার বাচ্চাদেরও ভীষণ রকম মন খারাপ হোল তাদের স্কুলের বন্ধুদের ক্যামপাসের বন্ধুদের জন্য যাদের সাথে এই চার বছর প্রতিটি বিকেলে খেলা ধুলা করেছে। আমি যতোটা পারি আমার ছেলে মেয়েদের বুঝাবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলাম ক্যানাডার ইতিবাচক দিক গুলো দেখিয়ে। কিন্তু আমি নিজেই মরে যাচ্ছিলাম এক অপরাধ বোধে । সবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি রওয়ানা হয়েছি আরেক ভীন দেশে। জানি না কতোটুকু মানিয়ে নিতে পারবো এই পশ্চিমা দেশে।

এই চার বছরে যে সমস্থ জিনিষ পত্র কেনা হয়েছিলো প্রয়োজনে এবং সখে সে সকল জিনিষ পানির দামে বিক্রি করে দিলাম। গাড়ীটা বিক্রি করতে পেড়েছিলাম বেশ লাভে। তবে আমার অনেক সখের জিনিষ এবং সিঙ্গাপরের যে সকল জিনিষ আমি সংগ্রহ করেছিলাম সেগুলো শিপিং করে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম সাথে সংসারের কিছু প্রয়োজনীয় জিনিষ পত্র যা কিনা আমার এসেই দরকার হবে। অবশেষে আসার দিন এসে গেলো । বন্ধুদের বিদায়ী ডিনার খাওয়া শুরু হোল । কলেজ থেকে বিদায় সম্ভরধনা দেয়া হোল বন্ধুরা রোজই কেউ না কেউ দেখা করতে আসতো আমাদের সাথে। আসার আগের দিন কম্পাউন্ডের সকল বন্ধুরা আসলো বিদায় জানাতে। আমকে বাচ্চাদের সবাই বুকে জরিয়ে ধরে চোখের পানি ফেললো । আর আমার যেনো চোখের পানি থামতেই চাচ্ছিলই না। আমার মেয়ের চাইনিজ বন্ধু ইটিং । আমার মেয়ের ডাক নাম তিন্নি কিন্তু ওর অফিসিয়াল নাম লাজিনা খান। স্কুলে ও লাজিনা নামেই পরিচিত। ইটিং আমার মেয়ের বেষ্ট বন্ধু । ওরা দুজনের একে অপরকে আর দেখতে পাবে না বলে ওদের মন খারাপ দেখে আমারও অনেক কষ্ট হচ্ছিলো । আমার ছোট ছেলে তাওসিফ ওর সব চাইতে কাছের বন্ধু আমার বন্ধু শোভার ছেলে অজয়। দুই বন্ধুতে গলায় গলায় ভাব। ওরা একসাথে স্কুলে যায় একসাথে আসে। আমাদের কাজের মেয়েটা দুজনকেই স্কুলে আসা নেওয়া করতো । আমার ছেলেটা আমাকে আবার একটা কঠিন আঘাত দিলো , যখন ও আমাকে জিজ্ঞেস করলো , মাম্মি আমিতো আর কখনো অজয়কে দেখতে পাবো না। এটা বলেই আমার ছেলেটা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো । ওর কষ্ট দেখে আমার বুকটা ভেঙ্গে যাচ্ছিলো । একবার আমার ছেলেটা কষ্ট পেয়েছিলো তার ঘুমাবার ক্রিবটা ছেড়ে আসতে হয়েছিলো বলে আর এবার কাঁদছে বন্ধু অজয় কখনো দেখতে পাবে না বলে। আহারে আমি আর কতো কষ্ট দেবো আমার ছেলে মেয়েকে।

পরের দিন আমাদের যাত্রা শুরু। ভোর ছয়টায় আমাদের ভারা করা বিমান বন্দরের গাড়ি আসলো আমাদের নিতে। আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে ভেজা চোখে বের হয়ে গেলাম আমাদের এতো দিনের পরিচিত ভালোবাসার এলাকাটা থেকে। আরো একটা সংসার ভেংগে রওয়ানা হয়েছি আরেক সংসার গড়তে ।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles