19.1 C
Toronto
বৃহস্পতিবার, মে ২৩, ২০২৪

ভুয়া নিয়োগের অর্ধকোটি টাকা নিয়ে উধাও কর্মচারী

ভুয়া নিয়োগের অর্ধকোটি টাকা নিয়ে উধাও কর্মচারী

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) পরিচালকের স্বাক্ষর জাল করে আউটসোর্সিংয়ে বিভিন্ন পদে ভুয়া নিয়োগ দিয়ে অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটিরই কর্মচারীদের একটি চক্র। এ নিয়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের সঙ্গে ১০০ ও ৫০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তিও করেছে চক্রের সদস্যরা। চুক্তি অনুযায়ী টাকা দিয়ে চাকরিতে যোগদান করতে এসে ভুক্তভোগীরা জানতে পারেন, তাদের এসব নিয়োগপত্র ভুয়া। এরপরই বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। এ কাণ্ডের তদন্তে মাঠে নেমেছে আইপিএইচ কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির অফিস সহায়ক ইয়ার হোসেন উজ্জল এ চক্রের হোতা। তিনি ইতোমধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছেন।

- Advertisement -

প্রতারিত হওয়ার বিষয়ে চাকরিপ্রত্যাশীরা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ- ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়া এমন ভয়াবহ জালিয়াতির সুযোগ নেই। এর প্রতিকার না পেলে পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ করার হুমকিও দিয়েছেন তারা। ঘটনা তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ইনস্টিটিউটের পরিচালক।

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, গত বছরের ডিসেম্বরে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিউটের অফিস সহায়ক উজ্জলের মাধ্যমে জানতে পারেন, সরকার আউটসোর্সিংয়ে অস্থায়ীভাবে ল্যাব সহকারী থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী পর্যন্ত বিভিন্ন পদে লোক নেবে। নিয়োগ প্রকাশ্যে নয়, গোপনে হবে বলে তাদের জানান উজ্জল। এ জন্য পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে ৪৮ জনের কাছ থেকে ১ লাখ করে ৪৮ লাখ টাকা নেন। তাদের মধ্যে ৩৩ জনের সঙ্গে ১০০ ও ৫০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তি করে ভুয়া নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র ও যোগদানপত্রও দেওয়া হয়। বাকিদের অপেক্ষায় রাখা হয়।

এরপর গত ১৩ জুন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালকের স্বাক্ষর জাল করে তৈরি নিয়োগপত্র চাকরিপ্রত্যাশীদের হাতে তুলে দেয় চক্রটি। ওই নিয়োগপত্রে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ভুয়া স্মারক নম্বরও যুক্ত করা হয়। তাদের বেতন ধার্য করা হয় ১৮ হাজার ৬১০ টাকা। এমনকি তাদের কাজে যোগদানের নির্দেশনাও দেওয়া হয় ভুয়া নিয়োগপত্রে। এতে চাকরির মেয়াদকাল উল্লেখ করা হয় ২০২৫ সালের ৩ জুন পর্যন্ত।

নিয়োগপত্র অনুযায়ী গত ৩ জুলাই যোগদানের কথা থাকলেও জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে টেকনোলজিস্ট নিয়োগের পরীক্ষা থাকায় ২০ দিন পর, ২৩ জুলাই যোগদানের কথা জানানো হয়। আর এতে করেই বাধে বিপত্তি। গত রবিবার যোগদান করতে গিয়ে চাকরিপ্রত্যাশীরা জানতে পারেন নিয়োগ ভুয়া। সরকার এমন কোনো নিয়োগই দেয়নি। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে মুহূর্তেই সটকে পড়েন প্রধান অভিযুক্ত উজ্জল। তাৎক্ষণিকভাবে ছুটির আবেদনপত্র দিয়ে উধাও হয়ে যান তিনি। এ পর্যন্ত তার খোঁজ পায়নি আইপিএইচ কর্তৃপক্ষ। তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনও বন্ধ।

পরে তাৎক্ষণিকভাবে পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ভুক্তভোগীরা। এতে বলা হয়, নির্দিষ্ট স্মারক উল্লেখ করে দলিলে চুক্তির মাধ্যমে আপনার প্রতিষ্ঠানের অধীনে কর্তব্যরত অফিস সহায়ক উজ্জল হোসেন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন পদে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে দুই বছরের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে (স্ট্যাম্পে লিখিত) নিয়োগ প্রদানের কথা বলে ৩৩ জনের কাছ থেকে এক লাখ টাকা করে নিয়ে বর্তমানে নিখোঁজ। সে তার সকল প্রকার যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে রেখেছে। প্রত্যেককে নিয়োগপত্র ও যোগদানপত্র দিয়েছে। পরে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অফিসিয়াল আইডি কার্ড প্রদান করেছে। এমতাবস্থায় আমাদের অস্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা অথবা আমাদের টাকা ফেরতের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে আমরা এবং আমাদের পরিবার খুবই উপকৃত হবে।

ভুক্তভোগীদের একজন মো. শামীম মিয়া জানান, ‘আউটসোর্সিংয়ে এর আগে আমি আইইডিসিআরে (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান) কর্মরত ছিলাম। গত বছরের শেষের দিকে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। ওই সময় জানতে পারি এখানে (জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট) লোক নেবে। এ জন্য উজ্জলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। আমিসহ আরও অনেকে করেছে। আমরা পরিচালকের সঙ্গে দেখা করার কথা বললে পরিচালক গোপনে এই নিয়োগ দিচ্ছেন বলে জানায় উজ্জল। কিন্তু যোগদান করতে গিয়ে শুনি সব কিছু ভুয়া।’

আরেক ভুক্তভোগী আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘একজন অফিস সহায়কের একার পক্ষে লাখ লাখ টাকা নিয়ে এমন ভুয়া নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়। নিয়োগ ও যোগদানপত্র এমনকি যে আইডি কার্ড দেওয়া হয়েছে সেখানেও পরিচালকের স্বাক্ষর রয়েছে। এমনকি আমাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (পূবালী ব্যাংক) খুলতে বলা হয়। এখন বলছে, এগুলো নাকি ভুয়া। এখন হয় আমাদের টাকা দেবে, নয়তো চাকরি। অভিযোগ দিয়েছি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও দেব। প্রতিকার না পেলে দুর্নীতি দমন কমিশনে যাব।’

এদিকে, সরেজমিনে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির আরও তিন কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা হলেন- পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী ও স্ট্যানোটাইপিস্ট আনোয়ারা বেগম, উচ্চমান সহকারী হারুন অর রশিদ এবং ল্যাব অ্যাটেন্ডেন্ট ফারুক হাওলাদার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘উজ্জলের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কয়েক বছর আগে সরকারি স্যালাইন বিক্রির অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এ জন্য তাকে প্রায় বছরখানেক জেলও খাটতে হয়েছে। কিন্তু বহিষ্কার না করে চতুর্থ থেকে এখন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী করা হয়েছে। ফলে এমন সাহস পেয়েছে।’

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা অভিযোগ দেওয়ার আগ পর্যন্ত এ ব্যাপারে আমার কিছুই জানা ছিল না। এ ঘটনায় আমরা অত্যন্ত বিব্রত। জনস্বাস্থ্যের মতো প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনায় সত্যিই দুঃখজনক। এখন তার খোঁজ মিলছে না। শুনেছি এর আগেও অনিয়মের দায়ে তাকে শাস্তি পেতে হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেইনি। নিয়োগপত্রে যে স্মারক ব্যবহার করা হয়েছে সেটিও ভুয়া। এমনকি আমার স্বাক্ষর পর্যন্ত জাল করেছে। ইতোমধ্যে তদন্তে নেমেছি। প্রতিষ্ঠানের আরও কেউ জড়িত কিনা খতিয়ে দেখছি। জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বনানী থানায় জানানো হয়েছে।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. রাশিদা সুলতানা বলেন, ‘বিষয়টি শুনে আশ্চর্য হচ্ছি, কীভাবে এটি হলো! আমরা এখনো এ ব্যাপারে কিছু জানি না। এটি খুবই ভয়াবহ খবর। খোঁজ নিয়ে জানাব।’

সূত্র : আমাদের সময়

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles