24.5 C
Toronto
শুক্রবার, জুলাই ১৯, ২০২৪

‘আমি মৃত্যুকে নয়, জীবনকে জয় করতে চেয়েছি’

‘আমি মৃত্যুকে নয়, জীবনকে জয় করতে চেয়েছি’
রোকসানা আফরোজ

প্রতিদিন একটু একটু করে মৃত্যু, শারীরিক কষ্ট, ক্যান্সার আবার ফেরত আসার ভয়, বদলে যাওয়া নিজের শরীর, সম্পর্কের টানা পোড়ন, অপরাধবোধ, একাকীত্ব, নিদ্রাহীন রাত। গল্পগুলো মোটামুটি সবার একই রকম ক্যান্সার যোদ্ধা কিংবা পরিবারের। ক্যান্সার কখনো একটা মানুষকে আক্রমণ করে না, করে একটি পুরো পরিবারকে।

২০১৭ ফেব্রুয়ারিতে আমার চতুর্থ পর্যায়ে ওভারিয়ান ক্যান্সার ধরা পড়ে। একজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী হওয়াতে দেশে-বিদেশে অনেক সুযোগ-সুবিধা আমি পেয়েছি সেজন্য আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ কিন্তু হিমশীতল ফাইভ স্টার হোটেলের মতো হাসপাতলে শুয়ে মাথায় চিন্তা ছিল ব্যয়বহুল এই চিকিৎসা কিভাবে সামাল দিব, আমাদের তিনজন সন্তানের কি হবে?

- Advertisement -

কেমোথেরাপি, সার্জারি সবার মতো আমিও পার করলাম দাঁতে দাঁত চেপে, তারপর প্রতিমুহূর্তে ভয় আবার কখন ফেরত আসে।

দেড়টা বছর নিজেকে একটু একটু করে তৈরি করেছি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, শরীর চর্চা, ইতিবাচক চিন্তা, তবুও দ্বিতীয়বার ক্যান্সার ফেরত আসলো, তবে আমি আরও শক্তভাবে প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম।

আমি মেনে নিয়েছিলাম পরিস্থিতি। আমি ঠিক তখনই বুঝেছি জীবন অনেক মূল্যবান। প্রতিটা দিন আমি উপভোগ করার চেষ্টা করেছি পরিবারকে নিয়ে বন্ধু-বান্ধবকে নিয়ে। গান, কবিতা আমার জীবনে অনেক প্রভাব রাখে তেমনি ইতিবাচক চিন্তা ইন্টারনেটে খুঁজে ফিরতাম সব বিজয়ের কাহিনী। আমি অনেক বই পড়া পড়তাম, টবে ফুলের গাছে ফুল ফোটান আমাকে অনেক সাহায্য করেছে নিজেকে ভালো রাখতে। এটুকু শিখেছি নিজেকে ভালবাসতে হয় আগে, না হলে অন্যকে দেওয়ার মতো কিছু থাকে না।

আমি প্রচণ্ড বিশ্বাসী মানুষ। বিধাতার উপরে অসীম বিশ্বাস আমাকে সব সময় শান্ত রাখে। মনোবিজ্ঞান আমাকে ভীষণভাবে টানা শুরু করল, মানুষের মন ভীষণ শক্তিশালী, আমি নিজেকে যা ভাবি আসলে আমি তাই। আমি সব সময় ভাবতাম আমাকে সুস্থ হতেই হবে এবং আমি হব। আমি আমার সীমাবদ্ধতাগুলোও জানতাম, দুর্বল শরীরটাকে সুস্থ করার জন্য অনেক পরিবর্তন আনি আমি জীবনে। খেয়াল করে দেখলাম ক্যান্সার রোগীরা একটা অপরাধবোধে ভুগে এর কারণ সামাজিকতা! এখনো ভাবা হয় ক্যান্সার ছোঁয়াচে, পাপের ফল কিংবা বংশগত। যখন কেউ বলতো তোমার মেয়েদের তো ক্যান্সারের সম্ভাবনা বেড়ে গেল, সাথে সাথে আমি অপরাধবোধে কুঁকড়ে যেতাম। আমার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া ছেলে যখন স্কুল থেকে রাগ করে ফিরে এসে বলতো তুমি কি সিগারেট খাও? না হলে কেন ক্যান্সার হল? তাকে বোঝাতে হত সিগারেট খেলেই শুধু ক্যান্সার হয় না, এখন খাদ্যে ভেজাল, পরিবেশ দূষণ এসব ক্যান্সারসহ জটিল রোগের কারণ। চুল-ভ্রু ছাড়া ওজন বেড়ে যাওয়া রেডিয়েশনে পুড়ে যাওয়া তামাটে ত্বক, আয়নায় নিজের অচেনা প্রতিবিম্ব, অসহায় আমি ভিতরে ভিতরে ভেঙে চুরে গেছি বারবার। নিজেকে নিজেই বুঝিয়ে চোখ মুছে আবার উঠে দাঁড়িয়েছি।

শিক্ষকতা আমার পেশা ছিল, ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে আমার কারবার কিন্তু শরীরের জন্য আর চাকরিতে ফেরা হয়নি। নিজের জগৎটা হারিয়ে গেল, এমন বেঁচে থাকা আমি কখনো চাইনি। আমার কাছে জীবিত থাকা আর প্রাণ ভরে বাঁচার মধ্যে অনেক পার্থক্য।

যখন ডাক্তার দেখাতে যাই অপেক্ষাগারে সব সময় পাশের মানুষটির সাথে আমি নিজে যেচে কথা বলি, একটু একটু করে গল্প হয়। যে কথাগুলো হতো সে কখনই কোনো ডাক্তারের সাথে বলে না, যেমন চুলগুলো কি আবার উঠবে? অপারেশনের পরে দাম্পত্য জীবন কি আগের মত থাকে? এতো টাকার ওষুধ খাই এতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা এর থেকে মরে যাওয়া ভালো। এই কথাগুলো প্রায় সবাই বলে। কোন কেমোথেরাপি, সার্জারি রেডিওথেরাপ কি এই কষ্ট দূর করতে পারে? পারেনা।

আমি একজন ক্যান্সার কাউন্সিলর হতে চাই ঠিক করে ফেললাম। করোনার সময়টায় অনলাইনে ছয় মাসের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনা করলাম, ক্যান্সার কাউন্সিলিং এর উপর ছোট ছোট কোর্স করলাম।

শরীর এবং মন নিয়েই আমরা মানুষ, মনের যে জটিলতা সৃষ্টি হয় চিকিৎসার সময়, চিকিৎসা পরবর্তীকালে তার খবর কেউ রাখে না। আমরা অত্যন্ত নিয়ম মেনে শরীরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি, ডাক্তার যেভাবে বলেন সেভাবে। শারীরিক মানসিক, সামাজিক, পারিবারিক, কর্মক্ষেত্র সব ক্ষেত্রে চাপ নিয়ে একজন ক্যান্সার যোদ্ধা ও পরিবার কি জীবন যাপন করছে সেটা কেউ বুঝতে পারে না। কেমোথেরাপি ক্যান্সার সেল ধ্বংস করার সাথে সাথে ধ্বংস করে ফেলে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ক্যান্সার চিকিৎসায় অংকোলজির সাথে সাইকোলজি কে ভীষণ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে রোগীর নিরাময়ের সম্ভাবনা বেড়ে যায় বহুগুণ। জীবনের মান বৃদ্ধি করাই এর উদ্দেশ্য। কেয়ার গিভার এর মানসিক চাপ কোনো অবস্থাতেই আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে কম নয়। ক্যান্সার একজন মানুষের জীবন অনেকটুকুই বদলে ফেলে, তাকে বোঝার জন্য কেয়ারগিভারের ও কাউন্সিলিং দরকার হয়।

কাউন্সিলিং বলতে যে ভুল ধারণা আছে তা হলো কাউন্সিলর ক্যান্সার যোদ্ধা কিংবা কেয়ার গিভারকে উপদেশ দিবেন, কিছু সহানুভূতির বাক্য শোনাবেন। কথাটা ভুল। প্রত্যেক মানুষের জীবনের একটা গল্প আছে, সেই গল্পটা জানাই একজন কাউন্সিলরের কাজ।

ক্যান্সার সময় দেয়, এই সময়টা কিভাবে কাজে লাগানো যাবে সেটা ভেবে দেখা দরকার। বাস্তবসম্মত আশা মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে। চিকিৎসায় এবং পরবর্তীকালে যে নেতিবাচক অনুভূতিগুলো তৈরি হয় যেমন রাগ, বিষন্নতা, হতাশা, একাকীত্ব, অপরাধবোধ এমন কি আত্মহত্যার চিন্তা পর্যন্ত আসে সেগুলো দূর করতে না পারলে জীবনটা বিভীষিকাময় হয়ে যায়! কোন ক্যান্সারের ওষুধ কিংবা কেমো থেরাপি দিয়ে এই অনুভূতিগুলো সামলানো যায় না, দরকার হয় বাড়িয়ে দেওয়া একটি হাত, যার কাছে মনের সব কিছু খুলে বলা যায়। এরপর কী কাউন্সিলর তাকে সব সমস্যার সমাধান করে দেয়?

না, রাস্তা দেখাতে সাহায্য করে, নিজের ভিতর ঘুমিয়ে থাকা শক্তিটাকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে, মটিভেটেড থাকা, জীবনের পরিবর্তনগুলো মেনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। অনকোলজির মতো কাউন্সিলরকেও প্রটোকল তৈরি করতে হয় আলাদা আলাদা। অবস্থা, পরিবেশ, পরিস্থিতি বুঝে একেক জনের সাথে একেকভাবে কথা বলতে হয়। আমাদের ক্যান্সার যোদ্ধাদের কষ্টের রংগুলো অনেকটাই নীল, সুতা ছিড়ে যাওয়া ঘুড়ির মত আমরা দিশেহারা। এদের পাশে দাঁড়ানোই আমার কাজ। বিভিন্ন গবেষণায় সাইকোঅঙ্কোলোজির কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ ক্যান্সারের মতো জটিল রোগকে কাবু করতে শুধু অংকলজি নয় সঙ্গে দরকার মানসিক স্বাস্থ্য সেবা। কেমোথেরাপি, রেডিও থেরাপি সাথে সাথে ইমেজ থেরাপি, ইতিবাচক চিন্তা, রিলাক্সেশন, মেডিটেশন চর্চা সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি দল হিসেবে কাজ করতে হবে। আমার কাজটিকে এখনো ঠিক গুরুত্বের সাথে দেখা হয় না আমি জানি, আমি এও জানি এটি শুধু সময়ের ব্যাপার। সাইকোলজিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে কিছুদিনের মধ্যেই। না হলে শুধু শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে জীবিত থাকতে হবে প্রাণ ভরে বাঁচা আর হবে না।

প্রত্যেকটা মানুষের বেঁচে থাকার একটা উদ্দেশ্য থাকা দরকার, তাহলেই জীবনটা গতিময় হয়।ক্যান্সারের পরের জীবনটা আমার কাছে সাপলুডু খেলার মতই অনিশ্চিত। তাই আমার কাছে আজকের দিনটাই গুরুত্বপূর্ণ, জীবন যে এত মূল্যবান এটা আমি বুঝেছি ক্যান্সার হওয়ার পর।

ক্যান্সার কেয়ার কমিউনিটি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমি অনেকের কাছেই পৌঁছতে পারছি, একা একা এত দূর আসা কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। আমি আমার জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছি। আমার সাথে কথা বলার পর যখন কেউ বলে আমার অনেক ভালো লাগছে আমিও জীবনটা উপভোগ করব, ভালো লাগে। মাঝরাতে যখন কোনো মেসেজ আসে আমার পরবর্তী কেমোথেরাপির সময় আপনি কী আমার পাশে বসে থাকবেন, মনে হয় আমি বেঁচে আছি শুধু জীবিত না। আমার সঙ্গে গল্প করার পরে কেউ যখন ধুলো ঝেড়ে তার রং তুলি নিয়ে আবার ছবি আঁকা শুরু করে আমার মনে হয় নতুন করে জন্ম হলো আমার।

স্বপ্ন আমাকে এটুকু নিয়ে এসেছে। আমি বিশ্বাস করি অবশ্যই কিছুদিনের মধ্যেই ক্যান্সার চিকিৎসায় কাউন্সিলিং অংকুলোজির সঙ্গে একটি দল হয়ে কাজ করবে। আমি মৃত্যুকে জয় করতে চাইনি আমি জীবনকে জয় করতে চেয়েছি। মৃত্যু অবধারিত আমি জানি, একটি রিলে রেসের মত আমি দৌঁড়ে যাচ্ছি, আমি যেটুকু যেয়ে থেমে যাব ঠিক সেখান থেকে অন্য কেউ একজন শুরু করবে এই স্বপ্নটুকু আছে বলেই আমার কাছে জীবন সুন্দর। জীবন আমার কাছে রহস্য উপন্যাসের মতই রোমাঞ্চকর, এর প্রতি বাঁকে বাঁকে বিস্ময়।

রোকসানা আফরোজ
সার্ভাইবার ও ক্যান্সার কাউন্সিলর
ক্যান্সার কেয়ার কমউিনিটি, বাংলাদেশ

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles