-5.5 C
Toronto
রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৪

তিন বাংলা’র পক্ষে উৎসব

তিন বাংলা’র পক্ষে উৎসব
শহীদ রুমী এই ডোমারেরই সন্তান

 

শহীদজননী জাহানারা ইমামের শহীদ পুত্র রুমীর এই মার্চে জন্মদিন উৎসব অনুষ্ঠানে নীলফামারীর ডোমার জেলায় যেতে হলো। শহীদ রুমী এই ডোমারেরই সন্তান। নিউ ইয়র্ক প্রবাসী কবি, ছড়াকার ও কথক সালেম সলেরী ও ডোমরের সন্তান। তার উদ্যোগেই ‘তিন বাংলা’র পক্ষে এই উৎসব অনুষ্ঠান। ঢাকা থেকে তিনি আমাকে এবং নিউ ইয়র্ক বাংলা কমিউনিটি নেত্রী-অতীতে অনেক সফল ফোবানার যোগ্য কনভেনর নার্গিস আহমেদ,বিরাঙ্গনা নিয়ে গবেষক, বাংলা একাডেমি পদক প্রাপ্ত লেখিকা সুরমা জহিদ ও তার স্বামী ড,জাহিদ হোসেনকে নোভো এয়ারে উড়িয়ে আনলেন কবি সালেম সুলেরী সাইদপুর বিমান বন্দরে। পৃথিবীর কত শহরের কত এয়ারপোর্টে নেমেছি কিন্তু সাইদপুরে জীবনে এই প্রথম নামলাম আমি । ঢাকার শাহ জালালের তুলনায় খুবই পরিস্কার পরিছন্ন সাইদপুর এয়ারপোর্ট,সেবা এমন যে পৃথিবীর আর কোথাও পাইনি এমন! হিসু করতে গেলে ঠিক পেছনে পিঠের কাছে এসে টিসু নিয়ে দাঁড়ায় বিমান বন্দরের সেবা কর্মী।

- Advertisement -

নীলফামারীর মাননীয় মেয়র দেওয়ান কামাল বিমান বন্দরে এসেছিলেন। অভ্যর্থনা জানালেন শহীদ রুমী জন্মদিন অনুষ্ঠান উদ্বোধন ঘোষণা করলেন। তখনই তিনি জরুরী কাজে ঢাকা চলে যাচ্ছেন বলে এই ব্যবস্থা। কলকাতা থেকে আসবেন কন্ঠশিল্পী সুপর্ণা বন্দোপাধ্যায়,শিলিগুড়ি থেকে কবি পারুল কর্মকার দিল্লী থেকে কবি সুলেখা সরকার। সাইদপুর বিমান বন্দর থেকে দেড় ঘন্টা ৯ সিটেড ভ্যানে নীলফামারীর দিকে ছুটলো আমাদর নিয়ে। দ্রুতগতিতে পিছিয়ে যাওয়া বাইরের দৃশ্য। বাতাসে দোল খওয়া বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত কতদিন পরে দেখলাম। মফস্বলীয় রাস্তর পাশে বাজার-হাট দেখতে ভলো লাগছিলো। এসে থামলো ভ্যানটি নীলফামরী জনপ্রিয় চেয়রম্যন জয়নাল আবেদীনের বাড়ির সামনে।

দুপুরে ২৫ পদের খাদ্য পাওয়া মনে রাখার মত বাাপার। সুরমা জাহিদ তার নিজের লেখা ১৫টি বই মেয়রের হাতে জেলা পাঠাগারের জন্যে উপহার দিলেন। অন্ধকার ভোরে কলকাতা থেকে বেরিয়ে বেনাপোল,যোশোর হয়ে ট্রেন ধরে নীলফামারী রেল স্টেশানে এসে নামলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় মৈত্রী বাহীনীর কমান্ডার কন্যা নিজেও নামী কন্ঠশিল্পী সুপর্ণা বন্দোপাধ্যায়। তাকে তুলে নিয়ে সুলেরী তিস্তা ব্যারেজ দেখাতে দোয়ানী,হাতিবান্ধা,লালমুনিরহাটে দিকে সবাইকে নিয়ে ছুটলেন। ততক্ষণে রাত হয়ে গেছে। ভালোই হলো অন্ধকারে পানিশূ্ণ্য তিস্তা ব্যারেজ দেখা থেকে বাঁচলাম। তবে নামটি ভুলে গেলাম ব্যারেজের অন্য পাড়ে বেশ বড় সাজানো গোছানো রেস্টুরেন্টে ময়দার আবরণ দেয়া ফ্রেঞ্চফ্রাইয়ের সাথে কাপোচিনো কফি কিন্তু দারুণ লাগলো। ব্যারেজ থেকে ঘন্টা খানেক গর্তে ভরপুর রাস্তায় দোল খেয়ে ডোমারে ফিরতেই দেখি এই রাতে সালেম সুলেরী আর আমাদের জন্যে অপেক্ষারত জনা ত্রিশ মানুষ আর সাংবাদিক অপেক্ষারত! সংবাদ সম্মেলনের জন্যে। কবি সালেম সুলেরীকে আমি চিনি গত ত্রিশ বছর ধরে। সামনে মানুষ পেলে কন্ঠ বদলে যায় হাত নেড়ে কথা শুরু করলে থামানো তাকে মুস্কিল,কবি ছাড়া রাজনীতিতে সাফল্য পেতেন যদি বাংলাদেশী পলেটিক্স করতেন। সুলেরীর পৈত্রিক হাজী সোলেমান সাহেবের তিনতলা বাড়িতে পেটপুরে খেয়ে নীলফামারী স্পেশাল গুড়ের সন্দশ আর দই মুখে দিয়ে বেঘোর ঘুম। পরদিন শুক্রবার ভোরে উঠে হাঁটতে বেরুলাম। ৪০ বছর ধরে ডোমারের মেয়র দানু সাহেব বিশাল মাঠের এক ধারে বিরাট দালান করে দিয়েছেন ডোমার মহিলা কলেজর জন্যে। অনেকদিন পর দেখলাম মফস্বল জেলা শহরের এমন স্নিগ্ধ ভোর। নিঃস্তব্ধতার মধ্যে একটানা ঘুঘু আর কোকিলের ডাক। হঠাৎ দূরে দেখি পথের পাঁচালীর ট্রেন যেন নতুন রঙের জামা গায়ে হেলেদুলে যাচ্ছে। হেঁটে ফ্রীহেন্ড ইয়োগা সেরে ফিরতে দেখি বাড়ির উঠোনে গাছ গাছালীর নিচে জনা বিশেক বীরাঙ্গনা বসে আছেন।

বয়সের ভার,পেট ভরে দুই বেলা খেতে না পাওয়ায় অপুস্টি আর অসুখ বসুখে বিমর্ষ দেখাচ্ছে সবাইকে । সুরমা জাহিদ তাদের সাক্ষাৎকার নেবেন বলে ডাকা। আমরা গেলাম নীলফামারী ইপিজেড জোনে সেখানে ছোট বড় অনেক কারখানায় কিশোরী তরুণী মেয়েরা ঢাকার গার্মেন্টসের মতই কাজ করে তবে কাপড় তৈরীর নয়,গোটা ইউরোপের বড় দেশ গুলোর জন্যে তারা পাতলা চামড়ায় এক-একটি করে আলগা চুল বুনে পরচুলা বা উইগ তৈরী করে। পরিশ্রমর কাজ এখানে শেষ হলে সেগুলো বাক্স ভর্তি হয়ে ঢাকা উত্তরায় যায়। সেখানে ফাইলাল প্রসেস হয়ে ইউরোপে চলে যায়। প্যারিসের কোনো ফ্যাশান শোতে এই ইউগ পরে কোন মডেল কোমর দুলিয়ে হয়তো হাঁটেন। ঢাকার গার্মেন্টসের মেয়েদের মত এরা অতটা স্মার্ট নয়। আমাদর দেখে কেউ ঘোমটা নামালো,কেউ মাথা গুঁজে বসলো। কবি সুলেখা সরকার তাদের সহজ করতে চুল বুনতে শিখতে চাইলেন।তাও তারা ফ্রি হলোনা। কলকাতার সুপর্ণা বন্দোপাধ্যায় যখন তাদের জন্যে গান গাইলেন তখন সবাই খুশি ,সবাই সহজ হয়ে গেলো। দুপুরে সুলেরীর বাড়িতে ফিরে দেখি অবাঞ্চিত কাকের মত বৃদ্ধ বিরাঙ্গনারা বসে আছেন। হাতে একটি করে কাচচী বিরানীর প্যাকেট। এই প্যাকেটই তাদের আজ যেন বড় একটা প্রাপ্তী। প্যাকেটে বিরানীও ঢাকার মত উপচে পড়া নয়। অনেকেই পুরোটা খান নাই। অর্ধেক রেখেছন রাতে খাবেন বলে। একজন রেখেছেন অর্ধেক তার নাতীর জন্যে। জিজ্ঞেস করলাম নাতীর নাম কি? তিনি বল্লেন – হুলা। আমি বল্লাম – এ আবার কেমন নাম? তিনি বল্লেন – হেই মানুষ নয়,বিলাই! আমারেতো কেউ বিয়া করেনি নাতী হইবো ক্যামনে! আরেকজন বলে উঠলো- হের একটা মাইয়া হয়ে ছিলো।দেড় হপ্তার পর ক্যারা যেন বিদেশে বেইচা দিছে। আরেকজনের বেশ জ্বর।

জিজ্ঞেস করলাম – ডাক্তার দেখান নাই?জ্বর বাবা আহে-যায় অনেক দিন। দশ ট্যাহা দিয়া একটা নাফা ট্যাবলেট কিন্না খাইলে পরদিন খাইবার ট্যাহায় টান পড়ে। আমি আর তাদের কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হারালাম।এনারা অনুষ্ঠান শেষ পর্যন্ত থাকবেন। কোন এক ফাঁকে গলাবাজীতে সবাই কিছুটা ক্লান্ত হলে এঁনাদের মঞ্চে ডেকে উত্তরীয় পরিয়ে সন্মান জানানো হবে। উত্তরীয়র কাপড় এক ফালি বড়ই চিকন, আরো একটু বড় হলে হলে যদি গায়র চাদর সমান হতো তাইলে নীলফামারীর শীতে কাজে লগতো।
আশির দশকের শুরুর দিকে এ্যালিফ্যান্ট রোড বাটার মোড় থেকে চার কদম ভোজ্য তেলের গলিতে ঢুকলে ডাক্তার বন্ধু রনজু-নসরিন আর চার কদম গাউসিয়ার দিকে পা বাড়িয়ে বাঁয়ে গলিতে ঢুকলে জাহানারা ইমমের বাসা ছিলো। ওদিকে গেলে এই দুই জায়গয় তখন আমি যেতম। জাহানারা ইমামের বাসয় যাওয়ার আরেকটি কারণ ছিলো কলকাতর নামী আবৃতিকার কন্ঠশিল্পীরা আসতেন।তাদের দেখতেও যেতাম। দুপুরে অনেকদিন গিয়েছি এই ভেবে যে হয়তো ভাত খেতে বলেন কিন্তু তিনি শুধু তোস্ট বিস্কুট আর চা দিতেন সব সময় খেতে। যা পাই তাই খাই অবস্থা তখন আমার।তাই চায়ে চুবিয়ে তোস্ট বিস্কুট খেয়েই শান্ত থাকতাম। তখনো তিনি শহীদ জননী হিসেবে খ্যাতিমান হননি।

বলতেন মাঝে মাঝে রুমীর কথা। কখনো গুরত্বদিয়ে শুনি নাই। তখন মনে হতো এই কিছু দিনে আমিওতো মরে যাবো,এসব শুনে আর কি লাভ। এখন মনে হয় আসলেইতো তিনি যে রুমীর বয়সের কথা বলতেন,ঠিকইতো!মায়ের কাছে থেকে হরিয়ে যাওয়া মাত্র ২১ বছরের রুমীর তখন। আমেরিকার এলিনয় ইউনিভর্সিটিতে ভর্তি হয়েও গেলোনা!দেশ ঘাতক মুক্ত করতে যুদ্ধের ট্রেনং নিতে গেলো! যদি আমেরিকা চলে যেতো,বেঁচে থেকে বড় বিদ্যান হয়ে আমেরিকায় বসবাস করতো তাহলে কি আজ আমরা রুমীর কথা বলতাম! জাহানারা ইমাম কি শহীদ জননী হতেন! রুমী সীমান্ত পার হয়ে যুদ্ধের ট্রেনং ঠিকই নিলো কিন্তু ওপার থেকে এসে হামলা করে এ্যাকশান করে আবার ফিরে যেতে পারতো! তা কিন্তু রুমী করলেন না। ঢাকা শহরে এই ভয়ংকর হানাদার বাহীনীর মধ্যে থেকে গেরিলা আক্রমন করাটাই বেছে নিলেন। একটি দুইটি করে অতর্কিত এ্যাকশানে শেষ করতে লাগলেন বেজন্মাদের। যেবার ছয়জনকে ঝাঁজরা করে দিলেন একাই তখন তারা রুমীর খোঁজে মরিয়া হয়ে উঠলো। আর্মি গোয়েন্দা কাজে নামলো মীরজাফর বেঙ্গলের সংখ্যাওতো কম ছিলোনা খবর জোগাড় করতে! শেষ পর্যন্ত রুমীর খোঁজ তারা পেয়ে গেলো। বাবা ভাই সহ ধরে নিয়ে গেলো তাকে। অর্ধমৃত অবস্থায় ভাইকে ছেড়ে দিলেও রুমীকে ছাড়লোন।

বাবা অত্যাচার সয়ে মারা গেলেন। শহীদজননী আর কোনো খবর রুমীর পাননি। বাংলার বাতাসে রুমী ধ্বনি বাতাসে মিশে গেলো। দেশ স্বাধীনের পর অনেক তথ্য নিয়েছেন,খবর নিয়েছেন। তা জোড়া দিয়ে বের করতে চেষ্টা করেছন প্রিয় সন্তানের কিছু হদিস যদি পাওয়া যায়! যতটুকু বুঝলেন তিনি তাতে ধারণা হয় রুমীকে অকথ্য অত্যাচারের পরও যখন মুখ খোলাতে পারেনি তখন মেরে টুকরো করে নদীতে ফেলে দিয়েছে।ভাসমান টুকরো কিছুটা পঁচে উঠতে মাছেরা ঠুকরে খেয়ে ফেলেছে।

এরপর থেকে শহীদজননী জাহানারা ইমাম মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত মুখে মাছ তুলেননি। আমি কিছুই করতে না পারলেও সলেম সুলেরী করেছেন।আমাকে নিয়ে গিয়ে ঝাড়ুর বাড়ি মারার জাগা্য় কী সুন্দর একটি শহীদ রুমী স্মৃতি সন্মাননা ক্রেস্ট দিয়েছে। আমার আন্তরিক কামনা রইলো আগামী বছর থকে শহীদ রুমীর জন্মদিন প্রতি বছর ডোমারেই শুধু নয় গোটা বাংলাদেশে যদি আয়োজন হতো,মন ভরে যেতো।

স্কারবোরো, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles