-3.5 C
Toronto
সোমবার, জানুয়ারী ৩০, ২০২৩

ব্যাংকের টাকা মেরে দিতে দেউলিয়া হতে চান তারা

ব্যাংকের টাকা মেরে দিতে দেউলিয়া হতে চান তারা

একটি মামলার আর্জিতে বলা হয়েছে, বাদীগণ অর্থের অভাবে বর্তমানে একবেলা খান তো দুবেলা না খেয়ে থাকেন। আরেকটি মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, অর্থের অভাবে বাদীর ছেলেরা টিউশনি করে লেখাপড়া চালায়। ব্যাংকের টাকা মেরে দিতে এভাবে নিজেদের ফতুর দেখিয়ে দেউলিয়া ঘোষণার প্রবণতা বাড়ছে ঋণখেলাপিদের মধ্যে। অথচ তাদের বেশিরভাগই দেশে-বিদেশে বিলাসী জীবনযাপন করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকের টাকা ফেরত না দিতেই এমন কৌশল নিচ্ছেন ঋণখেলাপিরা। তারা ঋণের টাকা বিদেশে পাচার করেছেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

- Advertisement -

চলতি বছর অন্তত ২৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণার জন্য আদালতে আবেদন করেছেন। এ তালিকায় প্রবাসী ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাবেক চেম্বার সভাপতি, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকও রয়েছেন। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে দেশের ১৮টি ব্যাংক, দুটি এনজিও ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা রয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এ পাওনার বিপরীতে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেরই গচ্ছিত তেমন কোনো সম্পদ নেই। ফলে পাওনা আদায়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে।

বিদ্যমান আইনে সাধারণভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বা অন্য কোনো কারণে কারও ঋণ পরিশোধের মতো সক্ষমতা না থাকলে দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। তবে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করা বেশিরভাগ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানই প্রকৃত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নয় বলে জানা গেছে। তা ছাড়া কয়েকটি ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে অর্থঋণ আদালতে মামলা চলমান থাকার পরও তারা নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ঋণখেলাপিদের ব্যাংকের টাকা ফেরত না দেওয়ার এটাও একটা উপায়। কারণ নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে দিলে ব্যাংকের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রশ্ন থাকবে না। তিনি বলেন, আমাদের দেশে যারা খেলাপি, তাদের বেশিরভাগই ইচ্ছাকৃত খেলাপি। এর দায় শুধু ঋণখেলাপিদের নয়, ব্যাংকেরও। কারণ ব্যাংকের পর্ষদ ও কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ও যোগসাজশ ছাড়া ব্যাংক থেকে টাকা বের করে নেওয়া সম্ভব নয়।

দেউলিয়াবিষয়ক আদালতে যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ক্লাসিক সাপ্লাইজ-১, ক্লাসিক সাপ্লাইজ-২ এবং কোমো অ্যাপারেলস। তাদের কাছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ও বেসরকারি খাতের মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পাওনা ৩৩৫ কোটি ২৪ লাখ ৪৩ হাজার ১৭৩ টাকা। এসব দেনার বিপরীতে সোনালী বাংকে জামানত হিসেবে দেওয়া আছে শুধু ঢাকার মিরপুর ১২ নম্বরে ৫৭১ শতাংশ জমির ওপর একটি পুরাতন ৯ তলা জরাজীর্ণ ভবন। ব্যবসা গুটিয়ে প্রতিষ্ঠান তিনটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদ থাইল্যান্ডে আছেন বলে জানা গেছে। ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান তিনটির পরিচালক হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এএইচএম রায়হান শরীফ। ২০১৯ সালে জাতীয় সংসদে প্রকাশিত ঋণখেলাপির তালিকায় এ তিন প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল।

এ টাকা আদায়ের জন্য সোনালী ব্যাংক ঢাকার ১ নম্বর অর্থঋণ আদালতে মামলা করে। ওই মামলায় ২০১৯ সালের ৬ ডিসেম্বর আদালত রায় দেওয়ার পর তারা টাকা আদায়ের প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য ২০২২ সালে এসে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করতে ঢাকার দেউলিয়াবিষয়ক আদালতে তিনটি মামলা করেন। যার মামলা নম্বর ০৫/২০২২, ০৬/২০২২ ও ০৬/২০২২।

দেউলিয়া ঘোষণার জন্য আবেদন করা বাকি ২২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ১৩৬ কোটি ৫৪ লাখ ৪ হাজার টাকা পাবে বিভিন্ন ব্যাংক। এসব দেনার বিপরীতে অধিকাংশ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পদ নেই বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তারা নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণার আবেদন করেছেন।

ঢাকার দেউলিয়াবিষয়ক আদালতের বর্তমান অতিরিক্ত জেলা জজ সৈয়দা কানিজ কামরুন নাহার। ১৯৯৮ সাল থেকে শুরু হওয়া ওই আদালতে চলতি বছরের ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ৫৯৯টি মামলা হয়েছে। বর্তমানে আদালতটিতে ১২৬টি মামলা বিচারাধীন। বাকি মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হয়েছে।

১৯৯৭ সালের দেউলিয়া আইনের ১০ ধারা মোতাবেক ব্যাংকের দেনা পরিশোধের অক্ষমতার কথা উল্লেখ করে দেনাদারকে দেউলিয়া ঘোষণা করার কথা বলা আছে। দেউলিয়া মামলা সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলার আইনজীবী মো. আনোয়ার হোসেন মিঠু বলেন, দেউলিয়া আদালতে মামলার জন্য দেনাদার ও পাওনাদার উভয়ই আসতে পারে। দেনাদার সরাসরি দেউলিয়া আদালতে মামলা করতে পারেন। আর পাওনাদারকে অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে আসতে হয়। দেউলিয়া আদালতে দেখা যাচ্ছে, দেনাদার নিজেই পাওনা থেকে বাঁচার জন্য মামলা করতে আসছেন।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা পরিচালনাকারী একাধিক ব্যাংকে যোগাযোগ করলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দেউলিয়া আদালতে আবেদন করা মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ক্লাসিক সাপ্লাইজ-১, ক্লাসিক সাপ্লাইজ-২ ও কোমো অ্যাপারেলস লিমিটেডের মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, এর বাদীগণ অর্থের অভাবে বর্তমানে একবেলা খান তো দুবেলা না খেয়ে থাকেন। এ তিনটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বলতে ঢাকার মিরপুর ১২ নম্বরে একটি ৯ তলা জরাজীর্ণ ভবন। এটি এখন সোনালী ব্যাংকের দখলে। বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, ব্যবসা শুরুর দিকে ক্লাসিক সাপ্লাইজ ও কোমো অ্যাপারেলস চালু থাকলেও একপর্যায়ে এর মালিকরা ব্যাংকের ঋণের কিস্তি দেওয়া বন্ধ করেন। ঋণের অর্থ তারা পাচার করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্য মামলাগুলোর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঢাকার ওয়ারীর ১২ র‌্যাংকিং স্ট্রিটের মো. রফিকুল ইসলাম প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার এবং দিনাজপুর চেম্বার অ্যান্ড কমার্সের সাবেক সভাপতি ছিলেন। ঢাকা ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংকে মোট পাওনা ৪ কোটি ৯৩ লাখ ৬২ হাজার ২৮৪ টাকা। রাজধানীর রমনা থানার ৫৭ রিজিয়া ভিলার বাসিন্দা মেহের নিগার রুনা সিটি হার্টে অবস্থিত মোবাইল সেন্টারের মালিক। বেসিক ও সোনালী ব্যাংকে তার দেনা ২৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। মতিঝিলের ১৮, ৮৯ লাকি চেম্বারের ঠিকানার ইকেই টেক্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. নাজমুল হক ও তার স্ত্রী পরিচালক সামসুন নাহার এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম। বেসিক ব্যাংক ও মেসার্স ডিএল এন্টারপ্রাইজ তাদের কাছে পাবে ১৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা। তাদের কোনো সম্পত্তি নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ৭ নম্বর রোডের ২৮৭/৩ বাড়ির বাসিন্দা বদিউল আলম ও তার স্ত্রী নাজনীন আক্তার। তারা হুই ফ্যাসানের মালিক। আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের তাদের কাছে পাওনা ২ কোটি ৯৭ লাখ ৬৮ হাজার ৩৫০ টাকা। অর্থের অভাবে ছেলেরা টিউশনি করে লেখাপড়া করে এবং তাদের সম্পত্তি বলতে বসবাসের ঠিকানার ১৬২৮ বর্গফুটের ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট রয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শান্তিনগরের ৫/১ চামেলিবাগের শেলটেক ক্যামেলিয়ার বাসিন্দা ও শারমিন এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. শাহ আলম ভুঁইয়া। তার কাছে যমুনা, স্টান্ডার্ড চার্টার্ড, ব্র্যাক ও সিটি ব্যাংক পাবে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ঢাকার বাড্ডা থানাধীন কাঁঠালবাড়িয়া মৌজায় মাত্র ৫ কাঠা জমি রয়েছে তার।

দেউলিয়া আদালতে মামলা দায়েরকারী আরও কয়েকজন ঋণখেলাপি হলেন ইস্টার্ন ও প্রাইম ব্যাংক এবং আরলা ফুড ও কয়েকজন ব্যক্তির কাছে ২ কোটি ১৮ লাখ টাকা দেনাদার কুয়েত প্রবাসী ব্যবসায়ী শাওন অ্যান্ড শ্রাবণ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. মহিন উদ্দিন। ইস্টার্ন ব্যাংকের ২৮ লাখ টাকার দেনাদার ঢাকার ডেমরার কোনাপাড়ার মেসার্স ভুঁইয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক অহিদুল ইসলাম ভুঁইয়া। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৬৭ লাখ ৮১ হাজার টাকার দেনাদার ঢাকার ইসলামপুরের মেসার্স আলিফ ট্রেডার্সের মালিক মো. আমিনুল ইসলাম। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, ব্র্যাক ও সিটি ব্যাংকের ৬২ লাখ টাকার দেনাদার ঢাকার লালবাগের ৭৫/২ খাজে দেওয়ান প্রথম লেনের বাসিন্দা জাপান প্রবাসী ও লালবাগ ডটকমের স্বত্বাধিকারী মো. জসিম উদ্দিন। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ২২ কোটি ৫৮ লাখ টাকার দেনাদার ঢাকার খিলগাঁওয়ের ২৬/৬ এ মৌলভির টেকের ঝুমা ফ্যাশনের মালিক মো. জসিম উদ্দিন।

এ ছাড়া দেউলিয়ার আবেদন করেছেন আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা দেনাদার রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ফুজিয়ান ইলেকট্রনিক্সের মালিক সৈয়দ তৌফিকুল হক ও তার স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম; অগ্রণী ব্যাংকের ৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকার দেনাদার ঢাকার দারুস সালাম থানার ৫০ এসএ খালেক হাউজিংয়ের বাসিন্দা নেদারল্যান্ডসের নাগরিক এনামুল চৌধুরী; ইস্টার্ন ব্যাংক, আবুল খায়ের গ্রুপ, এনজিও ব্র্যাক ও সোসাইটি ফর সোশ্যাল সার্ভিসের ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার দেনাদার দক্ষিণখানের ফরিদাবাদের ২৫ শুক্কুর আলী মসজিদ রোডের মেসার্স রাফি ট্রেডার্সের মালিক মো. মিজানুর রহমান; ন্যাশনাল হাউজিং ফিন্যান্সের ১ কোটি ২২ লাখ টাকার দেনাদার পল্টন থানাধীন ১৫/১৭ শান্তিনগর বাজার রোডের একেএম আজাদুল হক।

অন্যরা হলেন ৩১ লাখ টাকার দেনাদার ঢাকার দক্ষিণখানের ফায়দাবাদের সাইফুল ইসলাম, ৩১ লাখ টাকার দেনাদার গাজীপুরস্থ নাইলা ফ্যাশনের মালিক আলিমুজ্জামান টিপু, সাত লাখ টাকার দেনাদার মিরপুরের ২৯১/৩ মধ্য পাইকপাড়ার ঢাকা পিনিক্স ইলেক্ট্রার মালিক মো. সাকিম হোসেন, ১১ লাখ টাকার দেনাদার মিটফোর্ড রোডের বিসমিল্লাহ টাওয়ারের মেসার্স গিফট সেন্টারের মালিক মো. মোজাম্মেল ও তার স্ত্রী, ২০ লাখ টাকার দেনাদার যাত্রাবাড়ীর ৪৯০ ধনিয়ার সারা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের মালিক জাহাঙ্গীর আলম, সাড়ে ৮ লাখ টাকার দেনাদার ১২/২ উত্তর পশ্চিম যাত্রাবাড়ীর গোল্ড স্টার অটোমোবাইলের মালিক মো. কামাল হোসেন, ১৩ লাখ টাকার দেনাদার ঢাকার নবাবগঞ্জের মোল্লাবাড়ী পাড়াগ্রামের ‘মা-বাবার দোয়া’ বন্ত্র বিতানের মালিক মো. শওকত মোল্লা।

সূত্র : আমাদের সময়

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles