2.1 C
Toronto
রবিবার, ডিসেম্বর ৪, ২০২২

১৭ বছর ধরে যেভাবে ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড ও বিকাশ প্রতারণা চালাচ্ছিল রেজাউল

১৭ বছর ধরে যেভাবে ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড ও বিকাশ প্রতারণা চালাচ্ছিল রেজাউল

ফরিদপুরের ভাঙ্গার কালামৃধা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল মাতুব্বরের নেতৃত্বে ১৭ বছর ধরে চলছিল ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড প্রতারণা। এমন অপরাধ করে কামানো টাকায় বিত্তশালী হন। পরে জনপ্রতিনিধিও হন। প্রতারণায় অর্জিত অর্থের একটি ভাগ তিনি দিতেন স্থানীয় প্রশাসনকে। এই সুবাদে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে তার গড়ে ওঠে সখ্যতা। আর এ সখ্যতার কারণেই ফাঁস হয়ে যাচ্ছিলো অভিযানের আগাম তথ্য। এজন্য তাকে আইনের আওতায় আনতে বেগ পেতে হচ্ছিল। তাই অভিযানের আগেই নিরাপদে সটকে পড়তেন রেজাউল মাতুব্বর।

- Advertisement -

অবশেষে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির মামলায় কৌশল অবলম্বন করে তাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। সেইসঙ্গে আইনের আওতায় আনা হয়েছে তার আরও তিন সহযোগীকে। তারা হলেন- নাঈম হোসেন, দিদার মুন্সী ও জাহিদুল খান।

ডিবি জানায়, অগাম তথ্য পেয়ে অভিযানের আগেই গা ঢাকা দিতো চক্রের সদস্যরা। এজন্য এবার স্থানীয় প্রশাসনকে অনেকটা অন্ধকারে রেখেই অভিযান চালায় ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগ। শনিবার ফরিদপুর, নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকার পান্থপথ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউলসহ চক্রের চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছে গোয়েন্দা পুলিশ।

ডিবি জানায়, মো. আবু বক্কর সিদ্দিক (৪০) নামের একজন ভুক্তভোগী গত ১২ মার্চ ডেমরা থানায় ডিজিটাল প্রতারণার মামলা করেন। এছাড়া প্রতারণার শিকার আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী থানায় মামলা ও জিডি করেন। এসব তদন্ত করতে গিয়ে এই জালিয়াতি চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে ১৬টি মোবাইল ফোনসেট ও ৩০টি সীম কার্ড ৩০ জব্দ করা হয়েছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, এই চক্রটি নিজেদের সিঙ্গার, ওয়ালটন বা অন্য কোনো কোম্পানির হেড অফিসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে কোম্পানির শোরুমে ফোন করতো। শোরুম ম্যানেজারকে চলতি মাসের ডেভিট-ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে এমন গ্রাহকদের তথ্য হোয়াটস অ্যাপ নম্বরে পাঠাতে বলে। তথ্য পাওয়ার পর চক্রের সদস্যরা গ্রাহকদের ফোন দিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তা পরিচয় দিতেন। কার্ডের নিরাপত্তার জন্য পিন কোড ৪ থেকে ৬ ডিজিট করা প্রয়োজন বলা হতো। গ্রাহকরা সরল বিশ্বাসে প্রতারকদের ব্যাংক কর্মকর্তা মনে করে তাদের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী পিনকোড পরিবর্তনের জন্য বর্তমান পিনসহ কার্ডের মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ও কার্ডের সিভিবি নম্বর দিয়ে দিতেন।

প্রতারক চক্রের সদস্যরা বিকাশ, নগদ বা রকেটের অ্যাপসের এড মানি অপশনে গিয়ে গ্রাহকের কার্ডের প্রাপ্ত তথ্য প্রবেশ করালে একটি ওটিপি গ্রাহকের নম্বরে যায়। পরে টক্রটি গ্রাহককে ওই ওটিপিটি দিতে বলে। গ্রাহক তার কার্ডের পিন কোড পরিবর্তনের আশায় ওটিপিটি দেয়ার পরপরই চক্রটি কার্ডের টাকা তাদের নিজ বিকাশ, নগদ বা রকেট নম্বরে ট্রান্সফার করে নেয়। এরপর তারা কয়েকটি ধাপে প্রতারণার মাধ্যমে প্রাপ্ত টাকা বিভিন্ন বিকাশ, নগদ বা রকেট নম্বরে ট্রান্সফার করে সর্বশেষ বিভিন্ন এজেন্ট পয়েন্ট হতে ক্যাশ আউট করে নেয়।

ডিবি সূত্র আরও জানায়, মোবাইল ব্যংকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতারক চক্রের সদস্যরা নগদ, বিকাশ এবং রকেটের কর্মরত প্রকৃত এসআরদের সহায়তায় সাম্প্রতিক সময়ে নেয়া নগদ, বিকাশ এবং রকেটের এজেন্ট ও সাধারণ গ্রাহকদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করতো। পরে এজেন্টদের ফোন করে নিজেদের বিকাশ, নগদ বা রকেটের বড় কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে এজেন্ট বা গ্রাহকদের বিকাশ, নগদ বা রকেটের অ্যাপ চালুর কথা বলে গ্রাহকদের তথ্য সংগ্রহ করতো। প্রতারকরা আইটেল হাইব্রিড মোবাইল ডায়ালার অ্যাপে প্রকৃত এসআরদের নম্বর বসিয়ে এজেন্ট/সাধারণ গ্রাহককে কল দিয়ে বলে ‘স্যার, ফোন দেবে। স্যার যেভাবে বলে সেভাবে কাজ করবেন’। তাৎক্ষণিক প্রতারকরা এজেন্ট/সাধারণ গ্রাহককে ওই অ্যাপস ব্যবহার করে বিকাশের হটলাইন নম্বর +১৬২৪৭ নম্বর থেকে ফোন করে তাদের চাহিদামত তথ্য সংগ্রহ করে ওই এজেন্ট বা গ্রাহকদের একাউন্ট থেকে কথা চলাকালীন সময়েই টাকা হাতিয়ে নিতো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ক্রেডিট জালিয়াতির বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শুরু করে ডিবি সাইবার ক্রাইম বিভাগ। তদন্তে জানা যায়, এই চক্রের মূলহোতা ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানাধীন ১০ নম্বর কালা মৃধা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং সাবেক মেম্বার রেজাউল মাতুব্বর। তিনি তার এলাকার ক্রেডিট/ডেবিট কার্ড এবং বিকাশ, নগদ, রকেট প্রতারকদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে তাদের কাছ থেকেও প্রতারনার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া টাকার ভাগ নিতেন। তিনি প্রায় ১৭ বছর ধরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে প্রতারক চক্রটিকে নিয়ন্ত্রন করছেন।

তিনি বলেন, প্রতারণা থেকে বাঁচতে আমাদের পক্ষ থেকে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। সেগুলো হলো- অপরিচিত কাউকে নিজের বিকাশ, নগদ, রকেট বা ক্রেডিট কার্ডের পিন নম্বরসহ কোনো তথ্য না দেয়া। কারও সাথে ওটিপি শেয়ার না করা। ব্যাংক অথবা বিকাশ কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করলে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া, প্রয়োজনে ওই প্রতিষ্ঠানের হটলাইন নম্বরে ফোন করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া। বিভিন্ন হট লাইন নম্বরের আগে ‘+’ সংকেত থাকে না, কিন্তু প্রতারকদের ফোন করা হট লাইন নম্বরের প্রথমে ‘+’ চিহ্নটি যুক্ত থাকে।

ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইমের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ফজলুর রহমান জানান, চক্রের অপর সদস্য ও গ্রেপ্তার ইউপি চেয়াম্যানের বন্ধু দিদার মুন্সী গত ১০ বছর ধরে চেয়ারম্যান রেজাউলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে প্রতারণা করছেন। প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া টাকার একটি অংশ রেজাউলকে দেন। চেয়ারম্যানের বাল্য বন্ধু হওয়ায় তাকে দিয়ে চেয়ারম্যান বিকাশ ও ক্রেডিট কার্ড প্রতারণা চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করেন। গ্রপ্তার এড়াতে দিদার নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জ থানা এলাকায় ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন। তিনি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের বিভিন্ন কর্মচারীদের টাকাও প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন।

গ্রেপ্তার নাঈম আইটেল হাইব্রিড ডায়ালার অ্যাপস ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যংক ও বিকাশ, নগদ, রকেটের হটলাইন নম্বর সদৃশ নম্বর ব্যবহার করে নিজেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে গ্রাহকদের ফোন করতো। গেপ্তার জাহিদুল চেয়ারম্যান রেজাউলের আত্মীয় এবং তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। সে চেয়ারম্যানের নির্দেশে প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থের অংশ অন্যান্য প্রতারকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করতো।

সূত্র: বাংলাদেশ জার্নাল

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles