6.2 C
Toronto
শনিবার, ডিসেম্বর ৩, ২০২২

শিল্পী

শিল্পী
ছবি/নরবার্ট কুনবার্ক

মাঝে মাঝে ভুলে যাই কোথায় যেতে হবে। কাপড়চোপড় পরে কাঁধে ঝোলা ব্যাগ ঝুলিয়ে বের হয়ে কিছুক্ষণ পর ভুলে যাই কোথায় যাচ্ছি। অগত্যা কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে ঘরের দিকে রওনা হই। আমি যে ভুলে গেছি কোথায় যেতে হবে সেটা কিন্তু কেউ জানে না কিন্তু আমার মুখে এক অদ্ভুত হাসি দেখে সবাই বুঝে ফেলে কিছু একটা ভুলে গেছি।

এই বিড়ম্বনা নতুন কিছু নয়। যখন কলেজের শিক্ষক ছিলাম তখনো ছাত্রদের নাম ভুলে যেতাম। রামকে রহিম বলে ডাকতাম আর রহিমকে রাম। আমার উচ্চারণে নোয়াখালীর টান আছে। যদিও আমার বাবার বাড়ি পাবনা আর মায়ের বাড়ি কুমিল্লা। আমার জন্ম সিলেটে। নোয়াখালীর টানের জন্য আমার নামের সাথে নোয়াখাইল্ল্যা যোগ হয়ে গেল। ছাত্ররা বলতো নোয়াখাইল্ল্যা স্যার আবারো নাম ভুলে গেছে। যতোই নোয়াখালীর সুনাম করে বলি সব দেশই ভালো তবুও কেউ আমার কথা শুনতে চাইতো না। নোয়াখালীর প্রাচীন নাম ছিল ভুলুয়া। কিছু কিছু কথা যে ভুলে যাই সেটা এই ভুলুয়া নামের জন্য কিনা বলতে পারবো না। ছাত্রদের চুপ করানোর জন্য ওদের ডাকাতিয়া নদীর গল্প বলতাম। কিন্তু কে শোনে কার কথা। প্রথম প্রথম রাগ করতাম কিন্তু পরে রুহুল আমিনের মত বুক ফুলিয়ে বলে দিলাম আমি হলাম নোয়া, মানে নতুন নোয়াখাইল্ল্যা।

- Advertisement -

নিজের সম্পর্কে তেমন কিছু বলার নেই। শুধু এইটুকু জানলেই হবে যে, আমি ইচ্ছে করেই বিয়ে-শাদি করি নি। একজনকে তো দুইজন একসাথে বিয়ে করতে পারে না। তাই এক পুরুষের সাথে ওর বিয়ে হয়েছে আর আমি সংসার করছি চোখের আড়ালে।

কী সুন্দর বেণী দুলিয়ে কেডস জুতা পায়ে দিয়ে হেটে আসতো মেয়েটি। ওর ইউনিফর্মের রঙ এখনো স্পষ্ট মনে আছে। ওকে দেখতাম আর আস্তে আস্তে বিয়ের তাল গাছ বুনতাম। সবচেয়ে উঁচু হতে লাগলো আমার বিয়ের স্বপ্ন। কিন্তু একদিন ওর বিয়ে হয়ে গেল আতা গাছের তোতা পাখির সাথে।
বিয়ে ছাড়াও আর একটা কাজ নিজ ইচ্ছেয় ঠিক করেছিলাম। যেদিন চাকুরী থেকে অবসর পাবো সেদিন যেখানে থাকবো সেখানেই হবে আমার শেষ ঠিকানা। নিয়তির লেখা অমান্য করে এই দুটো কাজ নিজেই ঠিক করে নিয়েছি। সব কিছু ভুলে যাই কিন্তু এই দুটো জিনিস কখনো ভুলি না।
একদিন খুব করে ভাবলাম যে ভুলে যাওয়াটা আমার ইচ্ছেতে হয় না। সেটা নিয়ন্ত্রণ হীন। কিন্তু ভুলে যাবার পর লোক সম্মুখে যে হাসিটা চলে আসে তা আমার মধ্যেই তৈরি হয়। যা আমার মধ্যে সৃষ্টি হয় সেটা তো আমার আয়ত্তে থাকার কথা। তাই একদিন ফকির বাবার দরবারে চলে গেলাম। ফকির বাবাকে বললাম, বাবা আমাকে একটা তাবিজ দেন। আমার হাসি দেখে কেউ যেন বুঝতে না পারে আমি কিছু ভুলে গেছি। অথবা এই হাসি বন্ধ করে দিন।
একেই বলে ফকিরের তেলেসমাতি। আমি গেলাম হাসি বন্ধ করার জন্য তাবিজ নিতে অথচ ফকির বাবা হাত দেখে বলে দিল আমার মরণ হবে অনেক পরে। পরে মানে একটু একটু পর না অনেক অনেক বছর পর। এদিকে আমি অবসরে যাবার পর তিন বছর হলো রাঙ্গামাটিতে থাকছি। ভেবেছিলাম রাঙ্গামাটিই হবে শেষ মাটি। এখন দেখছি শেষ দেখার আরো বছর কুড়ি বাকী।

ফকির বাবার কথা শোনার পর ঠিক করলাম পাহাড়ি ছেলেমেয়েদের অভিনয় শেখাবো। দেখতে দেখতে অনেক ছাত্রছাত্রী হয়ে গেল। একদিন এক চাকমা মেয়ে এলো অভিনয় শিখতে। মেয়েটির নাম অরুণা। ওকে দেখা মাত্র বুক কেঁপে উঠলো। মনে হলো যার জন্য বিয়ে করি নি সেই মেয়েটি বয়স কমিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রথম দেখার পর কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। অরুণার ওপর ভীষণ অবিচার করলাম। নতুন নাটকে ওকে দিলাম আমার চরিত্র। সেও ভুলে যাবে অনেক কিছু এবং ভুলে গিয়ে আমার মতোই ভুলে যাবার হাসি হাসবে।
অভিনয় করতে এসে অরুণা মহা বিপদে পরে গেল। একের পর এক ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলো কিন্তু কিছুতেই পারলো না আমার হাসি হাসতে। যতই বলি তোমার হাসি দেখে লোকে যেন বুঝতে পারে তুমি কিছু ভুলে গেছ। তবুও অরুণা ওর মতো করে হাসে। অনেক মিষ্টি হলেও সে হাসি আমার হাসি না।

না না এভাবে না, চোখটা ছোট করে ঠোট প্রসারিত করো, দেখ হয় কিনা। অরুণা ঠিক তাই করলো অথচ হলো না। বললাম, তোমার চিবুকের তিলটাকে আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরে একটা হাসি দাও তো। নাহ। তাও হলো না।

আসলে ওর কোন দোষ নেই। আমার হাসি ও হাসবে কেমন করে। তাছাড়া সে তো কিছু ভুলে যায় নি কাজেই ওর হাসি আমার মত হবে না কোনদিন। কাউকে জোর করে যদি বলা হয় ভুলে যাও। সে কি তা পারবে? কিছুই হয় নি সেটা কী করে ভুলে যাবে! কিছু হলে না হয় সম্ভাবনা ছিল।
অসময়ে রিহার্সাল শেষ করে বাঁশ ঝাড়ের নিচে বসে আছি। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ। নিচে তাকালে সবুজ সুরঙ্গ দেখা যায়। মেঘের পাঁজা আটকে আছে লতায় পাতায়। মন ভরে আমি দেখছি সে দৃশ্য। হাল্কা বাতাসে উড়ছে গায়ের চাদর। হঠাৎ অপরাধীর ভঙ্গিতে আলতো পায়ে অরুণা এসে পাশে বসলো। আমি কিছু বললাম না। সেও কিছু বলল না। দুজনে পাশাপাশি বসে লতায় পাতায় আটকে থাকা মেঘের পাঁজা দেখলাম। এদিকে আমার চাদর উড়ছে অন্যদিকে ওর আঁচল।

একসময় নীরবতা ভেঙ্গে অরুণা বলল, নোয়া স্যার, আমাকে আর একটা সুযোগ দিবেন?
কিসের সুযোগ?
আপনার সেই হাসিটা করতে পারি কিনা।
আমি মনে করতে পারলাম না কোন হাসি। অরুণা কিসের কথা বলছে।

আমার চোখে চোখ রেখে অরুণা বলল, কয়েক দিন থেকে অনেক চেষ্টা করেও যে হাসিটা আমি দিতে পারছি না। আপনি যেমন চাচ্ছেন তেমন হচ্ছে না দেখেই তো রাগ করে এখানে এসে বসে আছেন। আর একবার চেষ্টা করতে চাই।

অরুণা চোখ সরাচ্ছে না। অথচ সত্যি সত্যি আমি মনে করতে পারছি না ও কী বলছে। ওকে কি বলা ঠিক হবে সে যা জানতে চাচ্ছে আমি তা মনে করতে পারছি না?

অরুণার বয়স খুবই অল্প। বেণী দুলানো মেয়েটির মতো। তাছাড়া ও নতুন এসেছে অভিনয় শিখতে। অভিনয়ের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। সবই ঠিক আছে কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও আমি মনে করতে পারলাম না কোন হাসির কথা বলছে ও।

অরুণ অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকলো। ওর চোখ স্থির হয়ে আছে। প্রসারিত হলো ওর মুখ। যেন পৃথিবীর সব সুখ ওর দৃষ্টিতে এসে ধরা পড়েছে। আমার নীরবতা থেকে সে পাঠ নিলো। চোখের পলকে আমার মত হাসতে শিখে গেল। ও আমি হয়ে গেলাম।
মেয়েটির প্রতিভা দেখে আমি মুগ্ধ। পরের দিন সবার সামনে ওর নাম দিলাম নোয়া, মানে নতুন আমি। সানন্দে সে আমার দেওয়া নাম নিতে রাজী হয়ে গেল। চরণ স্পর্শ করে আশীর্বাদ চাইলো। বলল, আশীর্বাদ করুন আপনার এই নোয়া যেন একদিন সত্যিকারের শিল্পী হতে পারে।

সারারাত আমি বসে বসে ভাবলাম আমার হাসিটা কি চুরি হয়ে গেল! নাকি নোয়া’র কাছে গচ্ছিত রইলো। কাউকে কিছু না বলে ভোর হবার আগেই রাঙ্গামাটি ছেড়ে এলাম। আমি কাছে থাকলে নোয়া শিল্পী হতে পারবে না। যে কিছু হারায় না সে পূর্ণ। অথচ উপলব্ধি শুরু হয় শূন্য থেকে। নোয়াকে জানতে হবে কিকরে খুঁজতে হয়। কিছু কিছু মানুষ জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত খুঁজতে থাকে। এরাই হতে পারে সত্যিকার শিল্পী। নোয়াকে সেই সুযোগ করে দিলাম। যেমন আমাকে দিয়েছিল আমারই এক ছাত্রী। অতএব আমি এখনও জানি না শেষ ঠিকানা। আমি হাঁটছি এবং হাঁটছি। আমার পথ সম্পূর্ণ অচেনা।

স্কারবোরো, অন্টারিও, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles