প্রচ্ছদ অপরাধ রেন্ট-এ-কার ব্যবসার আড়ালে প্রতারণা করে হাজার কোটি টাকা আত্মাসাৎ

রেন্ট-এ-কার ব্যবসার আড়ালে প্রতারণা করে হাজার কোটি টাকা আত্মাসাৎ

11

সুলভ মূল্যে গাড়ি ক্রয় ও রেন্ট-এ-কার ব্যবসার নামে প্রতারণা চক্রের মূল হোতা জাকির চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগ। গ্রেপ্তার জাকির হোসেন (৪৩) কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার ২নং মানিকাচর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান।

গত বুধবার কুমিল্লার মেঘনা থানা এলাকা তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার হেফাজত থেকে ২টি মাইক্রোবাস উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, জাকিরের গাড়ি ব্যবসার ফাঁদে পা দিয়ে হাজার কোটি টাকা খুইয়েছেন এমপি-পুলিশসহ তিন শতাধিক মানুষ। প্রতারণার এই টাকা দিয়ে জাকির হোসেন নিজে কিনেছেন গাড়ি-বাড়ি-জমি, ছেলেকে পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। এছাড়া নিজেও আগামী নভেম্বর মাসে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে।

পুলিশ আরও জানায়, জাকির প্রায় দশ বছর আগে ঢাকায় এসে বাস চালকের সহকারি ও পরে গাড়ি চালাতেন গাড়ি। কিন্তু দশ বছরের মাথায় কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। বেশ কয়েকটি গাড়ি নিয়ে শুরু করেন রেন্ট-এ-কারের ব্যবসা। ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান। মনোনয়ন পেতে প্রভাবশালী এক ব্যক্তিকে দিয়েছেন প্রাডো গাড়ি।

আরও পড়ুন :: স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর গলাকেটে হত্যা : তিনদিনের রিমান্ডে গৃহশিক্ষক

জাকির চেয়ারম্যান মূলত দুই থেকে তিনটি ধাপে প্রতারণা করেছেন। কেউ গাড়ি কিনে মাসিক চুক্তিতে তাকে দিতেন রেন্ট-এ-কার ব্যবসার জন্য। জাকির সেই গাড়ি বিক্রি করে দিতেন, যিনি গাড়ি দিয়েছিলেন তাকে মাসিক চুক্তির টাকাও দিতেন না। আবার স্বল্প মূল্যে গাড়ির মালিকানা হস্তান্তরের লোভ দেখিয়েও হাতিয়ে নিতেন টাকা। তার এমন প্রতারণার ফাঁদে সাধারণ মানুষ ছাড়াও সংসদ সদস্য, অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, প্রশাসনের লোকজন এমনকি পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। তবে প্রভাবশালীদের টাকা ফেরত দিলেও শত শত সাধারণ মানুষের টাকা আত্মসাৎ করেন জাকির।

জাকিরের প্রতারণার শিকার মুন্সিগঞ্জের মো. সায়েম বলেন, আমি ১৫ লাখ টাকায় দোকান বিক্রি করে সেই টাকায় গাড়ি কিনে জাকিরের হাতে তুলে দেই। চুক্তি ছিল এই গাড়ি ভাড়া খাটিয়ে মাসিক ৭০ হাজার টাকা দেবেন জাকির। কিন্তু প্রথম মাসের ভাড়া দিয়ে সায়েমকে আর কোনো টাকা দেননি জাকির। শেষ পর্যন্ত নিজের গাড়িও ফেরত পাননি সায়েম। টাকার জন্য চাপ দিলে সাড়ে সাত লাখ টাকার একটা চেক ধরিয়ে দেয় আমাকে। বাকি টাকা চাইলে মামলার হুমকি দেয়।

একই গাড়ি প্রতারক জাকির ২৫ জনের কাছে বিক্রি করেছে উল্লেখ করে সায়েম বলেন, পুলিশ প্রশাসন ও কয়েকজন সংসদ সদস্যও এই জাকির চেয়ারম্যানের ক্লায়েন্ট। তাদের দেখেই আমরা সাধারণ মানুষ আস্থার সঙ্গে রেন্ট এ কার ব্যবসায় যুক্ত হয়েছিলাম।

শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন-অর-রশিদ বলেন, রেন্ট-এ-কারের ব্যবসার আড়ালে ভয়ঙ্কর প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিলেন জাকির চেয়ারম্যান। তিনি দুই তিন প্রক্রিয়ায় প্রতারণা করে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

তিনি বলেন, গত কয়েকদিনে ডিবি অফিসে দুই শতাধিক ভুক্তভোগী ভিড় করেছেন। আমরা তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারলাম, শুধু মুন্সিগঞ্জের একটি গ্রাম থেকেই ১৫০ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক জাকির।

গোয়েন্দা প্রধান বলেন, তার গাড়ি রয়েছে ২০-২৫টি। সেসব গাড়ি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সবাইকে দেখাতেন। তিনি কয়েকজন এমপি, প্রশাসনের লোকদের কাছ থেকেও টাকা নিয়েছেন। তবে তাদের কাছে ভাবমূর্তি ঠিক রাখার জন্য মাসিক কিস্তির টাকা ঠিকই মাসে মাসে পরিশোধ করেছেন।

তিনি আরও বলেন, বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে জাকিরের প্রতারণার বিষয়ে অভিযোগ পায় গোয়েন্দা পুলিশ। এছাড়া গত ৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মুগদা থানায় একটি প্রতারণার মামলাও হয়। মামলাটি গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগের তেজগাঁও জোনাল টিম ছায়াতদন্ত শুরু করে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে বিশেষ অভিযান চালিয়ে জাকির চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জাকিরের কাছ থেকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে হারুন-অর-রশিদ বলেন, জাকির গ্রামের বাড়িতে প্রতারণার সেই টাকায় আলিসান বাড়ি করেছেন। ইউপি চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন পেতে কাউকে প্রাডো গাড়ি কিনে দিয়েছেন, নির্বাচনে বিপুল টাকা খরচ করে চেয়ারম্যান হয়েছেন। ঢাকা শহরে তিনি গাড়ি-ফ্ল্যাট-প্লট করেছেন। প্রতারণার টাকায় তিনি নিজের ছেলেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছেন। আগামী নভেম্বরে তারও যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো। তার আগেই আমরা তাকে গ্রেপ্তার করেছি। আমরা রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করবো। ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরত দেয়ার চেষ্টা করা হবে। তার সম্পদ জব্দের জন্য প্রয়োজনে সিআইডিতে মামলা হস্তান্তর করা হবে।

এর আগেও তাকে গ্রেপ্তারে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, কিন্তু অনেকে বলেছেন, তিনি গ্রেপ্তার হলে মাসিক কিস্তির টাকা পাবেন না। কিন্তু তিনি বেশিরভাগেরই মাসিক কিস্তির টাকা পরিশোধ করেননি। মূল টাকাতো নেই, গাড়িও মেরে দিয়েছেন।

ডিবি প্রধান বলেন, জাকির চেয়ারম্যান পোর্ট থেকে স্বল্প দামে গাড়ি কিনে দেয়ার কথা বলে বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে টাকা নেন। গাড়ি রেন্ট-এ-কারের মাধ্যমে মাসিক ভাড়ায় পরিচালনা করার জন্য চুক্তি করেন। একই গাড়ি এভাবে একাধিক ব্যক্তির সাথে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে চুক্তি করে। একই রেজিস্টেশন নাম্বার সম্বলিত গা একাধিক জাল দলিলের মাধ্যমে বিক্রি করে। আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রে কারো সঙ্গে শুধু ইঞ্জিন নাম্বার দিয়ে মাসিক কিস্তি পরিশোধের ভিত্তিতে কিছুদিন পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধ করলেও পরে কিস্তি দেয়া বন্ধ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেন।

এছাড়াও আগে বিক্রি করা গাড়ি স্বল্প মূল্যে মালিকানা হস্তান্তরের লোভ দেখিয়ে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেন।

ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যায়, গ্রেপ্তার জাকির চেয়ারম্যান প্রতারিত ভিকটিমদের কাছ থেকে পুরো টাকা নিয়ে তিনি ডাউন পেমেন্টে গাড়ি কিনতেন। আবার ব্যাংক থেকে গাড়ির বিপরীতে কাস্টমারকে না জানিয়ে ব্যাংক লোন সুবিধা নিতেন।

সূত্র : বাংলাদেশ জার্নাল