10.1 C
Toronto
বুধবার, অক্টোবর ৫, ২০২২

বৈশ্বিক সংকটে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখছে

- Advertisement -

বৈশ্বিক সংকটে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখছে

বাংলাদেশের অর্থনীতির বিস্ময়কর অগ্রগতির নির্ভরশীলতা অনেকগুলো খাতের মধ্যে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় অন্যতম। সরকারি তথ্য অনুসারে বিশ্বের ১৬৮টি দেশে ১২ কোটির বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছে। তাদের ঘাম ও শ্রমের উপার্জিত অর্থ দেশে আসলে তাকে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বলি। তাদের রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কতটা গুরত্বপূর্ণ তা করোনা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী মহামারীর সময় প্রমাণিত হয়েছে। করোনার পরপরই শুরু হওয়া বর্তমান বিশ্বব্যাপী নজিরবিহীন আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

সম্প্রতি অতীতে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কাকে অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া ঘোষণার পর বিশ্বব্যাপী দেউলিয়া আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে তাতে এই রেমিট্যান্স আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি বহুপাক্ষিক ট্রাস্ট ফান্ড গ্লোবাল নলেজ পার্টনারশিপ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সম্প্রতি রিপোর্ট করেছে যে বাংলাদেশ ২০২০ সালে ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিটেন্স বা প্রবাসী আয় পেয়েছে। ফলস্বরূপে বাংলাদেশ ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকা থেকে এক ধাপ উপরে উঠে সপ্তম স্থানে রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা পালন করে। এই অর্থ ব্যয় করা হয় ব্যবসা-বাণিজ্যে,শিল্প উৎপাদনে, স্কুল-মাদ্রাসায়, মসজিদে, হাসপাতালসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে। দৈনিক খরচে রেমিট্যান্স আয়ের প্রায় ৬৩ শতাংশ ব্যয় হয়। সেসব পরিবারের দারিদ্র্যও দূর করা হচ্ছে। জুলাই ২০২২ এর পর আগস্টেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে যা ডলার সংকটের সময়ে প্রবাসীরা আশা বাঁচিয়ে রেখেছেন।

অর্থবছরের দ্বিতীয় মাসে ৩১ আগস্ট দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২.০৩ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের আগস্টের চেয়ে ১২ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি। ওই মাসে দেশে ১ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স এসেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমে জুলাই মাসে প্রবাসীরা ২০১.৬৯ মিলিয়ন রেমিট করেছে যা আগের ১৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১২ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) রেমিট্যান্স প্রবাহের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে যে আগস্ট মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে গড়ে প্রতিদিন ৬৫.৭ মিলিয়ন রেমিট্যান্স গৃহীত হয়েছে।

রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়াতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রবাসীদের এখন কোনো কাগজপত্র লাগবে না। বাজারে ডলারের দর বেশি থাকায় খরচ কমিয়ে দেশে বেশি টাকা পাঠানোর চেষ্টা করছেন তারা। আর হুন্ডিকে নিরুৎসাহিত করতে ৩০টি ব্যাংকের এডি শাখা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। এডি শাখা বাড়লে ডলার ক্রয়-বিক্রয় সহজ হবে। এসব বিষয় রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।

ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৬-৭ লাখ মানুষ বিভিন্ন দেশে যায়। বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ বিদেশে যায়। এই প্রবাসীরা বছরে গড়ে ১৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠায়। বাংলাদেশ ব্যাংক ৩০ জুন ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বলেছে যে রেমিট্যান্স ঊর্ধ্বমুখী হবে এবং চলতি অর্থবছরে গত বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি আসবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২২-২৩ অর্থবছরের ২৮ দিনে প্রবাসীরা প্রতিদিন গড়ে ৭ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন। গত অর্থবছরে প্রবাসীরা গড়ে ৫৭.৬ মিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছে।

সরবরাহ ঘাটতির কারণে কয়েক মাস ধরে ডলারের দাম বাড়ছে। ব্যাংকিং চ্যানেল ছাড়াও খোলা বাজারে ডলারের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত মাসে ব্যাংকে ডলারের দর বেড়েছে ১০৯ টাকায়। কিছুটা কমে এখন লেনদেন হচ্ছে ১০৬-১০৭ টাকায়। অথচ এক বছর আগেও ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকার মতো। খোলা বাজারে ডলারের দাম বেড়েছে ১২১ টাকা। এ প্রেক্ষাপটে ব্যাংকগুলো ডলার সংগ্রহের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা সংস্থার কাছ থেকে বেশি হারে বৈদেশিক মুদ্রা কিনছে। এতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

তবে ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এতে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৯ বিলিয়ন। আগস্ট ২০২১ সালে রিজার্ভ ৪৮.০৬ রেকর্ডে পৌঁছেছে।

সরকারের যথাযথ মনিটরিং ও তদারকির অভাবে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালদের ওপর নির্ভরশীল। বিদেশি যাত্রীরাও বাধ্য হয়ে মধ্যস্বত্বভোগী ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে। এই পরিস্থিতির জরুরী অবসান প্রয়োজন।

প্রবাসীদের দুর্ভোগ লাঘবে জন্য প্রবাসীদের জীবনের শুরু থেকেই কাজ করতে হবে। অভিবাসন সংক্রান্ত তথ্যের পর্যাপ্ত প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ দালালদের ফাঁদে না পড়ে। মানব পাচারকারীদের কঠোরভাবে মোকাবেলা করতে হবে। দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের নির্মূলে সতর্ক থাকতে হবে। প্রবাসীদের জন্য পর্যাপ্ত ঋণ প্রদান করতে হবে। দেশের শ্রমশক্তিকে দক্ষ শ্রমশক্তিতে রূপান্তর করার কর্মসূচি নিতে হবে। তাদের বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

রেমিটেন্স প্রবাহ বজায় রাখতে দক্ষ কর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিমানবন্দরে আসা-যাওয়ার চরম ভোগান্তি দূর করতে হবে। দেশের বিমানবন্দর গুলোতে প্রবাসীদের চলাচলের জন্য আলাদা চ্যানেল স্থাপন করতে হবে। আমাদের অর্থনীতির প্রাণশক্তির পরিপ্রেক্ষিতে তাদেরই সকল প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অভিবাসন খরচ কমাতে হবে। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অধীনে অভিবাসনের ক্ষেত্রে ব্যয়টি বিদেশ গমনকারী ব্যক্তির স্বার্থে হওয়া উচিত। প্রবাসী অধ্যুষিত দেশগুলিতে আগামী পাঁচ বছরে ১০,০০০ টিরও বেশি ডায়াস্পোরা উইং প্রতিষ্ঠা করা উচিত যাতে প্রবাসীদের দুর্ভোগ লাঘব করা যায়। দূতাবাস এবং মিশনগুলিকে গুরুত্বের সাথে দেশ ও অর্থনীতির সেবা করা উচিত।

সরকারের উচিত শ্রমবাজার বৃদ্ধি ও প্রবাসীদের কল্যাণে গবেষণা সেল প্রতিষ্ঠা করা। প্রবাসীদের পুরস্কৃত করার উদ্যোগ প্রসারিত করা উচিত যাতে তারা উৎসাহিত হয়। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বৈদেশিক রেমিট্যান্সের গুরুত্ব অনুধাবন করে এবং জনশক্তি রপ্তানি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে জনসংখ্যা সমস্যাকে দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তরিত করা সম্ভব। প্রত্যন্ত অঞ্চলে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং দেশের বেকারত্ব সমস্যা সমাধানসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য একটি বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হবে। যারা বিদেশে যেতে চান তাদের জন্য প্রতিটি জেলায় একটি করে বিশেষায়িত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং প্রশিক্ষিত কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার জন্য সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এই সমস্যা সমাধানে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক ব্যবহার করা যেতে পারে। এর ফলে সরকারের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে। যে নীতিগুলো প্রবাসীদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে।

সুফিয়ান সিদ্দিকী
লেখকগবেষকআন্তর্জাতিক রাজনৈতিক  অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

Related Articles

Latest Articles