12.7 C
Toronto
বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২২

আমার ভাই খালেদ

- Advertisement -
ফাইল ছবি

বঙ্গবন্ধুর লেখা আত্মজীবনীতে পাটগাতি স্টেশনের কথা পড়ে থাকবেন অনেকেই। বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায় এখন প্রতিদিন মানুষের ঢল নামে। কিন্তু একসময় সেখানে যাবার জন্য ছোট্ট একটা খাল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তখন যাতায়াতের জন্য আশপাশের মানুষ পাটগাতি বাজারকে ব্যবহার করতো। যতদূর মনে পড়ে সেখানে এক সময় ছিল একটা মিষ্টির দোকান, একটা দর্জির দোকান, কিছু মুদি ও লুঙ্গি কাপড়ের দোকান এবং একটা ডাক্তারখানা। তখন দক্ষিণ বাঙলায় কোন প্রধান সড়ক ছিল না, স্টিমার লঞ্চেই যাতায়াত করতে হতো সকলকে। সেকারণে ‘পাটগাতি লঞ্চ ষ্টেশন’ ফরিদপুর, খুলনার সীমানায় ছিল বিশেষভাবে পরিচিত। পাটগাতি এবং এর পাশের গ্রাম গেমাডাঙ্গার উল্লেখিত লোকদের মধ্যে আমার বড় কাকা (আব্বার খালাতো ভাই) শেখ আব্দুল মালেককে সকলে চিনতো। ব্যাপারটা এমন ছিল যে, তখন লঞ্চ ঘাটে কাউকে হোল্ডার কিংবা সুটকেস নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেলে প্রশ্ন করা হতো ‘ও মিয়া কোহানে যাচ্ছ’? যদি উত্তর হতো ‘ঢাকা’ তবে পরের কথাটি হতো ‘মালেক ভাইজানকে আমার সালাম দিও’।

এর অর্থ আমাদের অঞ্চল থেকে যে-ই ঢাকায় আসতো তাদের গন্তব্য হতো প্রশ্নাতীতভাবে ঢাকার নন্দলাল দত্ত লেনে অবস্থিত শেখ আব্দুল মালেকের বাসা। শুধু কানে শুনেছি তা নয়, নিজের চোখেও দেখেছি যে পড়ালেখা, চিকিৎসা, চাকুরী ইত্যাদি কারণে ঢাকায় কেউ এলে অনেকেরই প্রথম নিবাস ছিল এই বাসাটি। আমার পিতাও তাই করেছিলেন। কোলকাতায় এবং ঢাকায় মালেক কাকার বাসাতেই থাকতেন। শেখ আব্দুল মালেক শুধু আমার পিতার বড় ভাই-ই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমার পিতার অভিভাবক। বিয়ে করে আম্মাকে নিয়েও এই খালাতো ভাইয়ের বাসাতেই উঠেছিলেন তিনি। কাকা-কাকীর বড় মেয়ে (মনু আপা) আর আমার আম্মা একসাথে বন্ধুর মতো বড় হয়েছে। মালেক কাকার ছোট ভাই শেখ আব্দুল মান্নান এই বাসা থেকেই ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যেতেন। পরবর্তীতে লন্ডনে বসে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর খুব ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ছিলেন শেখ আব্দুল মান্নান। আমার সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট’ এ শেখ আব্দুল মান্নান বড় একটি অংশ জুড়ে আছেন।

মালেক কাকার সবগুলো ছেলেমেয়ে লেখাপড়া ও মেধায় উচ্চতা লাভ করেছে। তার ছোট ছেলে বাবু সরকারী কাজ শেষে অবসরের কাছাকাছি চলে এসেছে। বিভিন্ন দেশে হাই কমিশনার হিসেবে কাজ করে কিছুদিনের মধ্যে শেষ পোস্টিং এ যাচ্ছে। অন্য এক মেয়ে ডাক্তার, ছোট মেয়ে আন্তর্জাতিক ভাষায় পিএইচডি করেছে রাশিয়া থেকে। বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম এ করেছেন। অর্থাৎ মালেক কাকা অন্যকে সফল হতে সাহায্য করেই বসে থাকেন নি, তিনি নিজ ছেলে মেয়ের প্রতিও বেশ যত্নবান ছিলেন।

আজ মালেক কাকার বড় ছেলে খালেদ যাকে আমরা ডাকি খালিদ বলে, তাকে নিয়ে কিছু কথা লিখতে চাই। দুদিন আগে (সেপ্টেম্বর ১৪) খালিদ আমেরিকার টেক্সাস অস্টিনে মারা গেছে। ক্যান্সার ধরা পড়েছিল কিন্তু পরিবারের বাইরে কাউকে তেমন করে জানায় নি কিছু। নিজে নিজেই ফাইট করে গেছে বহুদিন। তিন চারদিন আগে যখন অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছিল এবং কথা বলার শক্তি ক্ষীণ হয়ে আসছিল তখন তাকে হাঁসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সাথে সাথেই খালিদের ছোট বোন লাভলী টরন্টো থেকে চলে গেল অস্টিন। অবস্থা আন্দাজ করতে পেরে খালিদ ইচ্ছে পোষণ করলো বাসায় ফিরে যেতে। এম্বুলেন্সের বিশেষ ব্যবস্থায় বাসায় নিয়ে এলে কিছুক্ষণ পর সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। খালিদের স্ত্রী, দুই ছেলে এবং এক মেয়ের সাথে এখন নিকট আত্মীয়স্বজনেরা আছে। টেক্সাস অস্টিনের এক মসজিদে গতকাল ওর জানাজা পড়ানো হয়েছে। খালিদের শেষ ইচ্ছেতেই ওকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। হয়তো কিছুদিন সময় লাগতে পারে।
আমার ছোটবেলার অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে। ভেবেছিলাম আমরা তিন কাছের কাজিন খালিদ, মাহবুব (এখন অস্ট্রেলিয়াতে থাকে) আর আমি বুড়ো বয়সে এক সাথে কিছুদিন কাটাবো। আমাদের অতীত দিনের এমন অনেক ঘটনা আছে যার জাবর কেটেও কাটিয়ে দিতে পারতাম মাসের পর মাস। কিন্তু সেই সুতো কেটে গেল এখন, তাই তিনদিন থেকেই মন খারাপ নিয়ে বসে আছি।

খালিদের এক ছাত্র টরেন্টর বিশেষ পরিচিতি মুখ, তার নামও খালেদ সে বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটি বড় পোস্ট দিয়েছে ফেসবুকে। অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি এই খালেদ অনেক কথাই লিখেছে তার স্যারের সম্পর্কে যার বেশিরভাগই আমাদের অনেকের অজানা। একবার শুনলাম খালিদ অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছে। আমাদের মনে হলো সেতো হতেই পারে। আবার শুনলাম পড়ালেখা তেমন মনোযোগ নেই, যেমন খুশি ভাবে পরীক্ষা দিয়ে এমএ পরীক্ষায়ও ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছে খালিদ। আমার অন্য এক কাজিন মাহাবুব একই ডিপার্টমেন্ট থেকে সম্ভবত ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড কিংবা থার্ড হয়েছিল। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওলজি ডিপার্টমেন্টে শিক্ষকের পজিশনটা খালিদ পেয়ে গেল বলে মাহবুব বিসিএস দিয়ে সরকারী চাকুরীতে যোগ দিল। পরবর্তীতে খালিদ টেক্সাসে এসে পিএইচডি ও মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পোস্ট ডক্টরেট শেষ করে জড়িয়ে গেল আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায়। মাঝে আমেরিকার একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে টেলিভিশন বিতর্কে শহিদুল্লাহ হল থেকে অংশ নিয়েও অনেকের নজর কেড়েছিল খালিদ। কিন্তু আমরা হলাম ঘরের মানুষ তারপর খালিদ বয়সে ছোট, আমাকে দাদা বলে ডাকতো। আবার ছাত্র হিসেবে আমি ছিলাম খুবই খারাপ। টেনেটুনে পাশের মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে এসে প্রাণ বাঁচিয়েছি।

আমি কি খালিদের সাফল্য নিয়ে এতো মাথা ঘামাতাম? মোটেও না, ছাদে বসে মাহবুব আমি খালিদ তাস খেলতেই বেশি মজা পেতাম। এছাড়া পিএইচডি, ডক্টর এসব ওর মুখেও কখনো শুনিনি। ও আমেরিকায় আসার পর একবার ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কি করছ, সে বললো, কি আর করবো, বাচ্চার ডাইপার চেঞ্জ করছি। একটু পর ক্লাস নিতে যাব। আমি বলেছিলাম পত্রিকায় লিখে দেবো নাকি, আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালি শিক্ষক এখন ডাইপার চেঞ্জ করছে। ও হাসতে হাসতে বলেছিল সাথে এটাও লিখে দিয়েন পাতিল কীভাবে মাজতে হয় তাও জানি। খালিদের জীবনের ব্রত ছিল অন্যের যা নেই তার সামনে নিজের ঢাকঢোল না পেটানো। তা টাকা পয়সা, শিক্ষা, কিংবা সামাজিক মর্যাদা সে যাইহোক। চাকচিক্য না দেখিয়ে স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থাই সবচাইতে উত্তম জীবন এমন বিশ্বাসে বিশ্বাসী ছিল খালিদ। ওর সব চাইতে বড় পরিচয় সে শেখ আব্দুল মালেকের ছেলে, যে বাবার নাম শুনে মানুষ বলতো ‘মালেক ভাইজানকে সালাম দিও’ এবং বঙ্গবন্ধু যাকে ‘মালেক ভাইজান’ বলে সম্বোধন করতেন। খালিদের বড় অর্জন সে সাইকেলে চড়ে মোহাম্মদ পুর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা করতে যাওয়ার মধ্যে খারাপ কিছু দেখত না। খালিদ, ছাত্রদের সবসময় বন্ধু ভাবতো। ওদের সাথে বাস্কেটবল থেকে শুরু করে নানা ধরনের খেলা খেলত। হাসি মজা জোকস এগুলো ছিল তার নিত্যদিনের ব্যাবহারিক প্রকাশ। আমরা যে বলি, ভালো মানুষগুলো একে একে চলে যাচ্ছে। আমি হলফ করেই বলে দিতে পারি সেই ভালো মানুষের ডেফিনিশনে পড়ে খালিদ। খালিদ, দামী কিংবা উচ্চ ব্রান্ড নামের মোহে পড়ে নি, সবচাইতে ভালো যে কাজ খালিদ শিখিয়ে গেছে তা হলো, হাসি দিয়ে বিশ্ব জয় করা যায়। নিজের হাসি বিশ্বের সব চাইতে দামী ব্রান্ড।

জীবন দর্শনের খুঁটিনাটি যতটুকু খালিদের কাছ থেকে শিখেছি, আজ সেগুলোর জন্য ওকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আশাকরি হিম ঘরে খালিদ এখনো ভালো আছে এবং আগামীতেও ভাল থাকবে।

স্কারবোরো, কানাডা

Related Articles

Latest Articles