12.5 C
Toronto
মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২

‘রেপিস্ট বাবা’ কেন লিখেছিলেন সানজানা? তদন্তে নেমে যা পেয়েছে পুলিশ

- Advertisement -

সানজানা মোসাদ্দিকা। বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের সপ্তম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২৭ আগস্ট দুপুরে রাজধানীর দক্ষিণখানের মোল্লারটেক এলাকায় ১০তলা ভবনের নিচ থেকে তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে উত্তরার বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত বলে জানান।

ঘটনার পর ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা বলে সংবাদ প্রকাশ হয় গণমাধ্যমে। এ ঘটনায় মামলা হলে বাবা শাহীনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

মৃত্যুর আগে সানজানা একটি ‘চিরকুট’ লিখে যান। যেখানে বাবাকে ‘রেপিস্ট বাবা’ বলে আখ্যায়িত করেন তিনি।

কেন বাবাকে নিয়ে এমনটি লিখেছিলেন সানজানা? সেই অভিযুক্ত বাবা এখন কোথায়? জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ কী তথ্য পেলেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা? এসব বিষয় নিয়ে বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সানজানা মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। বিশেষ করে পারিবারিক কলহটা তার জীবনের ওপর বেশি প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম বাবা-মায়ের মধ্যে বনিবনা না হওয়া, বাবার দ্বিতীয় বিয়ে, অভাব-অনটন এবং পড়াশোনার খরচ ঠিকমতো না দেয়া অন্যতম কারণ বলে মনে করছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এসব কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

সানজানা চিরকুটে বাবাকে ‘রেপিস্ট বাবা’ বললেন কেন এমন প্রশ্নে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সানজানার বাবার সঙ্গে তার মায়ের বিচ্ছেদ হলেও তিনি (শাহীন আলম) প্রতিনিয়ত ওই বাড়িতে যাতায়াত করতেন। তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কও বিদ্যমান ছিল, যা মেয়ে হিসেবে সানজানা মেনে নিতে পারতেন না। কারণ সানজানার কারণেই তার মা (বাবার দ্বিতীয় বিয়ে) ডিভোর্স নিয়েছিলেন। তারপরও এই বাসায় বাবার নিয়মিত আসা-যাওয়া পছন্দ করতেন না সানজানা। এসব কারণেই চিরকুটে বাবাকে ‘রেপিস্ট’ ও ‘অত্যাচারী’ বলে আখ্যাযিত করেছিলেন।

চিরকুটে যা লেখা:
আত্মহত্যার আগে একটি চিরকুট লিখে গেছেন সানজানা। চিরকুটটি উদ্ধার করেছে দক্ষিণখান থানা পুলিশ। চিরকুটে লেখা রয়েছে, ‘আমার মৃত্যুর জন্য বাবা দায়ী। একটা ঘরে পশুর সাথে থাকা যায়, কিন্তু অমানুষের সাথে না। একজন অত্যাচারী রেপিস্ট, যে কাজের মেয়েকেও ছাড়েনি। আমি তার করুণ ভাগ্যের সূচনা।’

মামলা সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে দাবি করে দক্ষিণখান থানার ওসি মামুনুর রহমান বলেন, ‘শাহীন আলমকে একদিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি পরিবারের লাইফ স্টাইল সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। এসব তথ্য আমরা যাচাই-বাছাই করছি। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই আমরা মামলার শেষ দিকে এগিয়ে যাব।’

বর্তমানে অভিযুক্ত শাহীন কারাগারে আছে বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

এদিকে সানজানার মরদেহ উদ্ধারের পর অনুসন্ধানে জানা যায়, পরিবারটি একসময় অনেক সচ্ছল ছিল। সানজানার বাবা শাহীন আলম গাড়ির ব্যবসা করতেন। হঠাৎ করেই শাহীনের গাড়ির ব্যবসায় ধস নামলে অন্য ব্যবসা শুরু করেন। একারণে পরিবারের সঙ্গেও শাহীনের দূরত্ব কমতে থাকে। এর মধ্যে মাদক সেবনেও জড়িয়ে যান শাহীন। আবার আরেকটি বিয়েও করেন, যা আগের স্ত্রী (উম্মে সালমা) জানতেন না।

গত বছর শাহীনের গোপনে করা বিয়ের খবর জানাজানি হলে তিনি আগের স্ত্রী সালমাকে তালাক দেন। এসব বিষয় ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও নম্রভদ্র সানজানার জন্য মানসিক পীড়ার কারণ হয়। এজন্য তিনি মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্নও হন।

এছাড়া স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পর শাহীন আলম সানজানাসহ তার তিন ছেলেমেয়ের পড়াশোনার জন্য টাকাও কমিয়ে দেন। এসব নিয়ে প্রায় সময়ই ঝগড়া-ফ্যাসাদ হতো।

পুলিশ বলছে, সানজানার মরদেহ উদ্ধারের পর তার রুম থেকে চিরকুট ছাড়াও বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়। সেখানে একটি প্রেসক্রিপশন পাওয়া গেছে। চিকিৎসক বলেছিলেন, সানজানার মধ্যে আত্মহত্যা করার প্রবণতা রয়েছে।

এরপর থেকে তার মা (উম্মে সালমা) সব সময় নজরদারিতে রাখতেন। ঘটনার দিন বাসার সিকিউরিটি গার্ডের কাছ থেকে চাবি নিয়ে ছাদে যান। এরপর সেখান থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন।

শাহীনের বিরুদ্ধে মামলা ও সহপাঠীদের অভিযোগ:

মেয়েকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে বাবা শাহীন আলমের বিরুদ্ধে মামলা করেন নিহতের মা উম্মে সালমা। রাজধানীর দক্ষিণখান থানায় তিনি এই মামলাটি করেন। মামলার পর থেকে শাহীন পলাতক ছিলেন। ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহের গফরগাঁও থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এরপর শাহীনকে একদিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পায় পুলিশ।

এদিকে সানজানার মৃত্যুর ঘটনায় সহপাঠীরা মানববন্ধন করেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে করা মানববন্ধনে তার বন্ধুদের অভিযোগ, সানজানাকে পরিকল্পনাভাবে হত্যা করা হয়েছে। তারা জানান, সানজানার বাবা দ্বিতীয় স্ত্রী নিয়ে আলাদা থাকতেন। সানজানা দুই ভাই–বোন নিয়ে মায়ের সঙ্গে থাকতেন। বাবা মাঝেমধ্যে তাদের বাসায় এসে তার মাকে মারধর করতেন। এমন আচরণের প্রতিবাদ করলে তাকেও মারধর করা হতো। গত ঈদের আগেও তার বাবা সানজানাকে মেরে হাতের আঙুল ভেঙে দেন। এ ঘটনায় থানায় জিডিও করেছিলেন তার মা। আর কোনো দিন তার গায়ে হাত তুলবেন না, এমন প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর ওই জিডি তুলে নেয়া হয়।

আগেই ‘আত্মহত্যার’ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন সানজানা

সানজানা আত্মহত্যা করবেন এটা আগে থেকেই পরিকল্পনা করেছিলেন। কারণ তার সহপাঠীদের কাছ থেকে যে বই নিয়েছিলেন সেগুলো একটি প্যাকেটে মুড়িয়ে সেখানে ট্যাগ লাগিয়ে রেখেছিলেন কাকে এই বই দেওয়া হবে।

তাছাড়া আত্মহত্যার আরও বেশ কিছু আলামত পায় পুলিশ। সানজানার মৃত্যুর পর অনেকে বলেন, সানজানাকে তার বাবা যৌন নিপীড়ন বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করতেন। এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে বা পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এমন কিছু পাওয়া যায়নি। তবে বাবা শাহীনের গৃহপরিচারিকার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক বা দ্বিতীয় বিয়ের কারণে মানসিক অশান্তিতে ভুগছিলেন সানজানা।

সূত্র: ঢাকাটাইমস

Related Articles

Latest Articles