8.6 C
Toronto
বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

যে কারণে ফিলিপ এলিজাবেথের প্রেমকাহিনি সবার ঊর্ধ্বে

- Advertisement -
ছবি: সংগৃহীত

প্রিন্স ফিলিপের জীবনে প্রেম এসেছিল ১৭ বছর বয়সে। সেই প্রেমকেই পরিণতি দিয়ে পৃথিবীবিখ্যাত রানি এলিজাবেথকে পেয়েছিলেন স্ত্রী হিসেবে। সেই স্ত্রীই আজ ফিলিপের মৃত্যুর ঠিক ১৭ মাস পর ওপারে পাড়ি জমালেন তার স্বামীর উদ্দেশে।

বিষয়টি অনেকটাই অবাক করার মতো। তবে তাদের জীবনে শুধু এই একটি বিষয়ই অবাক করার মতো নয়। পুরো জীবনে তাদের প্রেমকাহিনি সত্যিই হার মানিয়ে দেবে সব চলচ্চিত্রকে। যেকোনো ব্যক্তিজীবনের প্রেমকাহিনিকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে তাদের প্রেমকাহিনি।

ঘটনা শুরু হয় প্রিন্স ফিলিপের জন্মের মধ্য দিয়ে। ১৯২২ সালের ১০ জানুয়ারি গ্রিসের এক দ্বীপ কর্ফুতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন গ্রিসের প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও ব্যাটেনবার্গের প্রিন্সেস এলিসের কনিষ্ঠতম সন্তান এবং একমাত্র পুত্র।

অন্যদিকে চার বছর পর ১৯২৬ সালের ২১ এপ্রিল লন্ডনের মেফেয়ার এলাকার ১৭ ব্রুটন স্ট্রিটে জন্মগ্রহণ করেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ।

১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন তার বোন মার্গারেট রোজ। যদিও আন্তরিক এক পরিবেশে বেড়ে ওঠা এলিজাবেথ ছিলেন তার বাবা এবং দাদা পঞ্চম জর্জ উভয়ের অত্যন্ত পছন্দের।

এদিকে গ্রিস ও ডেনমার্কের রাজকুমার হওয়া সত্ত্বেও প্রিন্স ফিলিপের জীবন ছিল অনেকটা ছন্নছাড়ার মতোই। কেননা, গ্রিসে এক অভ্যুত্থানের কারণে তাদের সে দেশ থেকে বিতাড়িত হতে হয়।

এরপর মাত্র আট বছর বয়সে ফিলিপ সম্মুখীন হন কঠোর বাস্তবতার। মাকে চলে যেতে দেখেন মানসিক হাসপাতালে। আর বাবা এক প্রেমিকাকে নিয়ে চলে যান ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরাতে।

এমন পরিস্থিতিতে মায়ের আত্মীয়স্বজনই ফিলিপের লালনপালনের দায়িত্ব নেন। কৈশোরে তিনি পড়াশোনা করেন স্কটল্যান্ডের এক বোর্ডিং স্কুলে। ১৯৩৭ সালে ১৬ বছর বয়সে তিনি তার চার বোনের এক বোনকে বিমান দুর্ঘটনায় হারান।

এ প্রসঙ্গে প্রিন্স ফিলিপের স্মৃতিচারণা ছিল অনেকটা এ রকম: ‘আমাদের পরিবার ভেঙে গেছে, আমার মা ছিলেন অসুস্থ, আমার বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে এবং আমার বাবা তখন ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে। আমাকে এই সবকিছু মেনে নিতে হচ্ছিল।’

আর ঠিক তখনই মরূদ্যানে এক পশলা বৃষ্টির মতো ফিলিপের জীবনে আবির্ভূত হন রানি এলিজাবেথ। মেধাবী ফিলিপ তখন ক্লাসের সেরা ক্যাডেট হিসেবে প্রশিক্ষণ শেষ করেছেন। সেই সময় সেখানে এক সরকারি সফরে যান রাজা ষষ্ঠ জর্জ এবং তার দুই মেয়ে।

১৯৩৯ সালে তখন ১৭ বছর বয়সী প্রিন্স ফিলিপের ওপর দায়িত্ব পড়ল রাজার দুই মেয়ে প্রিন্সেস এলিজাবেথ ও প্রিন্সেস মার্গারেটের দেখাশোনা করার।

সেই থেকে জীবনের অনেক পরিবর্তনই আসে এই দুই রাজপরিবারের সদস্যের। রানি এলিজাবেথের গভর্ন্যান্স মেরিয়ন ক্রফোর্ডের বক্তব্যে তা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

স্মৃতিচারণায় তিনি বলেছিলেন, তখন প্রিন্স ফিলিপ নিজেকে বেশ একটু জাহির করছিলেন। ১৩ বছর বয়সী প্রিন্সেস এলিজাবেথের মনে তিনি বেশ ভালো ছাপ রাখতে সক্ষম হন।

এরপর ১৯৪২ সাল। ২১ বছর বয়সী ফিলিপ তখন রাজকীয় নৌবাহিনীর কনিষ্ঠতম এক ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট, তাই অনেকটাই সখ্য গড়ে ওঠে তার ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে।

এদিকে রানি যে প্রিন্স ফিলিপের প্রেমে পড়েছেন, তখন মোটামুটি তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সবার কাছেই। প্রিন্সের ছবি নিজের ঘরে রেখেছিলেন এলিজাবেথ। কিশোরী বয়সে তাদের মধ্যে চিঠিও আদান-প্রদান হতো নিয়মিত।

প্রিন্স ফিলিপের জীবনীকার ফিলিপ এইডের মতে, ১৯৪৬ সালে যেসব চিঠি প্রিন্স ফিলিপ লেখেন, তাতে একজন উৎসাহী তরুণ যেন জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছেন–এমন ধারণাই পাওয়া যায়।

এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে সাময়িকভাবে অক্সিলিয়ারি টেরিটোরিয়াল সার্ভিসে (এটিএস) যোগ দিয়েছিলেন তরুণ রাজকুমারী। সে সময় লরি চালানোও শিখে নেন। ইউরোপে যুদ্ধের সমাপ্তি উদ্‌যাপন করতে হাজারো মানুষ যখন বাকিংহাম প্যালেসের সামনে জড়ো হন, সেদিন রাজপরিবারের সঙ্গে যোগ দেন এলিজাবেথও।

কিন্তু যুদ্ধের পর তার প্রিন্স ফিলিপকে বিয়ে করার ইচ্ছা নানা বাধার মুখে পড়ে। এলিজাবেথ ছিলেন রাজার আদরের মেয়ে। ফলে ফিলিপের বিদেশি বংশপরিচয়ের কারণে রাজা তার হাতে মেয়েকে তুলে দিতে রাজি হননি। ফিলিপের সামনে তখন বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রতিষ্ঠিত এই কুসংস্কার কাটিয়ে ওঠা।

বিদেশি ফিলিপ স্ত্রীর প্রতি কতটা বিশ্বস্ত থাকবে–এ নিয়েও অনেক সংশয় ছিল রাজপরিবারের মধ্যে। মনের সংশয় দূর করতে প্রিন্স ফিলিপ হবু শাশুড়িকে একটি চিঠি লিখেছিলেন।

চিঠির ভাষা ছিল অনেকটা এরকম: ‘আমি জানি, আমার জীবনে ভালো যত কিছু ঘটেছে, তার সবকিছুর উপযুক্ত আমি নই। যুদ্ধ থেকে বেঁচে এসে বিজয় দেখা, বিশ্রামের সুযোগ পাওয়া এবং নিজেকে নতুন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া, এরপর পুরোপুরি প্রেমে পড়া–এত কিছুর পর নিজের ব্যক্তিগত এবং বিশ্বের তাবৎ সমস্যাকে একেবারেই ক্ষুদ্র মনে হয়।’

১৯৪৭ সালের ২০ নভেম্বর পূর্ণতা পায় এলিজাবেথ-ফিলিপের ভালোবাসা। সেদিন ওয়েস্টমিনস্টার গির্জায় বিয়ে করেন তারা। এর মধ্য দিয়ে ফিলিপের উপাধি হয় ডিউক অব এডিনবরা।

এরপর বাবার মৃত্যু, রাজকার্য সামলানো, ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করা সব ক্ষেত্রেই সবসময় স্বামীকে পাশে পেয়েছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ।

জীবনে যদিও তাদের অনেক ভুল বোঝাবুঝি কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়ন ঘটেছে, তবে সেগুলোকে যেন হারিয়ে দিয়ে জিতে গিয়েছে তাদের ভালোবাসা।

পৌত্র যুবরাজ উইলিয়াম তার দাদা-দাদির সম্পর্ক নিয়ে বলেন, তারা দুজন দারুণ এক দম্পতি। দৃষ্টিভঙ্গির তফাত থাকায় দাদার অনেক কথাই দাদিকে হাসাতে পারে।

তাদের সম্পর্ক নিয়ে রাজপরিবারের একান্ত সচিবের ভাষ্য: সারা বিশ্বে প্রিন্স ফিলিপ একমাত্র মানুষ, যিনি রানিকে নেহাত অন্য একজন মানুষ হিসেবে দেখতেন, সেভাবেই তার সঙ্গে ব্যবহার করতেন। রানির জীবনে একমাত্র তিনিই এটা করতে পারতেন।

দীর্ঘ ৭৩ বছরের বিবাহিত জীবনের সমাপ্তি ঘটেছিল ২০২১ সালের ৯ এপ্রিল। ৯৯ বছর বয়সী প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যুর পর অনেকটাই একা হয়ে গিয়েছিলেন রানি। কিন্তু এই একাকিত্ব যেন বেশি দিন বয়ে বেড়ালেন না তিনি। ঠিক স্বামীর মৃত্যুর ১৭ মাস পর রানিও যেন পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে।

Related Articles

Latest Articles