25.5 C
Toronto
সোমবার, আগস্ট ৮, ২০২২

১৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে শহীদুজ্জামান

- Advertisement -

১৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে শহীদুজ্জামান

মো. শহীদুজ্জামান। তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একজন প্রভাবশালী নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল)। গত বছরের শুরুর দিকে ছুটি নিয়ে সেই যে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন আর ফেরেননি। একাধিকবার নোটিস দিয়েও তাকে কর্মস্থলে ফেরত আনা যায়নি। বাধ্য হয়ে শহীদুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। পরে তাকে নামিয়ে দেওয়া হয় নিচের পদে।

জানতে চাইলে বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান বলেন, ‘নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহীদুজ্জামান ছুটির নাম করে আমেরিকায় চলে গেছেন। তাকে ফেরত আসতে কয়েকবার নোটিস করা হয়েছিল। তিনি নোটিসের জবাব দিয়েছিলেন। কিন্তু জবাবটি ছিল এলোমেলো। জবাবটি রিজেক্ট করে দিয়েছি। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।’

বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, টেন্ডার বাণিজ্যে শহীদুজ্জামানের সঙ্গে আর কারা কারা জড়িত আছেন তাদেরও চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। দুর্নীতিবাজরা বেবিচকে থাকতে পারবেন না এটিও আগে বলেছি। এসব লোককে স্থান দেওয়া হবে না।’

এর আগে বেবিচকে তদবির ও নিয়োগ বাণিজ্যের হোতা সংস্থার প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল খালেকও দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তার বিরুদ্ধে অন্তত ১০০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, বরখাস্তকৃত নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুজ্জামান ২০০০ সালের ২২ নভেম্বর চাকরিতে যোগ দেন। যোগদানের কয়েক মাস পর জড়িয়ে পড়েন টেন্ডার বাণিজ্যে। বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে হাতিয়ে নেন মোটা অঙ্কের অর্থ। আর এই সুযোগে পরিবারের সদস্যদের পাঠিয়ে দেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা এভিনিউতে। বেবিচক কর্তৃপক্ষকে ‘বোকা’ বানিয়ে ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি শহীদুজ্জামানও পাড়ি জমান নিউ ইয়র্কে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শহীদুজ্জামানের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের হরিকুমারিয়ার শহীদ বাচ্চু সরণি এলাকায়। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকতেন উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর রোডের ৪১ নম্বর বাসায়। এই বাড়িটি তার নিজের বলে জানা গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, বেবিচকে শহীদুজ্জামানের চাকরি হয়েছিল তদবির ও অর্থের বিনিময়ে। টেন্ডার বাণিজ্যের জন্য তিনি একটি চক্র গড়ে তুলেছিলেন। প্রায় বিশ বছর ধরে বেবিচকে বিভিন্ন প্রকল্পে টেন্ডার বাণিজ্য করে হাতিয়ে নিয়েছেন অন্তত দেড়শ কোটি টাকার মতো। গত বছরের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গেলেও চলতি বছরের প্রথম দিকে গঠন করা হয় দুটি তদন্ত কমিটি। দীর্ঘ তদন্ত শেষে শহীদুজ্জামানকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুজ্জামান ছিলেন অনেকটা বেপরোয়া। তিনি বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে কমিশন নিতেন। আবার তিনি নিজেও ছদ্মনামে টেন্ডার বাগিয়ে নিতেন। বেবিচকের প্রকৌশল বিভাগের অনেকেই তার ভয়ে কথা বলতেন না। নামে-বেনামে দেশে-বিদেশে তার প্রচুর সম্পদ রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, তারা নিশ্চিত হয়েছেন টেন্ডার বাণিজ্য করে অন্তত দেড়শ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন শহীদুজ্জামান। তিনি আরও বলেন, তারা শুনেছেন নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকায় শহীদুজ্জামান একটি বাড়ি কিনেছেন। তাছাড়া সেখানে দুটি দোকানও রয়েছে। ঢাকার উত্তরায় একটি আলিশান বাড়ি আছে।

বেবিচকের প্রকৌশল শাখার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, চলতি বছরের ২৭ জুলাই বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান একটি চিঠি ইস্যু করেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুজ্জামান আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে ২১ দিনের ছুটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান। কিন্তু তিনি ছুটি কাটিয়ে আর অফিসে ফেরত আসেননি। তিনি বিনা অনুমতিতে বিদেশে অবস্থান করায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এবং তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ ও পলায়নের’ অভিযোগ আনা হয়। পরে ২০২১ সালের ১৩ এপ্রিল শহীদুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। মামলা দায়েরের পর শহীদুজ্জামান ২০২১ সালের ২৫ মে ই-মেইলে নোটিসের জবাব পাঠান। ওই জবাবে তিনি বলেন, আমি অসুস্থ। এই জন্য আসতে পারিনি।’ কিন্তু তার চিঠির জবাবটি বেবিচক আমলে না নিয়ে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। শুনানিতে উপস্থিত না হওয়ায় ‘অসদাচরণ ও পলায়নের’ বিষয়টি প্রমাণিত হয় তদন্ত কমিটির কাছে। এসব দিক বিবেচনা করে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি তাকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) হিসেবে ৯ম গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে স্থায়ীভাবে অবনমন করা হয়। এ সংক্রান্ত চিঠিতে বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তির চূড়ান্ত আদেশ জারির তারিখ থেকে ইতিমধ্যে অনুপস্থিতি ৬০ দিনের বেশি হওয়ায় বেবিচকের কর্মচারী চাকরির প্রবিধিমালায়, ২০২১ এর ৪৯ (গ) বিধি অনুযায়ী শহীদুজ্জামানকে পলাতক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তার এই অনুপস্থিতি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেও ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করে বেবিচকের তালিকাভুক্ত কয়েকজন ঠিকাদার গতকাল বলেন, শহীদুজ্জামান নানা অনিয়মে জড়িত। সঠিকভাবে টেন্ডার পাওয়ার পরও তিনি ফাইল আটকে রাখতেন। এক কোটি টাকার কাজ হলে তাকে অন্তত ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত কমিশন দিতে হতো। এই রকম অসংখ্য অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। তিনি কয়েকজনকে নিয়ে চক্রও গড়ে তোলেন। তিনি না থাকলে তার চক্র সক্রিয় আছে বলেও জানান ওই ঠিকাদাররা।

সূত্র : দেশ রূপান্তর

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles