15.6 C
Toronto
শনিবার, মে ২৮, ২০২২

অকালপ্রয়াত কবি প্যাট লোথারের কবিতা

- Advertisement -
অকালপ্রয়াত কবি প্যাট লোথারের কবিতা - The Bengali Times
ফাইল ছবি

কানাডীয় প্রদেশ ভ্যানকুভারের কবি প্যাট লোথার খুন হন ১৯৭৫ সালে, মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে। মৃত্যু পর্যন্ত মাত্র চারটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল এই দুর্ভাগা কবির। মৃত্যুর বছরখানেক আগে লীগ অব কানাডিয়ান পোয়েটস-এর সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন প্যাট। ১৯৭৮ সালে কানাডীয় সাহিত্য ভুবনের অগ্রগণ্য পুরুষ মার্গারেট অ্যাটউড (জন্ম. ১৯৩৯) প্যাট লোথারকে নিয়ে রচিত এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ÔLowther’s death is specially sad because she was obviously just coming into her own. Techniques mastered, vision clarifying, she was on the verge of writing more deeply and with greater range than she had ever done’ (সেকেন্ড ওয়ার্ডস, পৃ.৩০৯)।

প্যাট লোথার সেই অর্থে ‘প্রতিষ্ঠিত’ হওয়ার আগেই খুন হন। প্যাটের কথা প্রথম আমি জানতে পারি কানাডীয় সেলিব্রেটি লেখক ক্যারল শীলডসের (১৯৩৫-২০০৩) গভর্নর জেনারেল এবং পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস ‘দ্য স্টোন ডায়েরিজ’ (১৯৯৩) পড়তে গিয়ে। তখন প্রথম জানতে পারি বইয়ের নামে রয়েছে অন্য একটি কাব্যের প্রভাব। সে কাব্যগ্রন্থটির নাম ‘অ্যা স্টোন ডায়েরি’। লেখক হলেন প্যাাট লোথার। নিহত হওয়ার ঠিক আগের বছরেই প্যাটের আরেকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল ‘মিল্ক স্টোন’ নামে, যেটির মধ্যেও ‘স্টোন’ শব্দটি দেখতে পাওয়া যায়। ‘মিল্ক স্টোন’ ছিল দুর্ভাগা এই কবির চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ। প্রথম বই ‘দ্য ডিফিকাল্ট ফ্লাওয়ারিং’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৮ সালে, ততোদিনে কবি যদিও তিরিশের কোঠায় পৌঁছে গেছেন। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য এইজ অব বার্ড’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। ‘ইনফাইনাইট মিরর ট্রিপ’-এর রচনাকাল ‘মিল্ক স্টোন’ প্রকাশের বছরেই। টোবি ব্রুকস জানাচ্ছেন ওই বছরের আগস্ট মাসে ভ্যাঙ্কুভারের এইচ আর ম্যাকমিলান প্লানেটরিয়ামে সেটি মঞ্চস্থ হয় (পৃ. ২৫৭)। মঞ্চোপযোগী সে রচনায় রয়েছে কাব্যিক অনেকগুলো পঙ্ক্তি। ক্রিস্টিন ওয়েসেন্থাল সেগুলোকে ‘দ্য কালেকটেড ওয়ার্কস অব প্যাট লোথার’ গ্রন্থে সংকলন করেছেন।

- Advertisement -

এবং সেভাবেই আমরা দেখতে পাই ১৯৭৪ সালে প্যাট নিজেকে কাব্যজগতে প্রতিষ্ঠার দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছেন। এসময় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসে তিনি ‘অ্যা স্টোন ডায়েরি’র পান্ডুলিপি পাঠিয়েছেন এবং সেটা গৃহীত হয়েছে। এরপর দেখতে পাই তিনি ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়াতে খন্ডকালীনভাবে ক্রিয়েটিভ রাইটিং শেখাচ্ছেন। ১৯৭৫-এর জুলাইতে প্রিন্স অ্যাডোয়ার্ড আইল্যান্ড বা পিইআইতে গেলেন কবিতা উৎসবে। সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখে আরেক জায়গায় কবিতা পড়বেন বলে নির্ধারিত হয়ে ছিল। এবং এর ঠিক আগে আগেই ভ্যাঙ্কুভারের ফারি ক্রিকে তার মৃতদেহ আবিস্কৃত হয়।

জীবদ্দশাতেই প্যাট অনেকগুলো পান্ডুলিপি হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন টোবি ব্রুকস তাঁর গ্রন্থ Pat Lowther’s Continent : Life and Works-র মুখবন্ধে। প্যাট নিহত হবার পর স্বামী রয় লোথার নিজেই আরও অনেকগুলোকে ধ্বংস করেছেন। হত্যাকারী হিসেবে রয়কে পুলিশ অ্যারেস্ট করার পর পুরো পরিবারকে ভাড়া বাড়িতে গিয়ে উঠতে হয় এবং বাসা বদলের কারণে অনেক লেখালিখি নষ্ট হয়ে যায়। ১৯৭৭ সালের ২২-এ এপ্রিল স্ত্রী হত্যার দায়ে রয়ের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। ১৯৮৫ সালের ১৪ জুলাই কারাগারে রয় লোথার মৃত্যুবরণ করেন।

যে বছর রয়ের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ কোর্টে প্রমাণিত হলো, সে বছরই প্রকাশিত হয় প্যাট লোথারের ম্যাগনাম ওপাস ‘অ্যা স্টোন ডায়েরি’। দুই বছর দেরি হওয়ার প্রধান কারণ গ্রন্থের সত্ত্বাধিকারী নির্ধারণ করতে না পারা। বছরের পর পার হতে লাগলো। ছেলে-মেয়েদের মধ্যে মায়ের হত্যা এবং বাবার মৃত্যুর শোক ক্রমে ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে আসতে লাগলো। কুড়ি বছর পর মেয়ে বেথ লোথার একদিন ভাইয়ের চিলেকোঠার ঘরে আবিষ্কার করলো একটি ট্রাঙ্ক, যার মধ্যে রাখা ছিল অনেক কবিতা, প্রকাশিত, অপ্রকাশিত সব। ওই ট্রাঙ্কেই মিললো একটা পান্ডুলিপি যেটি প্যাট নিজেই প্রস্তুত করে গিয়েছিলেন প্রকাশককে দেওয়ার জন্য। মেয়ে বেথ সেগুলোকে এক জায়গায় করে প্রকাশের উদ্যোগ নিলেন। ১৯৯৭ সালে ছাপা হলো ‘টাইম ক্যাপসুল: নিউ অ্যান্ড সিলেক্টেড পোয়েমস’। ২০১০ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত-অপ্রকাশিত সব লেখা নিয়ে ছাপা হয় সুসম্পাদিত গ্রন্থ ‘কালেক্টেড ওয়ার্কস অব প্যাট লোথার’।

প্যাটের ব্যক্তিমানসের দিকে যদি আমরা তাকাই, দেখতে পাবো তিনি মাত্র ষোলো বছর বয়সেই পড়াশোনা ত্যাগ করেন এবং উপার্জনে যুক্ত হন। ১৮ বছর বয়সেই প্রথমবার বিয়ে করেন, ১৯ বছর বয়সেই প্রথম সন্তানের মা হন। ২১ বছর বয়সেই তিনি দ্বিতীয় সন্তান প্রসব করেন। ২৪ বছর বয়সে প্রথম স্বামীর সাথে প্যাটের বিচ্ছেদ ঘটে। ২৮ বছর বয়সে রয় লোথারের সাথে তার বিয়ে হয়।

১৯৬৮ সালে প্যাটের প্রথম কবিতার বই প্রকাশের আগে যেসব কবিতা অগ্রন্থিত রয়েছে সেগুলোকে ‘কালেক্টেড ওয়ার্কস’ গ্রন্থের শুরুতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেকালে রচিত মোট ২৮টি কবিতা আমরা পাই। ‘দ্য ডিফিকাল্ট ফ্লাওয়ারিং’ গ্রন্থেও আছে মোট ২৮টি কবিতা। এই সময়ে আমরা বুঝতে পারি, প্যাট কবিতার বিষয় করেছেন নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে। সে অভিজ্ঞতাকে উপস্থাপনে শৈলীর নিরীক্ষাও এ সময় থেকেই লক্ষ করা যায়। এই গ্রন্থেরই একটি কবিতার নাম ‘টু বেবিজ ইন টু ইয়ারস’, যেখানে শুরুর স্তবকটি এরকম :
Now am I one with those wide-wormed
mediterranean women
who pour forth litters of children
mouthful of kisses and shrieks

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার এইসব উচ্চারণ ‘মিল্ক স্টোন’-এ এসে নতুন অভীক্ষা নিয়ে পাঠকের সামনে উপস্থিত হয়। এই গ্রন্থেরই একটি দীর্ঘ কবিতার নাম ‘ইন দ্য কনটিনেন্ট বিহাইন্ড মাই আইস’। কবিতাটির তৃতীয় অংশে কবি তার বাবার স্মৃতিচারণ করেন। কবিতার ভাষায় :
When I was a child
my father worked with water,
adjusting flow and level,
going out from this bed
into 3 in the morning storms
to keep the screens clear…. (পৃ. ১২৪)

এবং সুখপাঠ্য সে স্তবকের শেষ পঙক্তিতে কবি যখন বলেন ‘and there I worked on water’, কবিতাটি যেন মুহূর্তেই ভিন্ন একটি প্রতীকী অর্থকে ধারণ করে ফেলে। এই গ্রন্থেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে প্যাটের বহুল উচ্চারিত কবিতা ‘টু ক্যাপচার প্রোটিয়াস’, পাশাপাশি দুই কলামে সাজানো এই কবিতাটি। এই কবিতাটিতেই রয়েছে প্যাটের বিখ্যাত সেই পঙ্ক্তি ‘a man I love / in every man’, যে ভাবনাটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় উপস্থিত হয় এই কবিতায়। একসময় তিনি বলেন, ‘At the beginning I noticed / the huge stories on my path…’। এই কবিতার শেষের স্তবকটিও যেন অভিনব এক যাত্রার ইঙ্গিতবাহী। কবি বলেন :
I shall surprise you asleep
and hold you
through all your changes
till you make me
pregnant with the world

মৃত্যু পর্যন্ত প্যাট লোথারকে আমরা সক্রিয় দেখি কবিতাকর্মী হিসেবে। দেখতে পাই তিনি প্রতিষ্ঠিত কবিদের সাহচর্য পাচ্ছেন। কবিতা পাঠের আমন্ত্রণ পাচ্ছেন। কিন্তু মৃত্যুর দুই বছর পর যখন ‘অ্যা স্টোন ডায়েরি’ প্রকাশিত হলো, তখনই বোধ করি সহযাত্রী অন্য কবিরা, তাঁর কবিতার পাঠকেরা অনুধাবন করলেন প্যাট আসলে পৌঁছে গিয়েছিলেন কাব্যরচনার উচ্চতর স্তরে। গ্রন্থের নাম-কবিতাটি সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে শুরুতেই। শুরুর পঙ্ক্তিই হলো ‘‘At the beginning I noticed / the huge stories on my path…’’. প্রতিকূলতার মধ্যে অবস্থান করেও তিনি লিখলেন, Do you know / how beautiful it is / to embrace stone / to curve all you body / against it surfaces?’ স্পষ্ট হয় একটি সাহসী সত্তা দাঁড়িয়ে আছে সমাজের সকল অসাম্যকে জয় করতে। ‘চাকাবুকো, দ্য পিট’ কবিতায় যখন তিনি উচ্চারণ করেন ‘some one decides / who shall eat / who shall not eat / who shall be beaten / and on which / path of the body’। আমরা বুঝতে পারি অন্যায় ও অন্যায্যকে প্রতিরোধ করতে প্যাট লোথারের উচ্চকণ্ঠ। আর তাই তিনি বলেন, ‘Let statemen’s tongues lock / between their jaws, / let businessmen’s cheque hands / be paralyzed….’

সর্বসাকুল্যে ১৯৪টি কবিতা পাওয়া যায় প্যাটের লেখা। সে-কবিতাগুলোতে অমন প্রতিবাদী উচ্চারণ যেমন পাওয়া যায়, তেমনি তার হতাশার ছবিও দুর্লভ নয়। আর তাই হয়তো তিনি নিজেই বার বার চেয়েছেন জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে। অগ্রন্থিত কবিতা ‘to escape the pain’-এর তিনটি অংশেই রয়েছে তেমন সব চিত্র, তিনটির নাম ‘দ্য ফায়ার’, ‘আই অ্যাম টায়ার্ড’ এবং ‘হোয়াট আই ওয়ান্ট’। ‘আই অ্যাম টায়ার্ড’ কবিতায় i go down / to the grains of soil / to bacteria / to viruses / to the neat mechanics of molecules’-এ কবি একসময় উচ্চারণ করেন ‘I am silent now / as if you had taken / language from my work’. প্যাট লোথারের এই অন্তর্যাতনা তাঁর শেষ কবিতা পর্যন্ত প্রসারিত। ‘কনটিনিউইটি’ কবিতায় সে কারণেই তাঁকে আমরা বলতে শুনি ‘I am silent now / as if you had taken / language from my work’। কবি ও প্রেমিকা প্যাট লোথারের এই উচ্চারণ কিন্তু তার প্রেমাস্পদকে উদ্দেশ্য করেই। কবিতায় আমরা শুনতে পাই ‘a stone lies on my tongue’। সেটি আসলে প্যাট কাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন? সেটি কি তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকা বর্তমান স্বামীর উদ্দেশ্যে, নাকি নতুন কোনো কবি-প্রেমিককে নিয়ে?

একথা সত্য, অধিকাংশ কবির ক্ষেত্রে যেমনটি ঘটে, তার ব্যত্যয় প্যাট লোথারের ক্ষেত্রেও ভিন্ন ছিল না। মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই দেখা যায় বাজারে প্যাট লোথারের কোনো বই আর সহজলভ্য ছিল না। যদিও এর মধ্যেই ১৯৮০ সালে লীগ অব কানাডিয়ান পোয়েটস-এর উদ্যোগে নারী কবিদের জন্যে প্যাট লোথার স্মৃতি পুরস্কারের প্রবর্তন হয়। এখন পর্যন্ত কোনো বছর সে-পুরস্কার প্রদানে ব্যত্যয় ঘটেনি। প্রথিতযশা কবিদের মধ্যে গুয়েনডলিন ম্যাকইয়ান, ডিয়োন ব্রান্ড, রু বরসন এই পুরস্কার গ্রহণ করে সম্মানিত বোধ করেছেন।

২০০০ সালে প্রকাশিত টোবি ব্রুকসের বইটি প্যাটের জীবনকে আশ্রয় করে একটি অসামান্য প্রয়াস। প্যাটের কবিতার অগ্রসরণ এবং তাঁর জীবনযাত্রাকে অনেক গবেষণার ফসল হিসেবে টোবি প্রকাশ করেছেন এই গ্রন্থটি। প্যাটের সমকালীন কবি-সাহিত্যিক-সাহিত্যকর্মী এবং পরিবারের সদস্য, মোট ৪৮ জনের সাথে কথা বলে টবি তৈরি করেছেন সুলিখিত এই জীবনীগ্রন্থটি। প্যাট লোথার চর্চায় এটি অসামান্য এক সংযোজন। প্রকাশিত, অপ্রকাশিত, গ্রন্থিত, অগ্রন্থিত মোট ১৯৪টি কবিতাকে রচনাক্রম অনুযায়ী উপস্থাপন করে সম্পাদক তাঁর পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছেন।

তবে ২০০৫ সালে ক্রিসটিন ওয়েসেন্থালের
তবে স্বীকার করতেই হবে ক্যারল শীল্ডসের উপন্যাস ‘সোয়ান’ (১৯৮৭) প্রয়াত এই কবির জীবনকে আশ্রয় করে মূল্যবান এক উপন্যাস। প্যাট লোথার সামগ্রিক কাব্যজগত মূল্যবান ছিল বলেই ২০১৭ সালে টরেন্টো থেকে প্রকাশিত বিশিষ্ট সাহিত্য সমালোচক টরেন্টো বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিক মাউন্টের বই ‘অ্যারাইভাল’-এ উনিশ শ ষাট ও সত্তরের দশকের কবি ও কবিতা প্রাসঙ্গিকতায় বারবার উঠে আসে অকালপ্রয়াত মেধাবি কবি প্যাট লোথারের নাম।

সহায়ক গ্রন্থ
1. Pat Lowther’s Continent : Life and Works, Toby Brooks, Gynergy Books, Charlottetown, 2000
2. Collected Works of Pat Lowther, ed by Christine Wiesenthal, Newest Press, Edmonton, 2010
3. Selected Words : Selected Critical Prose, Margaret Atwood, Anansi, Toronto, 1982

ইস্টইয়র্ক, অন্টারিও, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles