8.2 C
Toronto
বুধবার, মে ১৮, ২০২২

স্যারের আনন্দময় ভবিষ্যত কামনা করি

- Advertisement -
স্যারের আনন্দময় ভবিষ্যত কামনা করি - The Bengali Times
ফাইল ছবি

২০০০ সালের বইমেলায় সনৎকুমার সাহার প্রথম গ্রন্থ সমাজ সংসার কলরব প্রকাশিত হয়েছিল। খুব বেশি সাড়া জাগিয়েছিল তেমন নিশ্চয়ই বলা যাবে না। তবে যাঁরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির কৃতী এই অধ্যাপকের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে অবহিত তাঁরা নিশ্চয়ই তাগিদ বোধ করেছেন সনৎকুমারের লেখনী হাতে নিতে। অতঃপর হাত থেকে বইটি ছেড়েছেন পাঠ ব্যতিরেকেই এমন নজির নিশ্চয়ই খুব বেশি নেই। আর লেখকের জাদু এই যে, পাঠক এক মুগ্ধতার আবেশে গড়িয়ে গড়িয়ে শেষ পৃষ্ঠায় গিয়ে ঠেকেন – উত্তেজনাহীনভাবে কিন্থ অদ্ভুত এক ঋদ্ধতায়। তাঁর পঞ্চম প্রবন্ধগ্রন্থটিও সনৎকুমারের ধরনের ব্যতিরেক নয়। মাঝখানে এসেছিল আকাশ পৃথিবী রবীন্দ্রনাথ, ভাবনা অর্থনীতির : বিশ্বায়ন উন্নয়ন ও অন্যান্য এবং কথায় ও কথার পিঠে।

তবে গ্রন্থের চব্বিশটি রচনাকে এমন সরলরৈখিকভাবে সীমানা টেনে আলাদা করা অনুচিত বলে বর্তমান আলোচকও মনে করেন। সনৎকুমারের রচনাশৈলীর বৈশিষ্ট্যই এই যে, না-ব্যক্তিক প্রবন্ধগুলোর ভেতরে যেমন সহজেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রয়েছে প্রবেশাধিকার, তেমনি ব্যক্তিক-রচনাসমূহও মুহূর্তে হয়ে পড়ে নৈর্ব্যক্তিক ভাবনাপুঞ্জের বহিঃপ্রকাশ। তবে গ্রন্থভুক্ত কয়েকটি রচনাই ঠিক যেন প্রবন্ধ-ধাঁচেরও নয়। যেমন প্রতিটিতেই রয়েছে লেখকের ব্যক্তিভাবনার প্রত্যক্ষ প্রকাশ। তবে পাঠকের আদর-প্রাপ্তিতে এ অভিধা সহজেই প্রদানযোগ্য যে, সনৎকুমার সাহা গদ্য রচনায় একটি আলাদা ধরন নির্মাণ করেছেন – স্বকীয়তায় উজ্জ্বল সে ধরনে লেখকের স্থিতি প্রকৃত অর্থে তাঁর প্রথম গ্রন্থ সমাজ সংসার কলরব থেকেই। গ্রন্থপাঠে পাঠকের মনে সনৎকুমার সাহা সম্পর্কে যে-ভাবনাসমূহ ক্রিয়াশীল হয় সেগুলোর অন্যতম হচ্ছে লেখকের স্বাজাত্যবোধ – বাঙালি জাতির স্বকীয়তার ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ এ লেখক স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সর্বদা বাঙালির স্বাধীনতার প্রশ্নেও নিজ কণ্ঠকে সাধ্যমতো উচ্চ রাখতে সচেষ্ট। দুই দশকের বেশি কাল ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যে-চত্বর মৌলবাদীদের নানা অশুভ তৎপরতায় কণ্টকিত, সনৎকুমার সাহার মতো লেখক-অধ্যাপক রাজনৈতিক শক্তির আশ্রয়ে না থেকেও সেখানে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে যেমনভাবে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করে চলেছেন তা সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে ভাবনাশীল যে কোনো নাগরিককে মস্তক অবনত করাতে বাধ্য। গত চার দশককাল ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রান্তরে রবীন্দ্র-নজরুলের সজীবতা উজ্জীবিত রাখতে যে গুটিকয় মানুষ প্রাণান্ত, তাঁদের অন্যতম সনৎকুমার সাহা। হাসান আজিজুল হক, আলী আনোয়ার, শহীদুল ইসলাম, সুব্রত মজুমদারদের কাতারে সনৎকুমার সাহাও গর্বের সঙ্গে উচ্চার্য এক নাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরুর প্রথম দশকগুলোতে সাহিত্যমনস্কতা, সংস্কৃতিবোধ এবং দেশীয় চেতনা সৃষ্টিতে অগ্রগ অন্য যে মানুষেরা কীর্তিমান তাঁরা হলেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, খান সারওয়ার মুরশিদ প্রমুখ। আর এই বাঙলায় গ্রন্থে পাঠকের সৌভাগ্য এই যে, সমকালীন বাংলাদেশের এইসব মনীষীর কর্মপদ্ধতি ও কর্মবিস্তার সম্পর্কে জানার কাজটি হতে থাকে গল্পের ছলে।

- Advertisement -

সনৎকুমার সাহা রাজনীতিক নন, রাজনীতির গবেষণাও তাঁর ক্ষেত্র নয়; কিন্থ রাজনীতি পর্যালোচনায় অদ্ভুত জহুরি তিনি। খুঁটিয়ে দেখার বিরল দৃষ্টির অধিকারী এ-লেখক। যেমনভাবে বঙ্গবন্ধুর তিনি একনিষ্ঠ অনুগামী, আবার একইসঙ্গে তাঁর চেতনায় স্থিত সাম্যবাদের প্রতি একনিষ্ঠতা। কিন্থ তাই বলে কোনোটাকেই বিচার-বুদ্ধির ঊর্ধ্বে রাখেন না সনৎকুমার। অনেক সহজ ভাষায় কঠিন এক পরিস্থিতির প্রাঞ্জল বিশ্লেষণ সনৎকুমারের দৃষ্টিতে এমন : ‘তবে অস্ত্র হাতে লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছি – এই দাবির বাড়াবাড়ি অনেক জটিলতা সৃষ্টি করে। ক্যাম্পাসে তখন অস্ত্রের ছড়াছড়ি। অস্ত্রের নিজস্ব ন্যায় আছে। তা ক্ষমতার অধিকার দাবি করে। অস্ত্রধারীর মন মেজাজও সেই অনুযায়ী পালটে যায়। কিন্থ মুশকিল বাধে, যখন দেখা যায় অনেকের হাতে মারণাস্ত্র।’ (পৃ ১৪৯) মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি বর্ণনায় লেখকের এ-বিবরণ।

লেখকের বিশ্লেষণী চেতনা বামদের ক্ষেত্রেও কম তীক্ষ্ণ নয়। ‘আমাদের তত্ত্বজ্ঞানীরা আর দলনেতারা ঘন ঘন বিপ্লবের ডাক দেন। শ্রেণিশত্রু চিনে নেবার, তাকে ঘৃণা করার, এমনকি তাকে খতম করার নির্দেশও তারা জারি করেন। কিন্থ সুনির্দিষ্টভাবে এই শত্রু চিনে নেবার পথ তারা বাতলে দেন না। অনেকে নিজের চেয়ে একটু সচ্ছল যে, অথবা নিজের মতো হলেও যার কিছু জমি-জিরেত বা অন্য কোনো স্থাবর সম্পত্তি আছে, তাকেই ঠাওরায় শ্রেণিশত্রু। হাতের কাছে তাকে পেয়ে তাকেই খতম করে বিপ্লবের নান্দীপাঠ সারে। সমাজ কিন্থ এতটুকু এগোয় না। পুঁজির দক্ষতা বাড়ে না।’ (পৃ ৭৮) আমরা বুঝতে পারি, বাংলাদেশের অধিকাংশ সমাজ-রাজনীতি বিশ্লেষকের যে একরৈখিক দৃষ্টিভঙ্গিগত ত্রুটি তা থেকে সনৎকুমার সাহা শত যোজন দূরে। কিন্থ তাঁর দ্বিধা নেই বঙ্গবন্ধুর যুগসৃজনকারী ৭ মার্চের ভাষণের পুঙ্খানুপুঙ্খ খুঁটিয়ে দেখায়, সে-ভাষণের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুকে বিশ্লেষণে অমর্ত্য সেনের লেখা থেকে উৎকলন করতেও।

‘নজরুল ও আমরা’ বর্তমান গ্রন্থের বিশেষভাবে উল্লেখের দাবিদার এক প্রবন্ধ। অনুচ্চারিত কিন্থ অবশ্য উচ্চারণযোগ্য এক প্রশ্ন জাতির সামনে করেছেন লেখক সনৎকুমার। ‘তাহলে কি বলব, তাঁকে জাতীয় কবির আসনে বসানো ছিল এক মহাভুল?’ (পৃ ৫০) গভীরে গেলে লেখকের সঙ্গে সকল পাঠকই সুর মেলাতে বাধ্য হবেন। লেখকের সরল অনুসন্ধান : কবি নজরুল ইসলাম ধর্মান্ধতা-বিরোধী কবি। আঞ্চলিকতার বা সামপ্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে তিনি নিজেকে সবসময় স্থান দিয়েছেন। অথচ বাংলা নামের দেশটি তো কবির মহাপ্রয়াণের তিন দশক পরও ধর্মান্ধতায় হাবুডুবু খাওয়া এক জাতি। কুসংস্কারের বেড়াজাল আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে জাতির সকল দুয়ার। আর তেমন একটি সমাজ-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে এমন একটি দেশের জাতীয় কবির আসনে কাজী নজরুল ইসলামের অবস্থিতি কি বেমানান নয় – লেখকের এ-প্রশ্ন যেন এক ব্যক্তিক নয়, যেন বৈশ্বিক চেতনার এক সম্মিলিত উচ্চারণ।

গ্রন্থে অনেকগুলো প্রবন্ধ রয়েছে যেগুলো মতিহার চত্বর মাড়ানো মানুষ মাত্রকেই আদৃত করবে। ফেলে আসা মতিহারকে যেন নতুন তুলিতে সনৎকুমার মতিহারের সেসব ভ্রামণিকের সামনে তুলে ধরেন। যেমনি এক নস্টালজিয়ার উৎসারণ, তেমনি যেন চেতনের প্রাখর্য সৃষ্টি। আর লেখকের লেখনভঙ্গির কারণে সেসব উপাদান যেন এলোমেলো ভিড় করে দাঁড়ায় সামনে, নিয়ে আসে সুদূর অতীতকে। আমরা যেন স্পষ্ট প্রত্যক্ষ করি মতিহারের চত্বরে খান সারওয়ার মুরশিদ বা জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মতো মনীষী অধ্যাপকের পদচারণা। হাসান আজিজুল হকের মতো দার্শনিক-কথাকারের সুপ্রিয় উপস্থিতি। কমচেনা মানুষ কিন্থ ব্যক্তিগতভাবে সনৎকুমারের চৈতন্যের অতিপরিচিত দুজন রঘুনাথ দাস ও হরিদাস মিশ্রের সরব কার্যক্রম। সনৎকুমার সাহার সার্থকতা এই, তিনি গ্রন্থভুক্ত মানুষগুলোকে সপ্রাণ উপস্থিত করেন সহজ প্রয়াসেই।

সমাজ সংসার কলরবের কৈফিয়তে লেখা জানিয়েছিলেন বিভিন্ন সময়ে লেখা রচনার সম্মিলিত রূপে গ্রন্থ প্রকাশের অসুবিধাসমূহ। ভাবনা বদলে যায়, লেখার ধরন বদলে যায়। লেখা-সৃষ্টির বাস্তব প্রেক্ষাপটও একই থাকে না। সে বিপদ লেখকের বর্তমান গ্রন্থেও কম হয়নি। এমনকি সূচিপত্র নির্মাণেও তেমন ত্রুটি সহজেই চোখে পড়ে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর আগে হাসান আজিজুল হক কেন? কেননা, সন্নিবেশে বয়ঃক্রম অনুসরণই তো স্বাভাবিক। আবার কজন আলোচিত জন শিরোনামে ভিন্নমাত্রিকতা গ্রহণ করায় প্রথম দৃষ্টে পাঠকের কাছে অস্পষ্ট থাকেন। মাহবুবুল আলম চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত, মুক্তি মজুমদার ও সালাউদ্দীন আহমেদের নাম সূচিপত্রে কায়দা করে হলেও উল্লেখ আবিশ্যক ছিল বলে বর্তমান আলোচনা-মত। লেখকের পরিচিত সেসব জনকে নিয়েই আলাদা একটি গ্রন্থ পাঠক কি সনৎকুমারের কাছে আশা করতে পারেন না? আরো কিছুজন স্বমহিমায় সেখানে উপস্থিত থাকুন, যেমন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, আলী আনোয়ার, শহীদুল ইসলাম প্রমুখ।

ইষ্টইয়র্ক, অন্টারিও, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles