4.2 C
Toronto
শনিবার, অক্টোবর ২৩, ২০২১

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০বছর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০বছর

৯০ গণ অন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ে কাটলো গোটা ফার্স্ট ইয়ার। ঢাকা কলেজের চৌহদ্দি মাড়িয়ে সবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠে পা রেখেছি। সায়েন্স এ্যানেক্স ভবনের চারতলায় ইউ-শেপের সমগ্র বাঁক জুড়ে স্ট্যাটিস্টিক্স ডিপার্টমেন্ট। অগ্রভাগের পুরোটা খোলা বারান্দা। নব্বুইয়ের বসন্ত শেষে এক দঙ্গল তরুণ তরুণী মাতিয়ে তোলে এ বারান্দা। নীচে গণিত, ভুগোল ও আইন বিভাগ। যৌবানন্দে সিঁড়ি ভেঙ্গে তাঁরা উপরে ওঠে আর নামে। আমি উপর নীচ দৌড়ঝাঁপের ধুপধাপ আওয়াজ শুনি। কখনো চারতলার ছোট্ট চায়ের দোকানের হুশ হাশ শব্দ!

ক্লাশ শুরু হতে না হতেই ঘোষণা এলো ডাকসু নির্বাচনের। মহানন্দে নির্বাচনী মিছিল দেখি। চারতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূর থেকে মিছিলের সব মাথা দেখি। মিছিলের উৎপত্তি কলাভবন এলাকার মধুর ক্যান্টিন। ঝরনা যেমন পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে সাগরে মেশে, মিছিল গুলো তেমনি কলাভবন থেকে বেরিয়ে কার্জন হলে বিলীন হয়। মাঝে নদীর স্রোতের ভূমিকায় প্রিয় এ্যানেক্স ভবন। প্রতিটি মিছিলের উল্লাস এ ভবনকে প্রকম্পিত করে। জাতীয় শহীদ মিনারের সামনে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা এ্যানেক্স ভবন মাতৃসুলভ নিরপেক্ষতায় সকল সন্তানের নির্বাচনী ওয়াদা শোনে। ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ফ্রন্ট সবাইতো তাঁর সন্তান!!

এলো জুন মাস। ৬ তারিখ সকালে কিছুটা ভীতি নিয়ে হাজির হই এসএম (সলিমুল্লাহ) হলে। বাসা থেকে ক্লাশ করলেও আমার এটাচমেন্ট এসএম হলে। বাইডিফল্ট এ হলের ভোটার আমি। সারাজীবন শুনেছি ডাকসু নির্বাচন মানে বন্দুক পিস্তলের মহড়া। ভয়তো হবেই!! তাও আবার একলা গিয়েছি ভোট দিতে। যাবার সময় বন্ধুদের পাইনি। ডিপার্টমেন্টের বেশির ভাগ বন্ধু শহীদুল্লাহ এবং ফজলুল হক হলের ছাত্র।

সব ভীতিকে ভুল প্রমাণ করে গোলাগুলি ছাড়াই নির্বিঘ্নে শেষ হয় নির্বাচন। নির্বাচনে ছাত্রদল ডাকসু’র সব পদ এবং জহুরুল হক ও জগন্নাথ হল বাদে অন্য হল সংসদের প্রায় সবগুলো পদে জয়লাভ করে। তবে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মূল উত্তেজনা শুরু হয় এ নির্বাচনের পর।

জুন জুলাইয়ে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন টুকটাক মিছিল মিটিংয়ে সীমাবদ্ধ থাকে। পড়াশোনা শিকেয় তুলে কার্জন হল, টিএসসি, ব্রিটিশ কাউন্সিল, কলাভবন, চারুকলা টোটো করে ঘুরে বেড়াই। আর ‘চৈতালী’ বাসে শ্যামলী টু এ্যানেক্স টু শ্যামলী নিয়মিত ভ্রমন করি। কী যে আনন্দ নিয়ে গাঢ় লালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামাংকিত চৈতালী বাসের অপেক্ষা করতাম!! সে আনন্দ প্রকাশের যুৎসই কোনো ভাষা নেই। আজো ভীষণ নস্টালজিক হয়ে পড়ি।

অক্টোবরে হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেহারা পাল্টে যায়। প্রতিদিন আন্দোলন। সম্মিলিত আন্দোলন। ছাত্রদল ছাত্রলীগ দুই ভবনের দুই বাসিন্দা সমান্তরাল লাইন ছেড়ে সমবাহু ত্রিভুজের দুই বাহু হয়ে যায়। ছাত্রলীগ (জাসদ, বাসদ), জাতীয় ছাত্রলীগ, ইউনিয়ন, ফ্রন্ট, মৈত্রী, ফেডারেশন সবদল ন্যূনতম কর্মসূচীর ভিত্তিতে একত্রে আন্দোলন শুরু করে। নভেম্বরে এসে এক দফার আন্দলনে পরিণত হয়। একটাই দাবী এরশাদের পদত্যাগ।

নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষিত হয়নি। তবে ক্লাশে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ। চৈতালী সহ অন্যান্য রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়নি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। মিছিল করি, মিটিং করি, সংগ্রামের প্রেম করি… শুধু ক্লাশ করিনা।

২৭ নভেম্বর ১৯৯০। শ্যামলী বাসস্ট্যান্ডে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চৈতালী বাসের দেখা নাই। ১৫/২০ জন ছাত্রছাত্রী শ্যামলী সিনেমা হলের উল্টো দিকের ফার্মেসীতে দাঁড়িয়ে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মাস্টার্সের জালাল ভাই বললেন নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হয়ছে। তখন মোবাইল ইন্টারনেট কিচ্ছু নাই। রেডিও টিভি রাস্ট্র নিয়ন্ত্রিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর পাচ্ছিনা। কি ঘটেছে! কিছু জানিনা।

আমার ব্যাচমেট ইংরেজী প্রথম বর্ষের ফারিয়া লারা বললো, যে করেই হোক আজ আমরা ইউনিভার্সিটি যাবো। লারা মানবতাবাদী স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অগ্রভাগে থাকা মেয়ে। রাজনীতি সচেতন সাংস্কৃতিক পরিবারে জন্ম। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের কন্যা লারা। আমাকে বললো, “মিল্টন, রিকশা পাবলিক বাস টেম্পু যে করেই হোক আমরা ক্যাম্পাসে যাবো।”

লক্ষ্য করে দেখি অন্যান্য গাড়ি চলাচলও সীমিত। যে কটি আছে প্রচন্ড ভীড়। জালাল ভাইয়ের পরামর্শে যে যার মতো শাহবাগগামী কোস্টারে উঠে পড়ি। কথা ছিলো শাহবাগে নেমে পাবলিক লাইব্রেরীর গেটের সামনে একত্রিত হবো আমরা।

বাস থেকে নেমে দেখি যুদ্ধংদেহি দৃশ্য। একত্রিত হওয়ার কথা ভুলে গেলাম। শাহবাগের মোড় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার রাস্তায় আর্মড পুলিশের কংক্রীট ব্লকের ব্যারিকেড। শ্যামলী থেকে প্রথম বাসে আমি আর জালাল ভাই উঠেছিলাম। লারা উঠতে পারেনি। কে জানতো বাসস্ট্যান্ডেই লারার সাথে আমার শেষ দেখা! বিমানের পাইলট হবার ইচ্ছে ছিলো লারার। এরশাদ পতনের পর প্রশিক্ষন বিমান ক্র্যাশে এই অনন্য প্রতিভার অকাল মৃত্যু ঘটে।

জালাল ভাই শাহবাগে এক কনস্ট্যাবলের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়লেন। বললেন, আমরা যাবো। চেঁচামেচি শুনে রেব্যান সানগ্লাস পড়া সুদর্শন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলেন। ঘাড় এপাশ ওপাশ করলেন। না যাওয়া যাবেনা। এবার মিনমিনে স্বরে আমি কথা বললাম। লাইব্রেরীতে পড়া আছে ভাই। সামনে পরীক্ষা। অফিসার আইডি কার্ড চাইলেন। দুজনেই দেখালাম। অনেকক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখলেন। যখন নিশ্চিত হলেন আমরা ঢাবির ছাত্র, অনুমতি দিলেন ভেতরে যাবার।

পেছন থেকে ফের ডাক দিলেন। বললেন, সাবধানে যেও তোমরা। গোলাগুলি হচ্ছে। এক গ্রুপ রমনা পার্কের ভেতর থেকে গুলি চালাচ্ছে। অন্যরা ক্যাম্পাস থেকে প্রতিরোধ গড়ছে। সবার হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র।

জালাল ভাই প্রশ্ন করলেন, পার্কে কারা? সরকার সমর্থক?

অফিসার একটু রেগে গেলেন। বললেন, এ্যাতো প্রশ্ন কেনো? সাবধানে থাকতে বলছি থাকো। বছর চারেক আগে আমিও এখানকার ছাত্র ছিলাম। ভালোবাসা এক ফোটাও কমেনি। এখন সরকারের চাকর। এর বেশি কিছু বলতে পারছিনা।

একবার আমার দিকে আরেকবার জালাল ভাইয়ের দিকে তাকালেন অফিসার। চোখের সানগ্লাস খুলে ফেললেন। ফিসফিসিয়ে বললেন, তোমরা কিছু জানোনা?

বললাম, না।

কিছুক্ষণ আগে ডাক্তার মিলন মারা গেছেন। রিকশায় করে টিএসসির দিক যাচ্ছিলেন। পার্কের ভেতর থেকে গুলি ছোঁড়া হয়েছে।

এর আগে ডাক্তার মিলনের নাম শুনিনি। কিন্তু গুলিতে নিহত হওয়ার কথা শুনে হাত পা ঠান্ডা হয়ে এলো। পাবলিক লাইব্রেরির সামনে থেকে চারুকলার দিকে যেতে ভয় পাচ্ছিলাম। জালাল ভাইয়ের মুখ থমে থমে। চোখে মুখে চরম উত্তেজনা।

পা বাড়ালাম দক্ষিণ দিকে। জাতীয় কবির মাজার হাতের ডানে রেখে এগোতে লাগলাম। হঠাৎ একত্রে চার পাঁচটা গুলির শব্দ। এবার আত্মরাম খাঁচা ছাড়ার দশা। পরের কয়েক কদম কিভাবে হেঁটেছি মনে নেই। জালাল ভাইয়ের পরামর্শে ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল লাইব্রেরীর পেছনের ওয়ালটার পশ্চিম পাশে কয়েক মিনিট শুয়ে ছিলাম। যাতে গুলি গায়ে না লাগে।

ডিসেম্বর ৬ এরশাদ সরকারের চূড়ান্ত পতন ঘটে।বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎসবের ঢল নামে। টিএসসি সড়ক দ্বীপ ঘিরে হাজার হাজার উৎফুল্ল শিক্ষার্থীর সমাবেশ। এ আনন্দ উল্লাস একদিন নয়, চলেছে প্রায় মাস ব্যাপী। এ্যানেক্স ভবন থেকে আমরা সর্বদলীয় মিছিল নিয়ে আনন্দ করতে করতে টিএসসি যেতাম। চিৎকার করে দেশের গান গাইতাম। মনে হতো দেশ নতুন করে মুক্ত হয়েছে।

এরশাদ যুগ অবসানের পর একানববুইয়ের শীতকালটা পরমানন্দে কেটেছে ক্যাম্পাসে। এক বসন্তে ভর্ত্তি হয়েছিলাম। আরেক বসন্ত চলে এলো। আমি আর স্ট্যাটিস্টিক্সের আরেক বন্ধু জাকির হোসেন বাঁধন কেমন যেনো উড়ু উড়ু হয়ে গেলাম। এ্যানেক্সের মায়া কাটিয়ে বসন্তের পাখি বাঁধন উড়লো জাহাঙ্গীরনগরের অভয়ারণ্যে। আমি পদ্মা নদী পাড়ি দিলাম। গন্তব্য সুন্দরবন। দুজনই ফেরারী পাখি। ফেরারী পাখিরা কুলায় ফেরেনা।

নতুন বাসা বাঁধলাম খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (KUET)। স্যার সলিমুল্লাহ হলের ঠিকানা হয়ে গেলো প্রিয় লালন শাহ হল। স্ট্যাটিস্টিক্সের কঠিন বক্রাংক হয়ে গেলো সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং’র জটিল মোমেন্ট ডায়াগ্রাম। এ জটিলতাই এখন জীবিকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন চলছে। গৌরবের একশো বছর। এর মাঝেই রয়েছে আমার ফেলে আসা এক বছর। শ্রেষ্ঠতম আনন্দময় এক বছর।

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement - Visit the MDN site

Related Articles

- Advertisement - Visit the MDN site

Latest Articles