12.7 C
Toronto
বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২২

ভাষাদিবস

- Advertisement -
১৯৯৯ সালে শহীদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার পর থেকে আমাদের আকাঙ্ক্ষা বেড়েছিল

ভাষাদিবস নিয়ে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতাটির এই গল্প আমি অতীতেও লিখেছি। আবার লিখছি।
১৯৯৯ সালে শহীদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার পর থেকে আমাদের আকাঙ্ক্ষা বেড়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম সারা পৃথিবীতে দিবসটি সাড়ম্বরে পালিত হবে এবং সারা পৃথিবী বাংলাদেশের শহীদ দিবসের ইতিহাস জেনে ফেলবে খুব সহজেই। আনন্দিত হয়েছিলাম এই ভেবে যে পৃথিবীর মানুষকে আর বাংলাদেশ চিনতে দেরী হবে না। কিন্তু ব্যাপারটা যে এমন সহজসাধ্য নয় তা যারা বাইরের দেশের সাথে কাজ করেন তারা বেশি ভাল বোঝেন। সত্য হলো অনেকগুলো কাজের সমন্বিত ফসল হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের শহীদ দিবসের পরিচিতি সম্ভব। তেমনই এক কাজের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ ঘটেছিল বর্তমান লেখকের। সে কাজের গল্প নিয়েই এই লেখা।

আমরা সবাই জানি ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ঘোষণা দিয়েছিল যে বৈশ্বিক সংস্থাটি তার নাম ইউনেস্কো। তবে ভুলে গেলে চলবে না যে সে ঘোষণার ভেতরে একটি নতুনতর মাত্রা যুক্ত হয়েছিল ভাষা দিবসের ভাবনার সাথে। আর তা হল প্রত্যেক ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং পৃথিবী থেকে আর কোন ভাষা যাতে বিলুপ্ত না হয় সে ব্যাপারে অঙ্গীকার করা। প্রসঙ্গটি একারণে টানছি যে আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের অনেক বক্তাই শুধুমাত্র শহীদ দিবসের ইতিহাসকে সামনে এনে গর্বের কথা উচ্চারণ করতে পছন্দ করেন, এর বৈশ্বিক মাত্রাকে আত্মস্থ করতে আগ্রহী থাকেন না।
ইউনেস্কোর সাথে আমার যোগাযোগ ২০০২ সাল থেকে। ২০০৫ সালে সেটি সুদৃঢ় হল ওদের পরিচালিত আন্তসাংস্কৃতিক সংলাপ প্রতিযোগিতা ‘মনডিয়ালোগো’তে যখন আমার তৎকালীন কর্মস্থল ঢাকার পিলখানাস্থ বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ রাইফেলস্ কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে অংশগ্রহণ করলাম এবং সে দল ‘উই লাভ বাংলাদেশ’ ২০০৬ সালে সারা পৃথিবীর ২৬৪০টি দলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ৫০—এ অন্তর্ভুক্ত হল। রোম সিম্পোজিয়াম সেরে ফেরার পর ঐ শ্রেষ্ঠ ৫০টি দলের কার্যক্রমের ভিত্তিতে ২০০৭ সালে শ্রেষ্ঠ যে তিনটি দলকে ইউনেস্কো মুম্বাই সিম্পোজিয়ামে আহ্বান করেছিল তার ভেতর আমাদের দলটির স্থান ছিল প্রথম। এ সব সিম্পোজিয়ামের ভেতর দিয়ে যোগাযোগ ঘটেছিল জাপানের কোবে শহরের ফুকিয়াই মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুলের শিক্ষিকা রোজ সাবানালের সাথে। ফিলিপিনো রোজ রোম সিম্পোজিয়াম থেকে ফিরেই আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন বাংলাদেশের শিক্ষার্খীদের সাথে কাজ করতে। এবার আসছি সে প্রসঙ্গে।
প্রতিযোগিতার অংশ নয়, পুরস্কারের ব্যাপার নেই এমন একটি কাজে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং দীর্ঘকাল সে-উৎসাহ ধরে রাখা কেমন কঠিন তা যারা করেন তারাই জানেন। জাপান ও বাংলাদেশের দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ১২/১৪ জন করে দুটি দল প্রথমে বানানো হল। আমরা বাছাই করেছিলাম নবম শ্রেণীর কিছু শিক্ষার্থী। ইন্টারনেটে একটি আলাদা লিংক রোজ বানিয়েছিলেন যেখানে দু’দেশের শিক্ষার্থীরা পরষ্পরের সাথে পরিচিত হবে, ভাব বিনিময় করবে। বছরের মাঝামাঝি অর্থাৎ ২০০৭ এর জুলাইয়ের দিকে প্রশ্ন উঠল প্রজেক্ট থিম নিয়ে। রোজের আগ্রহ শিক্ষার্থীদের দিয়ে বই লেখানো। নিজে লেখক হওয়ায় আমার কাছেও সেটিকেই সহজসাধ্য বলে মনে হল। তবে বইয়ের বিষয় কী হবে সেটা নিয়ে চলল দীর্ঘ আলোচনা। রোজ বলেছিলেন স্কুলের বিশেষ দিন নিয়ে ছেলেমেয়েরা তাদের অভিজ্ঞতা লিখবে। মুহূর্তেই আমার মাথায় চেপে বসল সে দিনটি শহীদ দিবস হলে অসুবিধা কী? ২১ ফেব্রুয়ারি তো দুই দেশের জন্য আন্তর্জাতিক একটি দিন। তাছাড়া সে দিবসের গুরুত্বও তো রোজ অস্বীকার করতে পারবেন না। তবে সে ভাবনায় রাজী হতে রোজের অনেক সময় লেগেছিল কেননা ওর একটাই প্রশ্ন ‘আমরা তো দিবসটির কিছুই জানি না। তাহলে লিখব কীভাবে?’

ক্রমে ক্রমে দুজনে মেইল বিনিময় করে যেসব সিদ্ধান্ত নিলাম সেগুলো এমন:
১) বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার উপর ইংরেজিতে কিছু ছোট ছোট প্রবন্ধ লিখবে
(২) ইংরেজি সে প্রবন্ধগুলো জাপানের শিক্ষার্থীরা জাপানি ভাষায় অনুবাদ করবে।
(৩) জাপানের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি-জাপানি ভাষায় সে সকল লেখাকে হাতে বানানো গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে বাংলাদেশে পাঠাবে
(৪) জাপানি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ দিবস নিয়ে যে সব ছবি ও লেখা পাবে সেগুলোকে পুরো বিদ্যালয়ের সামনে উপস্থাপন করে দিবসটি সম্পর্কে তাদের সচেতন করে তুলবে।
(৫) ২০০৮ সালে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা শহীদ দিবসের প্রাক্কালে তাদের সমন্বিত প্রয়াস সকলের সামনে উন্মোচন করবে।

শুরু হল কাজ। টিমের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বইয়ের বিষয়ের উপর চলল আলোচনা — ক্লাস আর কী। সাথে সহকর্মী অধ্যাপক সুলতানা ফরিদ, আবু দারদা, আর নূরুল ইসলাম।

উপ শিরোনাম নির্ধারণ হল এমন : Introduction; History of Shahid Dibas, How Shahid Dibas became International Mother Language Day; Language Martyrs; The Importance of Shahid Dibas in the History of Bangladesh; Shahid Minar; Bangla Literature; World Languages etc। এমন কিছু কঠিন কাজ নয় কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ের বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য সেগুলো লেখা তেমন সহজ ব্যাপারও ছিল না। বারবার দলে মানুষ ঘাটতি, নতুন করে দল বানানো; নতুন উদ্যমে শুরুর চেষ্টা। স্কুল-সময়ের বাইরে আলাদা করে সময় বের করে এ কঠিন কাজে বাংলাদেশের যে কজনকে কম-বেশি উদ্বুদ্ধ করে রাখা গেল তারা হল কাফিউন নাহার কনা, আবিদা জাহান তিমা, তামান্না রহমান তন্বী, মাহফুজা আক্তার, ঋতুপর্ণা সাহা, জান্নাতুন ফেরদৌস, জ্যোতি মালাকার, আফরোজা আক্তার বৃষ্টি, ফারহানা তাবাসসুম রাইমা, মাকসুদা আক্তার রুবী, নাজিয়া নওসিন আহমেদ, রাবেয়া আক্তার অনামিকা, রোকসানা আক্তার ও শারমিন সুলতানা রিয়া।
অক্টোবরের ভেতরেই আমাদের কাজ শেষ করতে হল যেহেতু নভেম্বর-ডিসেম্বর বাংলাদেশে বার্ষিক পরীক্ষা থাকবে। চলে আসল ২০০৮ এর জানুয়ারি। রোজ জানালেন বই প্রস্তুতি শেষ দিকে। শীঘ্রই ডাকে দেবেন।
শুরু হল প্রকাশনা অনুষ্ঠানের ভাবনা। প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন অধ্যক্ষ মরহুম মিয়া মোঃ মনিরুজ্জামান প্রাণিত করে চলেছিলেন সর্বক্ষণ। সাহস নিয়ে বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত মাসাইউকি ইনোওয়েকে চিঠি লিখলাম অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকার জন্য। ৩০ জানুয়ারি রাষ্ট্রদূতের ব্যক্তিগত সহকারী ফোন করে জানালেন, যদিও রাষ্ট্রদূত দেশের বাইরে রয়েছে, তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে আগ্রহী। শুরু হয়ে গেল আয়োজনের তোলপাড়।

ইতোমধ্যে এসে পৌঁছাল বইয়ের বান্ডিল। ছোট্ট, কিন্তু কত মনোরম। একপাশে ইংরেজি অন্যপাশে জাপানি। দেখলাম জাপানের শিক্ষার্থীরা কয়েকটি নতুন প্রবন্ধও যুক্ত করেছে
(১) How to Show Respect to Other Langauges
(২) Understanding the World Through Languages
(৩) Why People Learn a Second Language
(৪) Language and Facial Expression সহ আরও কিছু। বই নিয়ে বারবার চোখ ভিজে আসছিল এই ভেবে যে আমাদের ১৩/১৪ বছরের শিক্ষার্থীরা এমন একটি বইয়ের প্রণেতা!
এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার জাতিসংঘ কিন্তু ২০০৮ সালকে ‘ভাষাবর্ষ’ ঘোষণা দিয়েছিল। জাতিসংঘের শ্লোগান ছিল ‘Languages Matter’। যদিও বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আন্তর্জাতিক এমন একটি ঘোষণাকে প্রসার-প্রচারে বিশেষ কারো ভূমিকা চোখে পড়েনি। সিদ্ধান্ত হল ২০ জানুয়ারি প্রকাশনা অনুষ্ঠানে হবে। আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়ালেন র‍্যানকন মটরস্ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রোমো রউফ চৌধুরী। দূর থেকে আশীর্বানী পেলাম বাংলাদেশে ইউনেস্কোর কান্ট্রি প্রতিনিধি মালামা মালিসা ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কোর সচিব ড. মাহমুদুল হাসানের।

ইতোমধ্যে ইউনেস্কো ফ্রান্সের প্রতিনিধিরা জাপান থেকে জানতে পেরেছিলেন আমাদের কাজের কথা। ৭ ফেব্রুয়ারি মনডিয়ালোগো ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হল প্রজেক্ট নিয়ে সংবাদ— দুই দেশের দুই দলের গ্রুপ ছবিসহ। কী আনন্দ, কী আনন্দ। ছাপানো হলো অনিন্দ্যসুন্দর এক ডেস্ক ক্যালেন্ডার। ইউনেস্কো কার্যক্রমে আমাদের ছেলেমেয়েদের আগের তিন/চার বছরের কর্মতৎপরতার ছবি নিয়ে।
ইউনেস্কো, ভাষাবর্ষ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রভৃতির বাণী—সজ্জিত বর্ণিল কলেজ প্রাঙ্গণে জাপানি রাষ্ট্রদূত এসে পৌঁছলেন। ঘড়ির কাঁটার পূর্ব নির্ধারণে শুরু হল অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রদূত ইনোওয়ের সেদিনের ভাষণের একটি বাক্য এখনও কানে বাজে
‘This is a small book, but this is a big book ….’

রোজ জানিয়েছিলেন ওরা ওদের স্কুলে সপ্তাহব্যাপী মাতৃভাষা দিবস প্রদর্শনী করেছেন। প্রজেক্টের শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানের অন্যদের কাছে তুলে ধরেছে এ দিবসের ইতিহাস এবং দিবসটির মর্মার্থ। রোজকে অনুরোধ করেছিলাম ভাষা নিয়ে অভিনব এ কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতে। মার্চের ২ তারিখে ঢাকার ডেইলি স্টারে ছাপা হয়েছিল রোজের লেখা ‘My Language of Thought’।

অনেকের দৃষ্টিতেই কাজটি তত বেশি গুরুত্বের নয়। হয়তো কিশোরবয়েসীদের করা বলে। কিন্তু অপার বিস্ময় লেগেছিল কাজটি নিয়ে যখন উন্নত বিশ্বের প্রথম সারির দেশ জাপানের রাষ্ট্রদূত ভূয়সী প্রশংসা করছিলেন। ভাল লেগেছিল প্রজেক্টের শিক্ষার্থীদের গাওয়া ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো …’ গানের সাথে যখন তিনি কণ্ঠ মেলানোর চেষ্টা করেছিলেন বিনম্র দাঁড়িয়ে। বার বার মনে হয়েছিল এমন অনেকগুলো প্রচেষ্টা সংহত হলে কি আমার শহীদ দিবস সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বার্তা নিয়ে পূর্বদেশিয় দ্বীপ ফিজি থেকে সূদুর পশ্চিমের পেরু পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত!

আমার এমন ভাবনা কানাডায় আসার পর আরও শক্ত হয়েছে। বারবার মনে হয় কয়জন অবাঙালি এই দিবস নিয়ে ভাবেন, এই দিবসকে পালন করেন! ইউনেস্কোর মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার এমন উদ্যোগের পরেও আমরা কেন হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ অবাঙালিকে এই দিবস নিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে পারলাম না!

ইস্টইয়র্ক, কানাডা

Related Articles

Latest Articles