প্রচ্ছদ এডিটোরিয়াল গীতা এবং গীতাসমূহ

গীতা এবং গীতাসমূহ

119
গীতা এবং গীতাসমূহ - the Bengali Times
মাত্র ৭০০ শ্লোকের সে গ্রন্থটি দীর্ঘ আড়াই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি সুসংগঠিত ভাবনার সুলিখিত গ্রন্থ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। ইউরোপ-আমেরিকা জুড়ে দর্শন ও অধ্যাত্মবিদ্যার আকর গ্রন্থ হিসেবে ব্যাপকভাবে গবেষণার আধারও ‘গীতা’

‘গীতা’ বলতে সাধারণভাবে আমরা ‘ভগবদগীতা’কে বুঝে থাকি। একথা সকলের জানা যে ‘ভগবদগীতা’ হলো কৃষ্ণ-অর্জুনের সংলাপ যা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কাব্যগ্রন্থ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের মহাভারতের অংশ। লক্ষ শ্লোকের সে মহাকাব্যের ‘ভীষ্মপর্ব’-এর ২৩ থেকে ৪০ সংখ্যক পরিচ্ছেদ আলাদাভাবে ‘গীতা’ শিরোনামে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিকট আদৃত, অনুসরিত এবং মূল্যায়িত। মাত্র ৭০০ শ্লোকের সে গ্রন্থটি দীর্ঘ আড়াই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি সুসংগঠিত ভাবনার সুলিখিত গ্রন্থ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। ইউরোপ-আমেরিকা জুড়ে দর্শন ও অধ্যাত্মবিদ্যার আকর গ্রন্থ হিসেবে ব্যাপকভাবে গবেষণার আধারও ‘গীতা’। তবে বিশেষভাবে উল্লেখের যে ‘ভগবদগীতা’র মতই গীতা নামে আরো অন্তত ৩৫টি গীতা আছে যাদের অনেকগুলিরই মূল আশ্রয়গ্রন্থ মহাভারত, অথবা মহাভারত না হলেও রচয়িতা বেদব্যাস এবং বেশ কয়েকটিতেই প্রধান বক্তা ভগবান বা কৃষ্ণ এবং অধিকাংশগুলোই সংলাপের আকারে রচিত।

একজন সাধারণ পাঠক যদি কাশীরাম দাস অনুবাদিত বাংলা মহাভারত পাঠ করেন তাহলে তাঁর পক্ষে এটি খুব কষ্টসাধ্য অনুসন্ধান হবে ‘ভীষ্মপর্ব’তে ‘গীতা’র উপস্থিতি নিশ্চিত করা। বাজারে প্রচলিত বহু সংস্করণের বৃহত্তমটিও যদি আপনার আশ্রয় হয় তাহলেও ‘গীতা’-আশ্রিত অংশটি সেখানে চার পৃষ্ঠার বেশি সুলভ নয় এবং সে পৃষ্ঠা চারেক বাংলা অনুবাদে ‘গীতা’র গভীর দর্শনের কণামাত্রও আপনাকে দিতে পারবে বলে মনে হয় না। সেসব কারণেই কি ফরিদপুরের কৃতি সন্তান হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ (১৮৭৮ – ১৯৬১) এর অনুবাদে কলকাতা থেকে প্রকাশ সম্ভব হয়েছে ৪৩ খণ্ডে ১৯৫৭২ পৃষ্ঠার মহাভারতের বিপুলায়তন বঙ্গানুবাদ যা ব্যপ্তি ও গভীরতায় যে কোন পাঠককে আপ্লুত করে। মহতী সে কাজটি অনুবাদকের জন্য বয়ে নিয়ে এসেছে রবীন্দ্র পুরস্কারের মত একটি উপহার! মহাভারতে প্রাপ্ত গীতাসমূহের দ্বিতীয় বৃহত্তমটিই যদি কৃত্তিবাসী বাংলা অনুবাদে এমন
অপসৃয়মান হয়ে থাকে, তাহলে ক্ষুদ্রকায় গীতাগুলির অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

হিন্দুধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে ‘গীতা’ বলতে সে সকল গ্রন্থ বা গ্রন্থাংশকেই চিহ্নিত করা হয়েছে যেগুলো ঈশ্বর, দর্শন, জীবন, আত্মা, মৃত্যু, জীবন পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে উপদেশ বা আলোচনা করা হয়েছে। ‘ভগবদগীতা’ ব্যতিরেকে অন্য যতগুলি গীতার সন্ধান পাওয়া যায় সেগুলি হলো: ঈশ্বর গীতা, ব্যাস গীতা, রাম গীতা, বৃত্র গীতা, যম গীতা-১, যম গীতা-২, পিতৃ গীতা, হারীত গীতা, বোধ্য গীতা, মঙ্কি গীতা, গর্ভ গীতা, জীবন্মুক্তি গীতা, পাণ্ডব গীতা, অবধূত গীতা, ষড়জ গীতা, দেবী গীতা, উত্তর গীতা, গীতাসার-১, গীতাসার-২, শ্রী সপ্তশ্লোকী গীতা, রাস গীতা, শ্রীমদগীতাসার, বৈষ্ণব গীতা, গোপী গীতা, বিছখন্যু গীতা, শম্পাক গীতা, পরাশর গীতা, হংসগীতা-১, হংসগীতা-২, ভিক্ষু গীতা, অনুগীতা, ব্রাহ্মণগীতা ও গুরুগীতা। কোন কোন শিরোনামের সাথে ১,২ ইত্যাদি সংখ্যাবাচক শব্দের সংযুক্তি একই শিরোনামের একাধিক গীতাকে চিহ্নিত করার জন্য।
পাঠকের নিশ্চয়ই জানা আছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পূর্বে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস (ব্যাসদেব নামেও পরিচিত), যিনি একাধারে মহাভারতের রচয়িতা এবং রহস্যময় কিন্তু শক্তিমান চরিত্র, সেই ব্যাসদেব অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যুদ্ধের ফলাফল নিজ চোখে তিনি প্রত্যক্ষ করতে চান কিনা। উল্লেখ করা যেতে পারে ধৃতরাষ্ট্র বিচিত্রবীর্যের সন্তান হিসেবে পরিচিত হলেও প্রকৃত সত্য হলো তাঁর জন্ম হয়েছিল কৃষ্ণদ্বৈপায়নের ঔরসে। সন্তানস্নেহে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র সন্তানদের আসন্ন মৃত্যুদৃশ্য কষ্টাতীত ভেবেই বলেছিলেন সঞ্জয়কে সেই ক্ষমতা দেওয়া হোক যার বলে সঞ্জয় রাজপ্রাসাদে বসে দূরের যুদ্ধক্ষেত্রের সব কিছু প্রত্যক্ষ করতে পারেন। সঞ্জয়ের কথাতেই ধৃতরাষ্ট্র সব জানবেন। আপাতভাবে ধর্মীয় গ্রন্থে এ অসম্ভব ব্যাপারটি প্রবিষ্ট হলেও পৃথিবীর সকল ধর্মীয় গ্রন্থেই অলৌকিক এমন কাহিনীর ছড়াছড়ি। যাদুবাস্তবতার দৃষ্টিকোণ থেকে একে অসাধারণ এক কল্পনা মনে করা যেতে পারে। ভাবতে বিস্ময় লাগে পাঁচ (?) হাজার বছর আগেই ভারতবর্ষীয় সাহিত্যগ্রন্থে যাদুবাস্ততার এ উপাদান ব্যবহৃত হয়েছিল যা ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যে বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ্বে প্রয়োগকৃত। এ শিল্পকৌশল ব্যবহৃত হয়েছিল বলেই পাঠক মনে প্রশ্ন জাগে না যুদ্ধশুরুর পূর্বমুহূর্তে কৃষ্ণের কঠিন তত্ত্ববিষয়ক বক্তব্য এত পুঙ্খানুপুঙ্খে লেখক ধারণ করলেন কীভাবে। কলাকৌশলের এই উৎকর্ষের কারণেই বর্তমান লেখক ধর্ম বিষয়ে বিশেষ আগ্রহী না হলেও ধর্মীয় গ্রন্থের সাহিতিক মূল্য অনুসন্ধান পরাকাষ্ঠা।
‘ভগবদগীতা’য় যে ৭০০ শ্লোকের সমাহার তা কি একজনের পক্ষে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে শোনানো সম্ভব? এমন প্রশ্নের যথাযথ জবাব ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণও তাঁর গীতা বিষয়ক গ্রন্থে দিতে পারেননি। তবে খেয়াল করা যেতে পারে যে ৭০০ শ্লোকের অনেকগুলিই কিন্তু বলেছেন অর্জুন, সঞ্জয় ও ধৃতরাষ্ট্র। ফলে কৃষ্ণ প্রধান কথক হলেও সবগুলোর নন এবং সংলাপ ধর্মিতা তথা প্রশ্নোত্তর ধরনে থাকায় তা খুব বেশি ক্লান্তিকর হওয়ার কথা নয়।
তবে মহাভারতে আরও একটি গীতা বিদ্যমান যেখানে কথক ঐ কৃষ্ণ আর অর্জুন এবং বিষয়ও এক। সেটি ‘উত্তরগীতা’ নামে পরিচিত। যুদ্ধশেষে অর্জুনের একসময় বোধোদয় হয় যে যুদ্ধপূর্বকালে কৃষ্ণ যে গভীর দার্শনিক অভিজ্ঞান প্রদান করেছিলেন যুদ্ধের ব্যস্ততায় ও অমনোযোগে সে জ্ঞানের অনেকখানিই তিনি বিস্মৃত। তাই কৃষ্ণকে অনুরোধ করেন পুনরায় গীতার সেই জ্ঞান তাঁকে প্রদান করার জন্য। মাত্র তিনটি অধ্যায়ে ১২৬টি শ্লোকে একই বিষয়ে কৃষ্ণ পুনরায় জ্ঞান দেন। ভিন্নতা এই এখানে উপস্থিত নেই ধৃতরাষ্ট্র ও সঞ্জয়। কৃষ্ণ ও অর্জুনের মধ্যে জন্ম-মৃত্যু-জরা নিয়ে অনুরূপ দার্শনিক আরেক সংলাপ ‘গর্ভগীতা’। মাত্র ২২টি শ্লোক। ধরনটিও একই রকম। মহাভারতে অন্য আরও একটি গীতা রয়েছে যা ‘গীতাসার’ নামে পরিচিত। কামনা-বাসনাসিক্ত মায়াময় জগৎসংসারের বন্ধন কাটানোর উপায় জানাতে অর্জুনের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন কৃষ্ণ এখানে, শুধুমাত্র মহাভারতের মধ্যে আরও অন্য যে গীতাগুলির ইঙ্গিত রয়েছে তার অধিকাংশই ‘শান্তিপর্বে’। সেগুলোর অধিকাংশ বক্তা ভীষ্ম। মহাজ্ঞানী কৃষ্ণের নিকটও বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন ভীষ্মের কাছে বারবারই পাণ্ডবপুত্রেরা বিশেষ করে যুধিষ্ঠির গেছেন পরামর্শ নিয়ে আলোকিত হতে। ভীষ্মের সে সকল অভিভাষণ হলো: বৃত্রগীতা, হারীতগীতা, বোধ্যগীতা, মঙ্কি গীতা, ষড়জ গীতা, বিচখ্ন্যু গীতা, শম্পাক গীতা, পরাশর গীতা ও হংসগীতা। এছাড়া অশ্বমেধ পর্বে ‘অনুগীতা’ নামের একটি গীতার অস্তিত্ব পাওয়া যায় বিশেষ বৈচিত্র্যের। ‘অনুগীতা’র ভেতরে রয়েছে ‘ব্রাহ্মণগীতা’র অস্তিত্ব। ‘ব্রাহ্মণগীতা’র রয়েছে ৩০৮ টি শ্লোক, অন্য দিকে ‘অনুগীতা’তে ১৮৯+৩৩৪= ৫২৩টি শ্লোক রয়েছে। ‘ভগবদগীতা’র বিষয়টিই এখানে ভিন্ন ভাষায় উপস্থিত।
স্পষ্ট যে ‘ভগবদগীতা’য় যে জ্ঞান প্রচার হলো তা নতুন ভাষায় বারবার কৃষ্ণের মুখ দিয়ে বর্ণনা করিয়েছেন কৌশলি ও শক্তিমান লেখক বেদব্যাস। ধারণা হয়, তাঁর কাছে এটি স্পষ্ট ছিল যে একটি মাত্র ভাষ্য কোন বিষয়ের চূড়ান্ত ভাবনা প্রকাশ করতে সক্ষম নয়। বিশেষ করে সে ভাবনা যদি স্বাধীন আলোচনা ও বিশ্লেষণের অধিকার রাখে। আর তাই ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্য নির্মাণে বেদব্যাসের কারিগরিকে স্বাগত জানাতেই হয়। যেমন বাংলা কথা-সাহিত্যের শক্তিমান পুরুষ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ ও ‘চাঁদের অমাবস্যা’তে নতুন নতুন ভাষ্য দিয়ে এতে যে বহুমাত্রিকতা সৃষ্টি করেছেন তা পাঠকের কল্পনাশক্তির চূড়ান্তকে আলোড়িত করতে বাধ্য। আর এই ‘গীতা’য় কৃষ্ণ নিজেই বলছেন যে তিনি কোন নতুন মত প্রচার করছেন না, তিনি যে কথা বিবস্বানকে শিখিয়েছিলেন, বিবস্বান তা মনুকে শিখিয়েছিলেন, এবং পরে মনু যা ইক্ষবাকুকে শিখিয়েছিলেন, তারই তিনি পুনরাবৃত্তি করছেন। কৃষ্ণের এ ভাবনার ভেতর দিয়ে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, ধর্ম সমাজের ক্রমবিবর্তনের ভেতর দিয়ে হয়ে ওঠা একটি জিনিস, আকাশ থেকে প্রেরিত নয়, এবং তা ক্রমান্বয়েই সুসংহতির দিয়ে যায় অন্য যে কোন দর্শনগত বিষয়ের মতই।
‘ভগবদগীতা’য় মূল কথক কৃষ্ণ হলেও যেহেতু মহাভারতের রচয়িতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাই ব্যাসদেবকে ‘ভগবদগীতা’র স্রষ্টা বলতে দ্বিধা করার কোন কারণ নেই। মহাভারতে যেমন তাঁকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার নিয়ন্ত্রক হিসেবেও উপস্থিত দেখা যায়। তাঁর অন্য নাম কৃষ্ণ – অর্জুনসখা কৃষ্ণ তিনি নন যদিও। কিন্তু তারপরও সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ও কৃষ্ণকে একই ব্যক্তির সমরূপ দুটি সত্বা হিসেবেও কল্পনা করতে বিশেষ কষ্টক্লান্ত হতে হয় না। ‘ঈশ্বরগীতা’ ও ‘ব্যাসগীতা’য় প্রবেশ সে ভাবনাকে উচ্চকিত করে বৈকি!

‘ঈশ্বরগীতা’র মূলগ্রন্থ ‘কুর্মপূরাণ’। ৪৯৫ শ্লোকের এই গীতাটির বক্তা ব্যাসদেব স্বয়ং। মুমুক্ষু-শৌনক প্রমূখ মুনিদের যে ব্রহ্মবিদ্যাবিষয়ক জ্ঞান ব্যাসদেব প্রদান করেছিলেন তারই সংগৃহীত রূপ ‘ঈশ্বরগীতা’। এতে ঈশ্বর হলেন মহাদেব, যদিও ‘ভগবদগীতা’য় ঈশ্বর হলেন শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং। ‘ঈশ্বরগীতা’র মূল বিষয় জ্ঞান ও ভক্তি। এমনকি ‘ভগবদগীতা’র ভক্তিযোগের অনেকাংশেরই উল্লেখ ‘ঈশ্বরগীতা’য় বর্তমান।

সকল গীতার মধ্যে দীর্ঘতম ১৪১৩ শ্লোকের ‘ব্যাসগীতা’ও কুর্মপূরাণের অংশ। এটিরও বক্তা ব্যাসদেব। এটির বিষয় কর্মযোগ। অনুসন্ধিৎসু পাঠক ‘ব্যাসগীতা’র বিষয়ের সাথে ‘ভগবদগীতা’র কর্মযোগের সাযুজ্য সন্ধান করতে পারেন সহজেই।

ব্যাসদেব কথিত ‘গীতা’র আরও সন্ধান পাওয়া যায় ‘দেবী ভাগবত’-এ। ৫০৬টি শ্লোকে নাতিদীর্ঘ সে গীতাটিতে শ্রোতা হলেন জনমেজয়। দেবী দুর্গার মাধ্যমে সৃষ্টি, সৃষ্টির ক্রমবিকাশ ইত্যাকার সকল বিষয় নিয়ে এ গীতায় বিশ্লেষণ রয়েছে। এতেও পাঠক ‘ভগবদগীতা’র অনুরণন দেখবেন মাঝে মাঝেই।
‘শ্রীমদভাগবতে’ যে গীতাগুলির অস্তিত্ব বিরাজমান সেগুলো হলো ‘রাসগীতা’ (৫৫ শ্লোক), ‘গোপীগীতা’ (১৯ শ্লোক) ও ‘হংসগীতা’-২ (৪২ শ্লোক)। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে মহর্ষি বেদব্যাস নিজেই ‘শ্রীমদভাগবত’-এরও লেখক বটে। প্রচলিত মত এমন যে মহাভারত ও সপ্তদশ মহাপুরাণ রচনার পর তিনি ‘ভাগবত’ রচনা করেন। ‘শ্রীমদভাগবতগীতা’-তে ভক্তিবাদের যে আলোচনা তা বিস্তৃতরূপে ‘শ্রীমদভাগবতে’ স্থান পেয়েছে। এছাড়া বিষ্ণুপুরাণে রয়েছে ‘যমগীতা’-১, ‘পিতৃগীতা’ ও ‘বৈষ্ণবগীতা’, অগ্নিপুরাণে রয়েছে ‘যমগীতা’-২ ও ‘গীতাসার’-১। ‘রাসগীতা’ ও ‘গোপীগীতা’য় কথক হলেন নারদ মুনি। ‘পরাশর গীতা’য় ব্যাসদেবের বাবা পরাশর ছিলেন বক্তা। ‘শ্রীমদভাগবতে’র ‘হংসগীতা’তে বক্তা হংসরূপী বিষ্ণু। অগ্নিপূরাণের দুটি গীতাতেই বক্তা অগ্নি। অধ্যাত্ম-রামায়ণের উত্তরকান্ডে যে ‘রামগীতা’ রয়েছে তার শ্রোতা লক্ষণ, বক্তা রামচন্দ্র। বক্তব্য বিষয় প্রথমে মহাদেব বলেছিলেন মহাদেবীকে, তারপর নারদ শুনেছিলেন ব্রহ্মার কাছ থেকে। তারপর উগ্রশ্রবার কাছ থেকে শোনেন মুনিবৃন্দ।

আগ্রহী পাঠক অনুধাবন করতে পারেন যদিও মহাভারতসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে ‘গীতা’ নামের শ্লোকপুঞ্জের যথেষ্ট উপস্থিতি ছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে সকলের রচয়িতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাস। ‘ভগবদগীতা’র ভাবনাসমূহের বিভিন্ন অনুষজ্ঞসমূহ কখনো সংক্ষেপে কখনো বিস্তারে এই সকল গীতাসমূহ উপস্থাপিত হয়েছিল। পৌণঃপুণিক সে চর্চার ভেতর দিয়ে কবি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন নিজেও নিজের সৃষ্টিতে পরীক্ষা নীরিক্ষা চালিয়েছিলেন বলে অনুমান করলে দোষের কিছু হবে না। তবে ‘শ্রীমদভগবদগীতা’ নামে হিন্দু সমাজে যেটি অধিক প্রচলিত সেটিতে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ওরফে কৃষ্ণ ওরফে দ্বৈপায়নসৃষ্ট কৃষ্ণ ঈশ্বর, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ও জগৎসংসার সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতাপ্রসূত চিন্তারাশির প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন তা ছিল অনেক বেশি সুসংহত ও অর্থবাহী। আর সে কারণেই হয়তো ভারতীয় প্রাচীন সাহিত্যের অমূল্য এ নিদর্শনটি ইউরোপ জুড়ে ক্রমবিষ্ণুভাবে জনপ্রিয় হয়ে চলেছে নতুন নতুন অনুবাদে, নতুনতর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সহযোগে।

(প্রচলিত ‘গীতা’ অর্থাৎ ‘ভাগবদগীতা’র বাইরে আরও যে ‘গীতা’র অস্তিত্ব সে-সকল ‘গীতা’র মধ্যে নিকট বা দুরতম যে ঐক্য তাকে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে এ নিবন্ধে। ধর্মের তাত্ত্বিক গভীরতায় গিয়ে জটিল আলোচনার ভেতর অনুপ্রবেশ কোনক্রমেই উদ্দিষ্ট ছিল না। সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে মহাভারত ও এর অন্তর্গত ‘গীতা’কে সহ-গীতাসমূহের আলোকে উপস্থাপনই ছিল মূল লক্ষ্য।)

সহায়ক গ্রন্থ:
১। শ্রীমদভগবদগীতা, ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ, বঙ্গানুবাদ: শ্রীশুভেন্দ্রকুমার মিত্র, কলকাতা, ১৩৭৮ (বঙ্গাব্দ)
২। গীতাসংগ্রহ, চিত্তরঞ্জন ঘোষাল, (সংকলন ও ভাষান্তর), কলকাতা, ত্রয়োদশ রাজ সংস্করণ, ১৪১৫ (বঙ্গাব্দ)
৩। কাশীদাসী মহাভারত, শ্রী বেনীমাধব শীল (সম্পা.), কলকাতা, ১৩৯৪ (বঙ্গাব্দ)
৪। মহাভারতের চরিতাবলী, শ্রী সুখময় ভট্টাচার্য, কলকাতা, ৪র্থ মুদ্রন, ১৪১৩ (বঙ্গাব্দ)
৫। Hindu Scriptures, Translated and edited by R.C. Zaehner,New Delhi, Second Rupa Impression 1995.

ইস্টইয়র্ক, টরন্টো, কানাডা