তাহসিফের মৃত্যুর আগে সেই ১৫ মিনিটে কী ঘটেছিল?

তাহসিফের মৃত্যুর আগে সেই ১৫ মিনিটে কী ঘটেছিল? - the Bengali Times
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্যের জট এখনো খুলতে পারেননি তদন্তকারীরা

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্যের জট এখনো খুলতে পারেননি তদন্তকারীরা। অর্ধশতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পরও তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোর কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে রাত ১টা ২০ মিনিট থেকে ১টা ৩৫ মিনিট—এই ১৫ মিনিটের হিসাবই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। এর আগে ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। এরপর মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা, মোটরসাইকেল মেরামত, এক তরুণীর সঙ্গে রেস্তোরাঁয় খাওয়া এবং বন্ধুকে নিয়ে বারে যাওয়াসহ রাতভর বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন তাহসিফ।

- Advertisement -

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে রাতের শেষ সাত ঘণ্টার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে যাওয়ার পর তাঁর গতিপথের একটি বড় অংশ অজানা থেকে গেছে। বিশেষ করে পুলিশের অভিযানের সময় কী ঘটেছিল, তা নিয়ে দীপের বক্তব্যের বাইরে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো তথ্য নেই।

টঙ্গীতে যাওয়ার আগে বারে মদ্যপান

দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৮ মিনিটে তাহসিফ, ওই তরুণী ও তিনি উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি বারে যান। এর আগে ওই তরুণীর সঙ্গে অন্য এক যুবকের সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে মন খারাপ ছিল তাহসিফের। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধও চলছিল।

বারে গিয়ে তাহসিফ বিষণ্ন সংগীত বাজানোর অনুরোধ করেন। পরে তিনজনই মদ্যপান করেন। রাত ১২টা পর্যন্ত ওই তরুণীর সঙ্গে অন্য যুবকের সম্পর্ক নিয়ে তাহসিফের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তিনি ওই তরুণীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তুমি তো ইয়াবা খেয়েছ, আমি এর চেয়েও বড় কিছু খাব। আমি হেরোইন খাব।’

রাত ১২টার দিকে বার থেকে বেরিয়ে তাহসিফ ওই তরুণীকে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেন। এরপর দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি-সংলগ্ন একটি মাঠের উদ্দেশে রওনা হন। দীপের দাবি, সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাহসিফ নিজেই।

মাদক কেনার পর পুলিশের অভিযান

দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, টঙ্গীর মাজার বস্তির কাছে মোটরসাইকেল রেখে তাঁরা মাঠের দিকে যান। সেখানে স্থানীয় মাদকসেবী ও কারবারিদের উপস্থিতি ছিল। তাহসিফ উচ্চ স্বরে হেরোইন চান এবং যত টাকা প্রয়োজন দিতে রাজি হন। পরে কয়েকজনের কাছ থেকে হেরোইন কিনে সেবন করেন তিনি।

দীপের দাবি, মদ্যপানের পর হেরোইন সেবনে তাহসিফ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এর মধ্যেই সেখানে পুলিশের একটি টহল দল উপস্থিত হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয় মাদক কারবারিরা পালাতে শুরু করেন। দীপও দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে চলে যান। পরে তুরাগ নদের ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে গিয়ে আত্মগোপন করেন। এ সময় তাহসিফের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তিনি।

সিসিটিভিতে রাতের শেষ গতিপথ

তদন্তকারীরা টঙ্গীর মাজার বস্তি ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাহসিফ ও দীপের গতিপথ শনাক্ত করেছেন।

ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১২টা ৩৯ মিনিটে দ্রুতগতিতে মাজার বস্তিতে প্রবেশ করেন তাহসিফ। কিছুক্ষণ পর সেখানে পৌঁছায় দীপের মোটরসাইকেল। রাত ১২টা ৪০ মিনিটে একটি গলিতে প্রবেশের চেষ্টা করলে বস্তির এক নারী তাঁদের বাধা দেন। এ নিয়ে ওই নারীর সঙ্গে তাহসিফের তর্ক হয়।

ওই নারীর ভাষ্য, তাহসিফকে ভেতরে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বাধা না মেনে বলেন, ‘আমি ভেতরে যাব, কোনো সমস্যা নেই। আমরা রেইড দেব, আপনার কোনো সমস্যা হবে না।’

পরে তাঁরা গলি পেরিয়ে প্রধান সড়কে ওঠেন এবং নদীর তীরের দিকে যান। রাত ১২টা ৫২ মিনিটে মাজার গেটের সামনের একটি ক্যামেরায় তাহসিফকে স্পষ্ট দেখা যায়। তাঁর পেছনে ছিলেন দীপও।

এরপর আর কোনো সিসিটিভি ক্যামেরায় তাঁদের দেখা যায়নি। প্রায় ছয় মিনিট হেঁটে তাঁরা বস্তির পাশের একটি ফাঁকা মাঠের কাছে পৌঁছান। দীপের তথ্য অনুযায়ী, সেখানকার একটি ভবনের সিঁড়িতে সবশেষ বসেছিলেন তাঁরা।

রাত ১টা ৫ মিনিটে পিংকি গার্মেন্টসের সামনের ক্যামেরায় আট সদস্যের পুলিশের একটি দলকে মাঠে প্রবেশ করতে দেখা যায়। দীপের দাবি, পুলিশ দেখে সবাই দৌড়াতে শুরু করেন। তিনি নদীর ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে গিয়ে লুকান। আর তাহসিফ চলে যান নদীর তীরের দিকে। এরপর অন্ধকারে তাঁকে আর দেখতে পাননি দীপ।

সেই ১৫ মিনিটের হিসাব নেই

তদন্তের সবচেয়ে বড় অসংগতি দেখা দিয়েছে রাত ১টা ২০ মিনিটের পরের ঘটনায়। মাজার গেটের সামনের ক্যামেরায় রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে পুলিশের দলটিকে মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। একই সময়ে অন্য একটি ক্যামেরায় দীপকে বস্তিতে ফিরে আসতে দেখা যায়। রাত ১টা ২১ মিনিটে আরেকটি ক্যামেরায় তাঁকে হাঁটতেও দেখা গেছে।

অন্যদিকে, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের মায়ের ফোনে একটি বার্তা আসে। কিন্তু তখন তাহসিফ কোথায় ছিলেন কিংবা তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, রাত ১টা ৫২ মিনিটে তাহসিফকে রেখে তিনি বাসায় চলে যান। কিন্তু রাত ১টা ২১ মিনিটের পর থেকে ১টা ৫২ মিনিট পর্যন্ত তিনি কোথায় ছিলেন, তারও কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, পুলিশ অভিযান চালাতে এলে অনেকে গ্রেপ্তার এড়াতে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে অন্য পাড়ে চলে যান। তাহসিফও পালাতে গিয়ে পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন কি না, নাকি তাঁর সঙ্গে অন্য কোনো ঘটনা ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মৃত্যুর কারণ নিয়েও ধোঁয়াশা

তদন্তকারীরা এখন পর্যন্ত চারটি সম্ভাব্য কারণ সামনে রেখে কাজ করছেন। পূর্বশত্রুতা, আর্থিক লেনদেন, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা পুলিশের উপস্থিতিতে পালানোর সময় দুর্ঘটনাবশত নদীতে পড়ে মৃত্যু—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে কোনো সম্ভাবনাই এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়নি।

তাহসিফের মরদেহে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এ কারণে এটি হত্যাকাণ্ড, নাকি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রকৃত মৃত্যুর কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছেন তদন্তকারীরা।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ময়নাতদন্তের সময় তাহসিফের পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ভিসেরা, রক্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি মাদক সেবন করেছিলেন কি না কিংবা তাঁর শরীরে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তথ্য পাওয়ার আশা করছেন তদন্তকারীরা।

এদিকে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম এ ঘটনায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় দীপ ও তাঁদের সঙ্গে থাকা তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কয়েক দফায় তাঁদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে।

নৌ পুলিশ ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, রিমান্ডে আসামিরা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের বাকি কাজ শেষ করে ফলাফল দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।

তাহসিফের বাবা আশা প্রকাশ করেছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটন করবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।

ঘটনার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অজানাই রয়ে গেছে। সিসিটিভি ফুটেজে তাঁর শেষ রাতের অনেক ঘটনা ধরা পড়লেও জীবনের শেষ মুহূর্তের কোনো নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তকারীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—পুলিশের অভিযানের পর সেই ১৫ মিনিটে তাহসিফের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল?

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles