
নিহত আদনান এর মা নিঘাত বেগমের আহাজারি
ছেলেকে চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল মায়ের। সেই স্বপ্ন পূরণে ভারতের জম্মু-কাশ্মীর থেকে ছেলেকে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন নিঘাত বেগম। চেয়েছিলেন, সন্তানের পড়াশোনা যেন আর বাধাগ্রস্ত না হয়। একদিন সাদা অ্যাপ্রোন গায়ে জড়িয়ে মানুষের সেবা করবে ছেলে। কিন্তু সেই স্বপ্নের করুণ পরিণতি হলো সন্তানের রহস্যজনক মৃত্যুতে। যে মা ছেলের পাশে থাকতে বাংলাদেশে এসেছিলেন, এখন তাঁকেই ছেলের মরদেহ নিয়ে ফিরতে হচ্ছে দেশে।
নিহত শিক্ষার্থীর নাম আদনান আলতাফ। তিনি ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের বারামুল্লা জেলার সুপুর এলাকার বাসিন্দা আলতাফ হোসাইন রাথারের ছেলে। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কাবিলায় অবস্থিত ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।
বুধবার সকালে কলেজের পাশের একটি পুকুর থেকে আদনানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কলেজ ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন ওই পুকুরে তাঁর মরদেহ ভাসছিল। এর আগে গত ২ নভেম্বর রাতে কলেজের হোস্টেল থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন তিনি।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, শারীরিক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পড়াশোনায় অনিয়মিত ছিলেন আদনান। নিয়মিত ক্লাস করতে না পারায় শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়েন। পরে চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের জন্য তাঁকে ভারতে নিয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। সুস্থ হয়ে আবার পড়াশোনা শুরু ও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রত্যাশায় গত ৩০ অক্টোবর মাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে ফেরেন তিনি। ছেলের পড়াশোনায় সহযোগিতা করতে মা নিঘাত বেগমও তাঁর সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
গত ২ নভেম্বর রাতে হোস্টেল থেকে বের হওয়ার পর আদনানের আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন কলেজ কর্তৃপক্ষ ও তাঁর মা বুড়িচং থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পুলিশ বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে তাঁকে খুঁজতে শুরু করে। এর মধ্যেই বুধবার সকালে পুকুরে তাঁর মরদেহ পাওয়ার খবর আসে। পরে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও মা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন।
বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লুৎফুর রহমান জানান, স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ পুকুর থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। প্রাথমিকভাবে শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও জানান, মরদেহ ঢাকায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হবে। সেখানে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পর আইনগত প্রক্রিয়া শেষে ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। তবে আদনানের মৃত্যু দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের বিদেশি শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ক শিক্ষক রাজীব আশ্রাফ বলেন, আদনান কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। অসুস্থতার কারণে নিয়মিত পড়াশোনা করতে না পারায় পিছিয়ে পড়েছিলেন। পরে বাড়িতে চিকিৎসা শেষে পরীক্ষায় অংশ নিতে মাকে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন।
কলেজের চেয়ারম্যান শাহ মো. সেলিম জানান, আদনান মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত ছিলেন এবং নিয়মিত ক্লাস করতেন না। বিষয়টি অভিভাবকদের জানানো হলে তাঁরা তাঁকে দেশে নিয়ে কাউন্সেলিং করান। শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তাঁর মাকেও সঙ্গে রাখা হয়েছিল।

