
একই ছাদের নিচে বসবাস, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, সংসারের দায়িত্ব পালন—সবই চলছে নিয়মমতো। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, দাম্পত্যে কোনো সমস্যা নেই। অথচ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নেই মনের কথা ভাগ করে নেওয়ার আগ্রহ, আবেগ কিংবা ঘনিষ্ঠতা। পাশাপাশি থেকেও দুজন অনুভব করছেন একাকিত্ব। আইনি বিচ্ছেদ না হলেও সম্পর্কের এমন অবস্থাকে বলা হয় ‘ইমোশনাল ডিভোর্স’ বা আবেগিক বিচ্ছেদ।
এটি কোনো আনুষ্ঠানিক রোগনির্ণয় নয়। বরং দাম্পত্য সম্পর্কে আবেগ, যোগাযোগ ও মানসিক ঘনিষ্ঠতা হারিয়ে যাওয়ার একটি অবস্থা। ২০২৩ সালে ‘বিএমসি সাইকোলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব, দাম্পত্যে অসন্তুষ্টি, ঘনিষ্ঠতা কমে যাওয়া এবং সঙ্গীর অনুভূতির প্রতি উদাসীনতাকে আবেগিক বিচ্ছেদের লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন তৈরি হয় এই দূরত্ব?
আবেগিক বিচ্ছেদ সাধারণত একদিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিনের অভিমান, অবহেলা, অসম্মান, বিশ্বাসের সংকট কিংবা অমীমাংসিত বিরোধ ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে দেয়। শুরুতে একজন হয়তো নিজের কষ্টের কথা জানান, সমাধান চান। কিন্তু বারবার উপেক্ষিত হলে একসময় কথা বলার চেষ্টাও বন্ধ করে দেন। অভিযোগ কমে গেলেও সমস্যার সমাধান হয় না। বরং দুজনের মধ্যে বাড়তে থাকে নীরব দূরত্ব।
এ ছাড়া কর্মব্যস্ততা, অর্থনৈতিক চাপ, সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব, অসম প্রত্যাশা ও শারীরিক ঘনিষ্ঠতার অভাবও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারও দাম্পত্যে মানসিক দূরত্ব বাড়ানোর একটি কারণ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
২০২৪ সালে ‘বিএমসি সাইকিয়াট্রি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত তেহরানের ৪০০ বিবাহিত নারীর ওপর করা এক গবেষণায় ইন্টারনেট আসক্তি ও পারিবারিক সহিংসতার সঙ্গে আবেগিক বিচ্ছেদের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে গবেষণাটি এসব বিষয়কে সরাসরি বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে প্রমাণ করে না।
মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব
আবেগিক বিচ্ছেদের প্রভাব শুধু দাম্পত্য সম্পর্কে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি মানসিক সুস্থতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৩ সালে ‘পিএলওএস ওয়ান’ সাময়িকীতে প্রকাশিত সৌদি আরবের ২৪১ জন বিবাহিত নারীর ওপর করা এক গবেষণায় আবেগিক বিচ্ছেদের সঙ্গে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও একাকিত্বের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা যায়, আবেগিক বিচ্ছেদের মাত্রা বেশি হলে এসব সমস্যার মাত্রাও তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
ফিরে পাওয়া সম্ভব সম্পর্কের উষ্ণতা?
দাম্পত্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হলে প্রথমেই প্রয়োজন সমস্যাটি স্বীকার করা। একে অপরের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, নিজের অনুভূতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং জমে থাকা অভিমান নিয়ে খোলামেলা আলোচনা সম্পর্কের উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে। দীর্ঘদিনের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে দম্পতি পরামর্শকের সহায়তাও নেওয়া যেতে পারে।
তবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব একা একজনের নয়। দুজনেরই আন্তরিকতা, পারস্পরিক সম্মান ও পরিবর্তনের ইচ্ছা থাকতে হবে। আর সম্পর্কে নির্যাতন বা নিরাপত্তাহীনতা থাকলে সবার আগে নিজের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় উঠে আসে, একই ছাদের নিচে বসবাস করলেই দুজন মানুষ মানসিকভাবে কাছাকাছি থাকেন না। কখনো কখনো আইনি বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনেক আগেই একটি দাম্পত্যে ঘটে যায় আবেগিক বিচ্ছেদ।

