
স্মার্টফোন খুললেই বন্ধুদের ভিড়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত পরিচিত মানুষ, প্রতিদিন অসংখ্য বার্তা ও কথোপকথন। অথচ দিন শেষে মনের কথা বলার মতো কাউকে খুঁজে পান না অনেক তরুণ। বাইরে থেকে হাসিখুশি ও ব্যস্ত মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তাঁরা ভুগছেন নিঃসঙ্গতায়। যোগাযোগের এত সুযোগ থাকার পরও কেন বাড়ছে একাকিত্ব? গবেষকদের মতে, পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের চাপ, ডিজিটাল যোগাযোগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং অর্থপূর্ণ সম্পর্কের অভাব তরুণদের এই নিঃসঙ্গতার অন্যতম কারণ।
বন্ধু অনেক, মনের কথা শোনার মানুষ নেই
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। কারও ছবিতে মন্তব্য, কারও পোস্টে প্রতিক্রিয়া, আবার কারও সঙ্গে নিয়মিত বার্তা বিনিময়। কিন্তু এসব যোগাযোগের মধ্যেও অনেকের মনে তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য শূন্যতা।
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা অনলাইনে দীর্ঘ সময় কাটানোর পরও মনে হতে পারে, কেউ যেন সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারছে না। নিজের কষ্ট, ভয় কিংবা হতাশার কথা ভাগ করে নেওয়ার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় থাকা আর অর্থপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠা এক বিষয় নয়। একাকিত্ব মানেই একা থাকা নয়। মানুষের ভিড়েও কেউ নিঃসঙ্গ বোধ করতে পারেন, যদি সেখানে আন্তরিকতা ও মানসিক সংযোগের অভাব থাকে।
বিশ্বজুড়েই বাড়ছে তরুণদের একাকিত্ব
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সামাজিক সংযোগবিষয়ক কমিশনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে তরুণদের একাকিত্বের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের প্রায় ১৭ থেকে ২১ শতাংশ একাকিত্ব অনুভব করেন। অন্যান্য বয়সী গোষ্ঠীর তুলনায় তরুণদের মধ্যে এ হার বেশি।
এ ছাড়া ৩৮টি দেশের ১০ লাখের বেশি তরুণের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তরুণদের একাকিত্ব বেড়েছে। জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশেও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা।
পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের চাপে হারাচ্ছে বন্ধুত্ব
ভালো ফল, পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, দক্ষতা অর্জন এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গড়ার প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে অল্প বয়স থেকেই। স্কুলের পড়াশোনা, কোচিং, পরীক্ষা ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণে ব্যস্ত থাকতে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে যাচ্ছে অনেকের।
অভিভাবকেরাও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নানা কাজে ব্যস্ত রাখছেন। কিন্তু এর ফলে অবসর, খেলাধুলা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেশার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক মিশেল লিমের মতে, শিক্ষাগত সাফল্যের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ায় সামাজিক দক্ষতা গড়ে তোলার বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়।
অথচ বন্ধুত্ব তৈরি, মতের অমিল সামলানো, অন্যের অনুভূতি বোঝা এবং নিজের মনের কথা প্রকাশ করার দক্ষতা গড়ে ওঠে নিয়মিত মেলামেশার মধ্য দিয়ে।
অনলাইনে পরিচয়, বাস্তবে দূরত্ব
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দূরে থাকা মানুষকে কাছে এনেছে। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা কিংবা একই আগ্রহের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে অনলাইনে যোগাযোগ সব সময় গভীর সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না।
কারও ছবিতে মন্তব্য করা, পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানানো কিংবা ইনবক্সে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের মধ্যেই অনেকের যোগাযোগ সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে পরিচিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও আন্তরিক বন্ধুত্বের জায়গাটি থেকে যায় অপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কের গভীরতা তৈরি করতে সময়, বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ প্রয়োজন। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকলেই সেই প্রয়োজন পূরণ হয় না।
অন্যের সুখের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের আনন্দময় মুহূর্ত, ভ্রমণ, জন্মদিন কিংবা সাফল্যের ছবি দেখতে দেখতে অনেক তরুণ নিজের জীবনকে ছোট করে দেখতে শুরু করেন।
মনে হতে পারে, অন্য সবার জীবন আনন্দে ভরা, শুধু নিজের জীবনেই অপূর্ণতা। এই তুলনা থেকে তৈরি হতে পারে হতাশা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ও পিছিয়ে পড়ার অনুভূতি।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সব সময় নেতিবাচক নয়। অনেকের জন্য অনলাইন কমিউনিটি নতুন বন্ধুত্ব ও মানসিক সমর্থন পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। সমস্যা তখনই বাড়ে, যখন অনলাইন যোগাযোগ বাস্তব জীবনের সম্পর্কের জায়গা দখল করে নেয়।
প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়েও বাড়ে নিঃসঙ্গতা
নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগ্রহ থাকলেও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় অনেককে পিছিয়ে দেয়। কেউ ভাবেন, অন্যরা হয়তো তাঁকে পছন্দ করবেন না। কেউ আবার প্রথমে কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন।
ফলে সম্পর্কের প্রয়োজন অনুভব করেও অনেকে উদ্যোগ নিতে পারেন না। একবার যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ হলে পরবর্তী সময়ে নতুন করে বন্ধুত্ব গড়ার আগ্রহও কমে যায়।
গবেষক মিশেল লিমের ব্যাখ্যায়, একাকিত্বে ভুগতে থাকা মানুষ ধীরে ধীরে সামাজিক পরিস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। সেই অস্বস্তি এড়াতে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দেন। এতে নতুন সম্পর্ক তৈরির সুযোগ কমে যায় এবং একাকিত্ব আরও গভীর হয়।
নিঃসঙ্গতা কাটাতে প্রয়োজন আন্তরিক সম্পর্ক
একাকিত্ব কমাতে শত শত বন্ধু তৈরির প্রয়োজন নেই। বরং অল্প কয়েকজন মানুষের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বন্ধুর খোঁজ নেওয়া, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলা কিংবা নিয়মিত একসঙ্গে সময় কাটানোর মতো ছোট উদ্যোগ সম্পর্ককে গভীর করতে পারে।
পাশাপাশি পড়াশোনা ও কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও সামাজিক যোগাযোগের জন্য সময় রাখা প্রয়োজন। নতুন পরিবেশে বন্ধুত্ব তৈরি করতে সময় লাগলে নিজেকে ব্যর্থ ভাবারও কারণ নেই। বিশ্বাস ও আন্তরিকতা গড়ে উঠতে সময় লাগে।
একাকিত্বকে শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রেও মানুষের মধ্যে আন্তরিক যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
দিন শেষে মানুষের প্রয়োজন শুধু অনলাইনে উপস্থিতি কিংবা অসংখ্য বন্ধুর তালিকা নয়। প্রয়োজন এমন কিছু মানুষ, যাঁদের কাছে নির্দ্বিধায় নিজের কষ্টের কথা বলা যায়, যাঁরা মন দিয়ে শোনেন এবং যাঁদের পাশে থাকলে মনে হয়—এই পৃথিবীতে আমি একা নই।
Show less

