সুখী হতে নিজের সম্পর্কে যে ৫ ধারণা বদলানো জরুরি

সুখী হতে নিজের সম্পর্কে যে ৫ ধারণা বদলানো জরুরি - the Bengali Times
সুখী হতে বাইরের পরিস্থিতি বদলানোর পাশাপাশি নিজের চিন্তাভাবনা নিয়েও নতুন করে ভাবা প্রয়োজন

সুখী হতে কে না চান! কেউ মনে করেন, জীবনের সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেই মিলবে শান্তি। কেউ অপেক্ষা করেন মনের মতো একজন মানুষের, আবার কেউ ভাবেন—আরও অর্থ, ভালো চাকরি কিংবা বড় বাড়ি পেলেই জীবন পূর্ণ হবে। কিন্তু সুখের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করা এসব ধারণাই কখনো কখনো হয়ে উঠতে পারে মানসিক অশান্তির কারণ।

দার্শনিকদের মতে, সুখী হতে বাইরের পরিস্থিতি বদলানোর পাশাপাশি নিজের চিন্তাভাবনা নিয়েও নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। এমন পাঁচটি ধারণা রয়েছে, যেগুলো বদলাতে পারলে জীবনকে আরও সহজভাবে দেখা সম্ভব।

- Advertisement -

১. ‘আমাকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে হবে’

জীবনের সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অতীত বদলানো যায় না, বয়স বাড়া থামানো যায় না, এমনকি অন্য মানুষ আমাদের সম্পর্কে কী ভাববেন, সেটিও পুরোপুরি আমাদের হাতে নেই। অথচ অনেক সময় এসব বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে গিয়ে নষ্ট হয় সময় ও মানসিক শক্তি।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এপিকটিটাসের দর্শন অনুযায়ী, নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়া এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরের বিষয়গুলো মেনে নিতে শেখা জরুরি। কোথায় চেষ্টা করতে হবে আর কোথায় পরিস্থিতি মেনে নিতে হবে, তা বুঝতে পারলেই অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা কমতে পারে।

২. ‘মনের মতো কাউকে পেলেই সুখী হব’

অনেকেই মনে করেন, জীবনে বিশেষ একজন মানুষ এলে সব অপূর্ণতা দূর হয়ে যাবে। কিন্তু নিজের সুখের পুরো দায়িত্ব অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়া সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি করতে পারে।

ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ারের চিন্তায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিজস্ব সত্তার গুরুত্ব রয়েছে। ভালোবাসার সম্পর্কে সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা প্রয়োজন। তবে তার অর্থ এই নয় যে নিজের ইচ্ছা, পরিচয় ও স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হবে।

জীবনে ভালোবাসার মানুষ থাকা আনন্দের। কিন্তু অন্যের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়ার পাশাপাশি নিজের ভালো থাকা ও আত্মপরিচয়ের প্রতিও যত্নশীল হওয়া জরুরি।

৩. ‘আমি যেমন, চিরকাল তেমনই থাকব’

নিজের স্বভাব বা চিন্তাভাবনা কখনো বদলাবে না—এমন ধারণা মানুষকে পরিবর্তনের সুযোগ থেকে দূরে রাখতে পারে। অথচ নতুন অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়।

দার্শনিক ডেভিড হিউম মানুষের স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় সত্তার ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর চিন্তা থেকে বোঝা যায়, মানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও স্মৃতি পরিবর্তিত হতে থাকে।

অতীতে ভুল করেছেন বলে ভবিষ্যতেও একই ভুল করতে হবে, এমন নয়। নিজের ভুল স্বীকার করা, তা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে বদলে নেওয়াই এগিয়ে যাওয়ার পথ। তাই নিজেকে পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

৪. ‘পৃথিবী আমাকে এটা দিতে বাধ্য’

অনেক সময় মনে হয়, পরিশ্রম করেছি, তাই সফল হতেই হবে। অন্যের জন্য ভালো কিছু করেছি, তাই তার কাছ থেকেও ভালো ব্যবহার পাওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় আমাদের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না। চেষ্টা করেও ব্যর্থতা আসতে পারে, আবার প্রাপ্য বলে মনে করা অনেক কিছুই অধরা থেকে যেতে পারে।

ফরাসি দার্শনিক আলবেয়ার কামুর দর্শনে জীবনের অর্থ খোঁজার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে জীবনের প্রতিটি ঘটনা যে আমাদের প্রত্যাশামতো হবে কিংবা প্রতিটি ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

তাই সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো হওয়ার দাবি না করে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া দরকার। প্রত্যাশা পূরণ না হলেও পরিস্থিতির মধ্যে নতুন সম্ভাবনা খোঁজা এবং যথাসাধ্য ভালোভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করাই গুরুত্বপূর্ণ।

৫. ‘আরও অর্থ, ভালো চাকরি ও বড় বাড়ি পেলেই সুখী হব’

স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচতে অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। আর্থিক নিরাপত্তা মানুষের জীবনে স্থিতি আনে এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ তৈরি করে। তবে সম্পদ বাড়লেই সুখ একই হারে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাসের দর্শনে সাধারণ জীবন ও অল্পতে সন্তুষ্ট থাকার গুরুত্ব রয়েছে। তাঁর ভাবনা অনুযায়ী, অল্পতে সন্তুষ্ট হতে না পারলে অনেক কিছু অর্জন করেও তৃপ্তি পাওয়া কঠিন হতে পারে। বৌদ্ধ দর্শনেও অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষাকে দুঃখের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়।

অর্থ উপার্জন কিংবা সাফল্যের জন্য চেষ্টা করা ভুল নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ভবিষ্যতে আরও কিছু পাওয়ার আশায় বর্তমানের আনন্দকে উপেক্ষা করা হয়। নতুন কিছু অর্জনের স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি এখন যা আছে, তার মূল্য বুঝতে শেখাও জরুরি।

সুখের খোঁজ শুরু হোক নিজের ভেতর থেকে

সুখী হতে শুধু বাইরের পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা যথেষ্ট নয়; নিজের চিন্তাভাবনা ও প্রত্যাশা সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, অন্যের ওপর সুখের দায়িত্ব চাপানো কিংবা আরও বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বর্তমানকে অবহেলা করা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

জীবনে অর্থ, ভালোবাসা ও সাফল্যের গুরুত্ব রয়েছে। তবে এসব অর্জনের পথে চলতে গিয়ে বর্তমানের ছোট ছোট আনন্দ হারিয়ে ফেললে সুখও অধরা থেকে যেতে পারে। নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়া, পরিবর্তনকে গ্রহণ করা এবং প্রাপ্তির মূল্য বুঝতে শেখাই সুখী জীবনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles