
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের রোমান্টিক মুহূর্ত, দামি উপহার কিংবা চমকপ্রদ আয়োজন দেখে অনেকেই নিজের সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করেন। এতে সঙ্গীর কাছ থেকে বাড়তি মনোযোগ ও বিশেষ আচরণের প্রত্যাশা তৈরি হয়। প্রত্যাশা পূরণ না হলে সম্পর্কে দেখা দিতে পারে হতাশা, অভিমান ও অশান্তি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সম্পর্কবিষয়ক ছোট ভিডিও আধুনিক প্রেম ও ডেটিংয়ের ধারণাকে প্রভাবিত করছে। এসব ভিডিওতে সম্পর্কের নানা সমস্যার সহজ সমাধান তুলে ধরা হলেও বাস্তব জীবনে প্রতিটি সম্পর্কের পরিস্থিতি এক নয়।
সম্প্রতি ভারতের ডেটিং অ্যাপ কোয়াককোয়াকের এক জরিপে ২২ থেকে ৩৮ বছর বয়সী ১০ হাজারের বেশি মানুষের মতামত নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, সামাজিক মাধ্যমে সম্পর্কবিষয়ক পরামর্শ দেখে অনেকে নিজেদের সম্পর্ককে নতুনভাবে বিচার করতে শুরু করেন। তবে অনলাইনে দেওয়া প্রতিটি পরামর্শ সব সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর নয়।
ভাইরাল পরামর্শ কি সম্পর্কের মানদণ্ড?
সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই বলা হয়, সঙ্গী সত্যিই ভালোবাসলে নিজে থেকেই সবকিছু করবেন কিংবা বিশেষ আয়োজন না করলে ভালোবাসার প্রকাশ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এসব বক্তব্য দেখে কেউ কেউ নিজের সঙ্গীর কাছ থেকেও একই আচরণ প্রত্যাশা করেন। তা পূরণ না হলে তৈরি হয় অভিমান ও মনোমালিন্য।
অথচ কাজ শেষে একা কিছুটা সময় কাটাতে চাওয়া মানেই সঙ্গীর প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া নয়। একইভাবে বড় আয়োজন করে ঘুরতে যাওয়া বা দামি উপহার দেওয়াই ভালোবাসার একমাত্র প্রমাণ নয়। মানুষের ভালোবাসা প্রকাশের ধরন, আর্থিক সামর্থ্য ও ব্যক্তিগত চাহিদা ভিন্ন হতে পারে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৬০ শতাংশ পুরুষ কাজ শেষে একা সময় কাটানোকে আবেগগত দূরত্বের লক্ষণ হিসেবে দেখার ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। অন্যদিকে, ৩৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, বড় আয়োজন করে ঘুরতে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে না পারলেই সঙ্গীকে কম যত্নশীল ভাবা উচিত নয়।
ডেটিং অ্যাপ কোয়াককোয়াকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী রবি মিত্তাল বলেন, সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি ও পারস্পরিক বোঝাপড়া গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া প্রতিটি পরামর্শ নিজের সম্পর্কে অন্ধভাবে প্রয়োগ করা ঠিক নয়। কোনো পরিস্থিতিতে ফোন না করা অবহেলার লক্ষণ হতে পারে, আবার অন্য পরিস্থিতিতে তার ভিন্ন কারণও থাকতে পারে।
সামাজিক মাধ্যম থেকে ইতিবাচক শিক্ষাও পাওয়া যায়
সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব সব সময় নেতিবাচক নয়। জরিপে ৪৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, সম্পর্কের ওপর সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব একেবারে অস্বীকার করা যায় না। ত্রিশের কোঠায় থাকা নারীদের প্রায় ২৭ শতাংশের মতে, সম্পর্কবিষয়ক এসব বিষয়বস্তু কখনো কখনো সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করে। জরিপে প্রতি ১০ জনে চারজন জানান, অন্যের সম্পর্কবিষয়ক বিষয়বস্তু দেখে তাঁরা ব্যক্তিগত সীমারেখা ও নিজেদের প্রয়োজন সম্পর্কে শিখেছেন।
অন্যের সাজানো মুহূর্তে নিজের সম্পর্ককে বিচার
সামাজিক মাধ্যমে দেখা প্রেমের অনেক মুহূর্তই পরিকল্পিতভাবে ধারণ করা হয়। একাধিকবার ভিডিও ধারণ, বিশেষ আয়োজন কিংবা বাছাই করা ছবি দিয়ে তৈরি হয় নিখুঁত প্রেমের দৃশ্য। এসব ছবি বা ভিডিও একটি সম্পর্কের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। তারপরও অনেকে নিজের সম্পর্কের সঙ্গে সেগুলোর তুলনা করেন।
জরিপে ৩ হাজার ৩৪৭ জন অংশগ্রহণকারী জানান, তাঁরা জানেন যে সামাজিক মাধ্যমে সম্পর্কের বাছাই করা মুহূর্তগুলোই বেশি তুলে ধরা হয়। তা সত্ত্বেও তাঁরা সেসব মুহূর্তের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের তুলনা করেন।
জরিপে অংশ নেওয়া বেঙ্গালুরুর আকৃতি বলেন, সামাজিক মাধ্যমে বড় আয়োজনের বিয়ের প্রস্তাব, চমকপ্রদ উপহার কিংবা স্বপ্নের মতো যুগল ছবির প্রবণতা সাধারণ সম্পর্ককেও ব্যর্থ বলে মনে করাতে পারে। অন্যের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া ভালো, কিন্তু তা তুলনায় পরিণত হলে সম্পর্কের ছোট ছোট ভালোবাসার প্রকাশও গুরুত্ব হারায়।
তুলনা নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক বোঝাপড়া
সামাজিক মাধ্যমে অন্যের প্রেম দেখে সঙ্গীর কাছ থেকে একই ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করার আগে নিজের চাহিদা বোঝা জরুরি। সম্পর্কে আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন, স্পষ্ট যোগাযোগ দরকার, নাকি মানসিক আশ্বাস—তা নিজের কাছে পরিষ্কার করা উচিত।
এরপর সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করে চাহিদা ও প্রত্যাশার বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। কারণ, প্রতিটি সম্পর্কের নিজস্ব বাস্তবতা রয়েছে। অন্যের সম্পর্কের সাজানো মুহূর্তের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের তুলনা না করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা ও বোঝাপড়াকে গুরুত্ব দিলেই সম্পর্ক আরও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।

