আমাদের ম্যাক

আমাদের ম্যাক - the Bengali Times
ম‍্যাক অর্থাৎ মাকসুদুল হক আমার বাল্যকালের বন্ধু

ম‍্যাক অর্থাৎ মাকসুদুল হক। আমার বাল্যকালের বন্ধু। আমরা প্রতিবেশীই ছিলাম- মিরপুর-পল্লবীতে। তখন বয়স কম, স্বপ্ন অনেক। জীবন ছিল সহজ, সরল ও আনন্দময়। পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই দিনগুলোই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও নির্মল সময়।

মাকসুদ গান করত, আমি কবিতা লিখতাম। একজনের হাতে গান, অন্যজনের হাতে কবিতা- আর আমাদের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব। সেই বন্ধুত্বে কত গল্প, আড্ডা, ঘোরাঘুরি, লেখালেখি, অভিমান, ঝগড়া- তার হিসাব নেই।

- Advertisement -

মাকসুদের জীবনের নানা চড়াই-উতরাইয়েও আমি তার পাশে ছিলাম। রবীন্দ্র সংগীতের কপিরাইট শেষ হবার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনে স্বরচিত সুরে রবি ঠাকুরের গান গাওয়া কেন্দ্র করে বিতর্কে জড়িয়ে সে যখন জেলে গেল, তাকে মুক্ত করার জন্য আমরাও ছুটেছিলাম। তার পক্ষে দাঁড়িয়ে একটি ছোট লিফলেটও প্রচার করেছিলাম- ‘রবীন্দ্র রাজাকার’। খুব ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ওয়াহিদল হক।

এত বছর পর সেসব ঘটনা মনে হলে মনে হয়, জীবনের বিচ্ছিন্ন কিছু দৃশ্য যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে; অথচ প্রতিটির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে আমাদের বন্ধুত্ব।

মাকসুদের বাসায় আড্ডা, রাতভর গল্প, একসঙ্গে ঘোরাঘুরি, তার মায়ের মৃত্যু- কত কত স্মৃতি! বন্ধুত্বে ভালোবাসার পাশাপাশি অভিমান, রাগ ও ঝগড়াও থাকে। আমাদেরও হয়েছে। কখনো দূরত্ব তৈরি হয়েছে, কখনো কথা বন্ধ থেকেছে। তারপর একদিন মাকসুদকে পেছনে ফেলে আমি চলে এলাম কানাডায়।

দু’ বছর আগে মাকসুদও কানাডায় এলো। আবার দেখা হলো, আড্ডা জমল, গল্প ফিরে এল। মনে হলো, সময় আমাদের বন্ধুত্বকে কোথাও নিয়ে যায়নি; শুধু কিছুদিনের জন্য দূরে সরিয়ে রেখেছিল। পুরোনো দিনের কথা উঠলেই পল্লবী, তারুণ্য আর সেই হাসি-আড্ডা যেন আবার ফিরে আসে।

কয়েক দিন ধরে একটি কথাই ভাবছি—Old is Gold।

এখানে তুলনা করা হয়তো ঠিক নয়। তবু দুটি পরিবেশনার কথা পাশাপাশি মনে পড়ছে- কাউকে ছোট করার জন্য নয়, বরং মঞ্চে শিল্পীর নিজস্ব ভাষা ও শক্তি কত বিচিত্র হতে পারে, তা বোঝাতে।

টরন্টোর বাংলা মেলায় গান করার আগে মাকসুদ আমাকে তার বাসায় ডাকল। প্রায় পুরো দিন তার সঙ্গে কাটালাম। আড্ডা হলো, গল্প হলো, পানাহারও হলো। কিন্তু তাকে দেখে মনে প্রশ্ন জাগল- এই শরীর নিয়ে সে মঞ্চে গান করবে কীভাবে?

হাঁটুতে ব্যান্ডেজ, শরীর আগের চেয়ে ভারী, বয়সও তো কম হলো না।

কিন্তু মঞ্চে উঠতেই যেন সব হিসাব পাল্টে গেল! মাথায় গামছা বাঁধা মাকসুদ গান শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মঞ্চ মাতিয়ে তুলল, দর্শকদেরও নাচালেন এবং নিজেও নাচলেন। তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, আই কন্ট্রাক্ট, কণ্ঠের শক্তি, গানের সঙ্গে শরীরের ছন্দ এবং দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক- সবকিছু আমাকে মুগ্ধ করল।

অবাক হয়ে দেখলাম, কিছুক্ষণ আগের সেই ব্যান্ডেজ বাঁধা হাঁটুর মানুষটি যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণ মাকসুদ- প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল, দূরন্ত! দারুণ…

এরপর টরন্টো প্যাভিলিয়নে জনপ্রিয় শিল্পী অর্ণবের একটি পরিবেশনা দেখলাম। বয়সে সে মাকসুদের প্রায় অর্ধেক। অসাধারণ প্রতিভাবান গায়ক, সুরকার ও সংগীতশিল্পী। তার গান শুনতে গিয়েছিলাম মুগ্ধ হওয়ার জন্যই, এবং তার পরিবেশনায় মুগ্ধ হওয়ার মতো অনেক কিছুই ছিল।

অর্ণবের মঞ্চভাষা মাকসুদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সে স্থির হয়ে চেয়ারে বসে, চোখ বন্ধ করে, ঝিমুতে ঝিমুতে সংগীতের ঘোরের ভেতর ডুবে থেকে গান করছিল। তার পরিবেশনায় ছিল অন্তর্মুখী এক আবেশ—যেন গানটি শুধু দর্শকের জন্য নয়, নিজের ভেতরের কোনো অনুভূতির সঙ্গেও তার কথোপকথন। ঝিমিয়ে পড়া, নেতিয়ে পড়া গাছের মত।

নিউজের জন্য আমি একটি ছবি তুলতে চেয়েছিলাম- একবার চোখ খুলে ক্যামেরার দিকে তাকাক। কিন্তু তার নিমগ্নতা এত গভীর ছিল যে সেই মুহূর্তটি ভাঙতে ইচ্ছে করল না। পরে শেখ আনোয়ারকে বললাম, ‘ভাই, তুমি একটা ছবি নাও।’ অনেক চেষ্টা করে সেও শেষ পর্যন্ত একটি ছবি তুলতে পারল।

সেদিন মনে হলো, মঞ্চে শিল্পীর উপস্থিতি একেকজনের ক্ষেত্রে একেকভাবে প্রকাশ পায়। মাকসুদের শক্তি তার উচ্ছ্বাস, চলন, কণ্ঠের দাপট এবং দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে। সে মঞ্চকে প্রাণবন্ত করে তোলে, দর্শকদের নিজের ছন্দের মধ্যে টেনে নেয়।অর্ণবের শক্তি হয়ত অন্য জায়গায়।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles