ফোনের পর্দায় চোখ, সম্পর্কে দূরত্ব—যেভাবে অদৃশ্য দেয়াল হয়ে উঠছে ‘ফাবিং’

ফোনের পর্দায় চোখ, সম্পর্কে দূরত্ব—যেভাবে অদৃশ্য দেয়াল হয়ে উঠছে ‘ফাবিং’ - the Bengali Times
ফোন ও উপেক্ষাএই দুটি শব্দের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে ফাবিং শব্দটি

প্রিয় মানুষটি পাশে বসে কথা বলছেন। অথচ আপনার চোখ তার দিকে নয়, আটকে আছে মুঠোফোনের পর্দায়। মাঝেমধ্যে কথার উত্তর দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু মন পড়ে আছে বার্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা নতুন কোনো বিজ্ঞপ্তিতে। আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক এই অভ্যাসই ধীরে ধীরে সম্পর্কে তৈরি করতে পারে অদৃশ্য দূরত্ব। মনোবিজ্ঞানে এই আচরণকে বলা হয় ‘ফাবিং’।

‘ফোন’ ও ‘উপেক্ষা’—এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে ফাবিং শব্দটি। অর্থাৎ, কারও সঙ্গে সামনাসামনি থাকার পরও তাকে উপেক্ষা করে মুঠোফোনে ব্যস্ত থাকাই ফাবিং। এর সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি বিষয় হলো ‘প্রযুক্তিগত বিঘ্ন’, যেখানে বারবার বিজ্ঞপ্তি, কল বা বার্তার কারণে কাছের মানুষের সঙ্গে কাটানো সময়েও মনোযোগ নষ্ট হয়।

- Advertisement -

কেন মানুষ ফাবিং করে?

ফাবিংয়ের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মুঠোফোনের মাধ্যম মানুষের মধ্যে তাৎক্ষণিক আনন্দ পাওয়ার অভ্যাস তৈরি করে। ফলে সামনাসামনি কথোপকথনের চেয়ে পর্দার প্রতি আকর্ষণ বাড়তে পারে।

আবার অনেকের মধ্যে থাকে কিছু হারিয়ে ফেলার ভয়। অনলাইনে নতুন কী ঘটছে, কে কী প্রকাশ করল—এসব না দেখলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিস হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। এই উদ্বেগও মানুষকে বারবার ফোন হাতে নিতে বাধ্য করে।

কোনো আড্ডায় অস্বস্তি বা সঙ্গীর সঙ্গে মনোমালিন্য থাকলেও কেউ কেউ ফোনকে একধরনের আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিনের সম্পর্কে একঘেয়েমি বা ক্লান্তি তৈরি হলেও একই ঘটনা ঘটতে পারে।

সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব পড়ে?

সঙ্গী সামনে থেকেও ফোনে ব্যস্ত থাকলে অপর ব্যক্তি সহজেই নিজেকে অবহেলিত ও গুরুত্বহীন মনে করতে পারেন। এতে একাকিত্ব, অভিমান ও দূরত্ব বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে এবং সম্পর্কের সন্তুষ্টিও কমে যেতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সঙ্গীর উপস্থিতিতে মুঠোফোন ব্যবহারের প্রবণতা বেশি হলে দাম্পত্য অসন্তোষ ও মানসিক চাপের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। অর্থাৎ, কয়েক মিনিটের ফোন ব্যবহারও নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হলে তা সম্পর্কের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

শুধু ফোনে ব্যস্ত থাকাই নয়, সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমা নিয়েও সমস্যা তৈরি হতে পারে। সঙ্গীর অবস্থান অনুসরণ করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করা কিংবা পাসওয়ার্ড ভাগ করে নেওয়ার মতো বিষয়েও দুজনের মতভিন্নতা থাকলে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।

কীভাবে কমাবেন ফাবিং?

সমাধানের শুরু হতে পারে খোলামেলা কথোপকথন দিয়ে। সঙ্গীর ফোন ব্যবহারে কষ্ট পেলে অভিযোগ না করে নিজের অনুভূতির কথা শান্তভাবে জানানো জরুরি। দুজন মিলে নির্দিষ্ট কিছু সময় ‘ফোনমুক্ত’ রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া যেতে পারে।

খাওয়ার সময়, ঘুমের আগে কিংবা একসঙ্গে বাইরে গেলে ফোন দূরে রাখার অভ্যাস তৈরি করা কার্যকর হতে পারে। সঙ্গী ফোনে ব্যস্ত থাকলে বিরক্ত না হয়ে গল্প, হাঁটাহাঁটি বা অন্য কোনো যৌথ কাজের প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে।

তবে সম্পর্কের নামে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিসর্জন দেওয়াও সমাধান নয়। একে অপরের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করার পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।

আর নিজেদের চেষ্টায় সমস্যার সমাধান না হলে দম্পতি পরামর্শকের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। কারণ সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু পাশাপাশি থাকা নয়—পাশে থাকা মানুষটির দিকে মনোযোগ দেওয়াও।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles