
তার সাথে আমার যখন পরিচয় হয় তখন তার কৈশোর।অগ্রজ এর সাথে এক সন্ধায় খুলনা ২৫০ শয্যার হাসপাতালে এসেছিলো।আমি ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার।নাম শান্ত। চুপচাপ ছেলেটি।একটু রাত হয়ে গিয়েছিলো ওদের। হাসপাতালের এ দিকটা তখন ছিলো নির্জন।রিক্সা,গাড়ী কোনটিই সময়মতো পাওয়া যেতনা তাই ড্রাইভার কে বললাম এ্যাম্বুলেন্সে করে ওদেরকে রেখে আসতে। এ্যাম্বুলেন্সে উঠবে না।অনেক বুঝিয়ে ওঠালাম দুজনকে।বললাম শহরের ভেতর যেখানে খুশী নেমে যেও।ঐ দিনই পরিচয় তার সাথে।এর মধ্যেই জানতে পারলাম জন্মের পূর্বেই সে তার বাবাকে হারিয়েছে। বাবা কি সেটা তার বিধবা মাকে অনেকদিন প্রশ্ন করেও কোন উত্তর পায়নি।ফলে তার দিন কেটেছে একটি প্রশ্নের উত্তর ছাড়াই।একদিন একটা ছবি এনে দেখালো। দু হাতে মুঠি করে দুটি সাদা কবুতর ধরে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হয় তার সব সুখ যেন কবুতর প্রেমী হিসাবে।
খুলনা ছেড়ে চলে এলাম দু বছর পর। এর পর মাঝে মাঝে তার সাথে দেখা হয়।মা আর ভাইদের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা তার। স্কুলের সীমানা একদিন কৃতিত্বের সাথে পার হলো।তারপর কলেজও পার হলো।ভালো ছাত্র হিসাবে কোচিং এর সাথে যুক্ত হয়ে পড়লো। সেখান থেকে তার হাত খরচের টাকা হাতে আসতে শুরু করলো সেই সাথে তার মেধা বিকশিত হতে লাগলো।
আমি তখন ঢাকায় একদিন খবর পেলাম ক্যানসার সারভাইবর মা তার সন্তানকে সাথে নিয়ে মিরপুরে বাসা নিয়ে উঠেছেন।একটু চিন্তায় পড়লাম।ঢাকা শহরের ব্যয় বহুল জীবন যাত্রায় কেমন করে মানিয়ে নিবেন।কৈশোর পার হওয়া সেই তরুন এবারও কোচিং এ জড়িয়ে পড়লো। এর মধ্যেই প্রায়ই বাসায় আসতো আমার ছেলের সাথে খেলা করতো।একদিন আমাকে বললো যে সে বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়েছে এবং ভাইবার জন্য প্রস্ত্ততি নিচ্ছে।তাকে সব সময়ই উপদেশ দিতাম তার সাথে গল্প করতাম।নিষ্পাপ নিরীহ ছেলেটিকে আমার খুব ভালো লাগতো।বিসিএস মৌখিক পরীক্ষার আগের দিন বিকালে বাসায় এলো জানালো কাল তার পরীক্ষা।জানতে চাইলাম তার প্রস্ত্ততি কেমন। সাহস নিয়ে বললো ভালো হবে। এর মধ্যে কোট, টাই জোগাড় করেছে সেগুলো পরেই পরীক্ষা দিতে যাবে।কথা বলতে বলতে হঠাৎ তাকে জিজ্ঞাসা করলাম-ভাইবার সময় কেউ যদি জানতে চান তোমার বাবা কি করেন তাহলে তুমি কি বলবে?এবার সে চুপ করে কিছুক্ষন ভাবলো তারপর বললো-আমিতো ভাবছি কিছু বলবো না।জানতে চাইলাম- কেন? সে কোন উত্তর দিল না। বললাম-বাবা নেই বা তাকে দেখনি এটা তো তোমার কোন অপরাধ নয়।আমি বললাম-যা সত্য যত টুকু সত্য তাই বলবে। ভবিষ্যতে তোমাকে তারা বাংলাদেশের প্রশাসনে বসাবে অবশ্যই জানতে চাইবে তোমার ব্যাক গ্রাউন্ড, তুমি কার সন্তান। যদি তোমার উত্তর তাদের ভালো লাগে তাহলে তারা এসব কথা জানতে চাইবে। সব শেষে তাকে দোয়া করলাম।সে বাসায় চলে গেল।
পরদনি পরীক্ষা দিয়ে সোজা বাসায় চলে এসেছে।অফিস থেকে ফিরে দেখি আমার ছেলে আর সে খেলায় মেতে উঠেছে।আমার কাছে এসে বসলো।অবাক করে দিয়ে বললো আপনি কাল যা বলেছিলেন ওরা আমাকে তাই জিজ্ঞাসা করেছেলো। বললাম-ঠিকঠাক মতো সব বলতে পেরেছোতো।হ্যাঁ-তার চোট্ট উত্তর।বললাম-প্রস্ত্তত হও।বিসিএস-এ তুমি উত্তীর্ণ হচ্ছো।আমার দিকে তাকিয়ে রইলো কথাটি অবিশ্বাস্য মনে করে।
২০০৫ সালের জানুয়ারী মাসে আমি একমাসের ট্রেনিং-এ ব্যংককে। আমার সেল ফোন বেজে উঠলো, ওপাশ থেকে ছেলের কন্ঠ। প্রথমেই একটু রহস্য করে বললো –আব্বু আন্কেল পুলিশ।মানে?এবার সে ফোন নিয়ে বললো-আমি পুলিশ ক্যাডারের জন্য সিলেক্ট হয়েছি। খুশীর খবর!তাকে বললাম।২০০৫ সালে সে সারদায় ট্রেনিং-এ যায় সেখান থেকেই শুরু হয় চাকরী জীবন। আমরা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে আসি, ক্যানসার সারভাইবর মা একদিন মারা যান।
বেশ কিছু দিন আগে ইউ টিউবে একটি খবর দেখছি।খবরটি শেষ হলে মনে হলো মানুষটিকে কেমন চেনা চেনা লাগলো। খবরটি আবার দেখলাম।আহা সেই মুখ সেই চেনা মুখ ২০ বছর আগে দেখা।আবার সব মনে পড়ছে।আমি সব মেলাচ্ছি।বাংলাদেশ পুলিশের একজন ডিআইজি কথা বলছেন।আমার মানষপটে ভেসে উঠলো শান্তের কথা। সে দিনের সেই ছোট্ট ছেলেটি শান্ত।
ইয়েলোনাইফ, কানাডা

