
অর্থের বিনিময়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছ থেকে যৌন সেবা গ্রহণের মতো গুরুতর অপরাধে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কারাদণ্ডের বিধান পুনর্বহাল করেছে কানাডার সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার প্রকাশিত ৭-২ সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত কুইবেক কোর্ট অব আপিলের ২০২৪ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় বাতিল করে জানিয়েছে, শিশুদের যৌন শোষণ প্রতিরোধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের বৈধ ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই রায়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন পণ্য হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এই অপরাধ দমনে আইনকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। আদালতের মতে, এ ধরনের অপরাধ কেবল একজন শিশুর ওপর নির্যাতন নয়, বরং পুরো সমাজের নৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর আঘাত।
এর আগে ২০২৪ সালে কুইবেক কোর্ট অব আপিল রায় দিয়েছিল যে, এই অপরাধে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম সাজা কানাডিয়ান চার্টার অব রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আদালত মন্তব্য করেছিল, নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনা না করে বাধ্যতামূলকভাবে কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান “নিষ্ঠুর ও অস্বাভাবিক শাস্তি” হিসেবে গণ্য হতে পারে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত হয়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা বলেন, শিশুদের যৌন শোষণ এমন একটি অপরাধ যার সামাজিক ক্ষতি সুদূরপ্রসারী। তাই অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় ন্যূনতম কারাদণ্ডের বিধান অসাংবিধানিক নয়। বরং এটি শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা।
সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে উল্লেখ করেছে, এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড। আদালতের ভাষায়, কানাডায় শিশুদের যৌন পণ্য হিসেবে ব্যবহার বা বিবেচনা করা একটি “গুরুতর সামাজিক ব্যাধি” এবং এটি প্রতিরোধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ স্বার্থ রয়েছে। বিচারপতিরা আরও বলেন, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা বিচারব্যবস্থার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই অপরাধের গুরুত্বকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই এবং ন্যূনতম সাজার বিধান অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
মামলাটির সূত্রপাত ২০১৮ সালের গ্রীষ্মে। সে সময় ৬১ বছর বয়সী মারিও ডেনিসকে ধরতে বিশেষ অভিযান চালায় পুলিশ। তদন্তের অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আন্ডারকভার কর্মকর্তারা একটি এসকর্ট সার্ভিসের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। তদন্তে অন্তত চারবার স্পষ্টভাবে জানানো হয় যে, কথিত এসকর্টের বয়স ১৬ বছর। এরপরও মারিও ডেনিস নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হন। তিনি হোটেল কক্ষে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। সেখানে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক যৌনকর্মীর উপস্থিতির ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে আদালতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ন্যূনতম সাজা পান।
কানাডার ফৌজদারি দণ্ডবিধি অনুযায়ী, অর্থের বিনিময়ে অপ্রাপ্তবয়স্কের কাছ থেকে যৌন সেবা গ্রহণের অপরাধে প্রথমবার দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বনিম্ন ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। একই ধরনের অপরাধ পুনরায় করলে ন্যূনতম এক বছরের কারাদণ্ড বাধ্যতামূলক। এছাড়া মামলার প্রকৃতি ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডও হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ভবিষ্যতে শিশু যৌন শোষণসংক্রান্ত মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ফলে নিম্ন আদালতগুলো বাধ্যতামূলক ন্যূনতম সাজার বিধান প্রয়োগে আরও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাবে। একই সঙ্গে এই রায় শিশু সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে কানাডার বিচারব্যবস্থার অবস্থানও আরও সুস্পষ্ট করেছে। আদালতের বার্তা হলো অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন শোষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে এবং এই ধরনের অপরাধকে কোনোভাবেই লঘু করে দেখার সুযোগ নেই।

