
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উপকূলে ভয়াবহ নৌকাডুবির ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কানাডার ফেডারেল কর্তৃপক্ষ। ভ্যানকুভারভিত্তিক একটি ফিশিং চার্টার প্রতিষ্ঠানের আরেকটি বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত বোট আটক করেছে ট্রান্সপোর্ট কানাডা। গত মাসে একই প্রতিষ্ঠানের একটি নৌযান ডুবে একজনের মৃত্যু এবং ছয়জন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার তদন্ত এখনও চলমান। নিখোঁজদের আর জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ট্রান্সপোর্ট কানাডার কর্মকর্তারা টপ ভ্যানকুভার ফিশিং চার্টারের পরিচালিত প্রায় ১১ মিটার দীর্ঘ একটি নৌযানের জানালায় আনুষ্ঠানিক আটকাদেশ টানিয়ে দেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বোটটির চলাচল ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ট্রান্সপোর্ট কানাডার জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, একাধিক গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি এবং সামুদ্রিক বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে নৌযানটি আটক করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, নৌযানটি মূলত একটি প্লেজার বোট হিসেবে নিবন্ধিত হলেও সেটিকে যাত্রী পরিবহনের জন্য বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। শুধু তাই নয়, এটি প্রয়োজনীয় নিয়ম অনুযায়ী সঠিকভাবে নিবন্ধিতও ছিল না। কর্তৃপক্ষের মতে, এ ধরনের অনিয়ম যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে এবং সামুদ্রিক আইন লঙ্ঘনের শামিল।
আদেশে নৌযানটির মালিক হিসেবে লিহে ইনক.-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ৯ মিটার দীর্ঘ টপ ওশান নামের আরেকটি বোট গত ২৮ জুন ভ্যানকুভারের কাছে জর্জিয়া প্রণালিতে ডুবে যায়। রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি) জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় নৌযানটিতে মোট ১০ জন আরোহী ছিলেন। তাদের মধ্যে নয়জনের গায়ে লাইফ জ্যাকেট ছিল। দুর্ঘটনার প্রায় আধা ঘণ্টা পর চারজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও তাদের একজন পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বাকি ছয়জন এখনও নিখোঁজ এবং দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কার্যত নেই বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
নৌকাডুবির পেছনে যান্ত্রিক ত্রুটি বা নৌযান পরিচালনায় কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে আরসিএমপি। তদন্তকারীরা বিশেষভাবে পরীক্ষা করছেন, নৌযানটির রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন মাত্র ২২ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন চেন মিং। তার মা অ্যাশলি লিন এবং বান্ধবী হেইলি লি জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার আগেই চেন নৌযানটির ভাঙা পাশের জানালা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাদের দাবি, দুর্ঘটনার দুই দিন আগে চেন জানিয়েছিলেন যে নৌযানের একটি দরজা হঠাৎ খুলে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। পরে সেই দরজা খুলে যাওয়ায় দ্রুত পানি ঢুকে নৌযানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডুবে যায় বলে তারা সন্দেহ করছেন। পরিবারের এই বক্তব্য তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদি এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তবে নৌযানটির নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠতে পারে।
ঘটনার পর থেকেই টপ ভ্যানকুভার ফিশিং চার্টারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। গত সপ্তাহজুড়ে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে নিজেকে “রকি” পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি ফোন রিসিভ করলেও তিনি বারবার মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে বৃহস্পতিবার আবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ফোনেরও আর কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনা ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় বাণিজ্যিক ফিশিং চার্টার পরিচালনায় নিরাপত্তা মান, নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং সরকারি তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটক ও যাত্রী বহনকারী নৌযানগুলোতে যথাযথ নিবন্ধন, নিয়মিত পরিদর্শন এবং নিরাপত্তা সরঞ্জামের মান নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যাবে। ট্রান্সপোর্ট কানাডা জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আটক করা নৌযানটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নৌকাডুবির ঘটনায় চলমান তদন্তের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

