
ফুটবল শুধু ট্রফি জয়ের গল্প নয়, এটি সংগ্রাম, ত্যাগ আর স্বপ্নপূরণেরও গল্প। মরক্কোর তারকা ফুটবলার আশরাফ হাকিমির জীবন যেন সেই বাস্তব উদাহরণ। যে ছেলেটির বাবা রাস্তায় ফেরি করে সংসার চালাতেন, মা কাজ করতেন অন্যের বাড়িতে—সেই হাকিমিই আজ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার।
স্পেনে জন্ম হলেও হাকিমির শিকড় মরক্কোতে। উন্নত জীবনের আশায় তার বাবা-মা বহু বছর আগে মরক্কো ছেড়ে স্পেনে পাড়ি জমান। কিন্তু নতুন দেশে তাদের জীবন ছিল কঠিন সংগ্রামের। পরিবারের খরচ চালাতে বাবা দিনভর রাস্তায় ফেরি করতেন, আর মা গৃহকর্মীর কাজ করতেন। অভাবের সংসার হলেও ছেলের ফুটবল স্বপ্নকে কখনো থামতে দেননি তারা।
শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে এক সাক্ষাৎকারে হাকিমি বলেছিলেন, প্রতিদিন মা-বাবার কঠোর পরিশ্রম তাকে ভীষণ নাড়া দিত। তখনই তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বড় ফুটবলার হয়ে একদিন মায়ের কষ্টের জীবন বদলে দেবেন।
সেই স্বপ্নের পথচলা শুরু হয় স্পেনের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের বিখ্যাত যুব একাডেমি লা ফাব্রিকা থেকে। অসাধারণ গতি, দক্ষতা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি জায়গা করে নেন রিয়ালের মূল দলে। পরে খেলেছেন বরুশিয়া ডর্টমুন্ড, ইন্টার মিলান এবং বর্তমানে ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনের (পিএসজি) হয়ে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
স্পেনে জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে তিনি বেছে নিয়েছেন বাবা-মায়ের মাতৃভূমি মরক্কোকে। তার বিশ্বাস ছিল, মরক্কোর জার্সি পরে মাঠে নামতে পারাই হবে বাবা-মায়ের ত্যাগের সবচেয়ে বড় সম্মান।
হাকিমির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি আসে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে। স্পেনের বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয়সূচক পেনাল্টি থেকে গোল করে মরক্কোকে ঐতিহাসিক জয় এনে দেন তিনি। কিন্তু গোলের পর সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপনের আগে ছুটে যান গ্যালারিতে বসে থাকা মায়ের কাছে।
সেখানে মায়ের কপালে ভালোবাসার চুমু এঁকে তাকে জড়িয়ে ধরেন হাকিমি। আবেগঘন সেই মুহূর্ত কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বিশ্ববাসী দেখেছিল, একজন সফল সন্তানের পেছনে একজন মায়ের ত্যাগ কতটা গভীর হতে পারে।
আজ আশরাফ হাকিমি শুধু মরক্কোর ফুটবলের গর্ব নন, তিনি সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও পারিবারিক ভালোবাসারও এক উজ্জ্বল প্রতীক। তার গল্প মনে করিয়ে দেয়—অভাব স্বপ্নকে থামাতে পারে না, যদি থাকে পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং বাবা-মায়ের অকৃত্রিম সমর্থন।

