
কানাডার অন্টারিও প্রদেশের ডারহাম রিজিয়নাল পুলিশ একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে, যাদের সদস্যরা পর্যটক পরিচয়ে কানাডায় প্রবেশ করে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত অপরাধ সংঘটিত করতেন। দীর্ঘ কয়েক বছরের তদন্ত শেষে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের বিরুদ্ধে ২০০টিরও বেশি অপরাধমূলক ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে, যার ফলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ কানাডিয়ান ডলারেরও বেশি।
সম্প্রতি ‘প্রজেক্ট জেটসেটার’ নামে পরিচালিত এই বিশেষ তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করে ডারহাম রিজিয়নাল পুলিশ। তদন্তকারীদের ভাষ্য, এটি ছিল বহু বছরের সমন্বিত অভিযান, যার লক্ষ্য ছিল কানাডায় প্রবেশ করে দ্রুত অপরাধ সংঘটন এবং পরে দেশ ত্যাগ করা আন্তর্জাতিক অপরাধীদের শনাক্ত করা।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত ৪৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মোট ১,৪৪২টি ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে, যা এই তদন্তের ব্যাপকতা ও অপরাধের বিস্তার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়। এছাড়া আরও ১৬৪টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। অভিযুক্তদের একটি বড় অংশ এখনও পলাতক এবং তাদের খুঁজে বের করতে পুলিশ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
ডারহাম রিজিয়নাল পুলিশের প্রধান পিটার মোরেইরা বলেন, তদন্তে এমন একটি অপরাধচক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা অত্যন্ত পরিকল্পিত ও ধারাবাহিকভাবে অপরাধ পরিচালনা করছিল। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের সদস্যরা মূলত : বৃহৎ পরিসরে খুচরা দোকানে চুরি, গাড়ি চুরি ও সংশ্লিষ্ট জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা ও ব্যাংক জালিয়াতি, মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে চুরি এবং চুরি করা গাড়ি ও পণ্য বিদেশে রপ্তানির সঙ্গে জড়িত ছিল। তদন্তকারীদের মতে, এসব অপরাধ ছিল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে পরিচালিত হতো।
ডিটেক্টিভ ব্র্যাড চ্যাপম্যান জানান, তদন্তে শনাক্ত হওয়া সন্দেহভাজনদের বেশিরভাগই রোমানিয়ার নাগরিক। এছাড়া একটি ছোট অংশ ভারতীয় নাগরিক বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। চ্যাপম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ব্যক্তিরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিয়মিত ভ্রমণ করতেন। তারা পর্যটক হিসেবে কানাডায় প্রবেশ করে অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক অপরাধ সংঘটিত করতেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের পরিচয় শনাক্ত করার আগেই দেশ ছেড়ে চলে যেতেন। তিনি বলেন, এই কৌশলের কারণেই তদন্তকারীদের জন্য তাদের শনাক্ত করা এবং আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত একাধিক তদন্তকে একত্রিত করেই ‘প্রজেক্ট জেটসেটার’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তদন্তে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়। সন্দেহভাজনদের চলাচল, আর্থিক লেনদেন, অপরাধ সংঘটনের ধরন এবং আন্তঃদেশীয় যোগাযোগের বিষয়গুলো দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
ডিটেক্টিভ ব্র্যাড চ্যাপম্যানের মতে, এই তদন্তের মাধ্যমে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা পুরো সমস্যার কেবল একটি অংশ। তার ভাষায়, “প্রজেক্ট জেটসেটারের ফলাফল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। অপরাধ পর্যটন দমনে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি, তবে এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে। এই ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
এই তদন্তের পর কানাডায় তথাকথিত ‘ক্রাইম ট্যুরিজম’ বা অপরাধ পর্যটন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রগুলো এখন বিভিন্ন দেশের ভিসা ও ভ্রমণ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা বাড়াচ্ছে।
ডারহাম রিজিয়নাল পুলিশের এই অভিযান দেখিয়েছে, সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে দীর্ঘমেয়াদি গোয়েন্দা নজরদারি, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। পলাতক সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার এবং এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত আরও ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

