
ছবি সংগৃহীত
১৯৭৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হলেও, টুর্নামেন্টটি আজও বিতর্ক, রাজনৈতিক প্রভাব এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আলোচিত। দেশটির প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা অর্জনের পেছনে থাকা ঘটনাগুলো নিয়ে প্রায় পাঁচ দশক পরও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
বিশ্বকাপ আয়োজনের সময় আর্জেন্টিনা ছিল সামরিক শাসক জর্জ রাফায়েল ভিদেলার নেতৃত্বাধীন জান্তা সরকারের অধীনে। ১৯৭৬ সালে ক্ষমতা দখলের পর সরকার রাজনৈতিক বিরোধী, ছাত্র, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়ন শুরু করে। ইতিহাসে যা ‘ডার্টি ওয়ার’ নামে পরিচিত। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই সময়ে হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ, আটক ও নির্যাতনের শিকার হন।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে বিশ্বকাপকে গুরুত্বপূর্ণ প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল সামরিক সরকার। টুর্নামেন্ট চলাকালে বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে একটি স্থিতিশীল ও উৎসবমুখর আর্জেন্টিনার চিত্র তুলে ধরা হয়, যদিও একই সময়ে দেশজুড়ে চলছিল মানবাধিকার সংকট।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল দ্বিতীয় রাউন্ডে পেরুর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৬-০ গোলের জয়। ফাইনালে উঠতে আর্জেন্টিনার বড় ব্যবধানে জয় প্রয়োজন ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ম্যাচটির ফলাফল বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সন্দেহের জন্ম দেয়।
বিতর্ক আরও বাড়ে যখন জানা যায়, ম্যাচের আগে পেরুর ড্রেসিংরুমে আর্জেন্টিনার সামরিক শাসক ভিদেলা ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমঝোতার অভিযোগও সামনে আসে। তবে এসব অভিযোগ নিয়ে বহু আলোচনা হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
পরবর্তীকালে আর্জেন্টিনার কয়েকজন সাবেক খেলোয়াড় স্বীকার করেন যে, তারা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছেন বলে মনে করেন। তবে তারা একই সঙ্গে দাবি করেন, মাঠে তারা শুধুমাত্র ফুটবল খেলেছিলেন এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতা সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না।
ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা তাদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নেয়। দেশজুড়ে উৎসব শুরু হলেও সামরিক সরকার এই সাফল্যকে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে।
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ একদিকে যেমন আর্জেন্টিনার ফুটবল গৌরবের সূচনা, অন্যদিকে তেমনি এটি ক্রীড়া ও রাজনীতির জটিল সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আজও সেই টুর্নামেন্টকে ঘিরে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এটি কি শুধুই একটি ফুটবল বিজয় ছিল, নাকি স্বৈরশাসনের কৌশলগত প্রচারণার অংশ?
যদিও পেরুর বিপক্ষে ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি, তবু ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত আসর হিসেবে বিবেচিত হয়।

