
আফ্রিকার গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে বিরল প্রজাতির ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশে ভ্রমণ না করার জন্য নিজেদের নাগরিকদের প্রতি কড়া সতর্কবার্তা জারি করেছে কানাডা সরকার। একই সঙ্গে আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরেও নতুন করে স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন শুরু করেছে দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই এই সংক্রমণকে “আন্তর্জাতিক উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা” হিসেবে ঘোষণা করেছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক বুধবার এক বিবৃতিতে জানান, ইবোলার বর্তমান প্রাদুর্ভাবের ব্যাপকতা এবং সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এই প্রাদুর্ভাবে ৫০০-রও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ১৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংক্রমণ প্রথমে কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে শনাক্ত হলেও পরে তা উত্তর কিভু এবং প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও ছড়িয়ে পড়ে।
কানাডার ফেডারেল সরকার জানিয়েছে, ইতুরি প্রদেশে নতুন সংক্রমণ ঘোষণার পর থেকেই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দেশটির সরকারি ভ্রমণ নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, “পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় নাগরিকদের আপাতত ওই অঞ্চলে ভ্রমণ এড়িয়ে চলা উচিত।”
এই প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে “বুন্দিবুগিও” নামের ইবোলার একটি বিরল প্রজাতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। ফলে আক্রান্তদের চিকিৎসা মূলত উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ এবং নিবিড় পরিচর্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
কানাডার পাবলিক হেলথ এজেন্সি জানিয়েছে, আপাতত দেশটির সীমান্তে ইবোলা সংক্রান্ত অতিরিক্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে দ্রুত নতুন স্বাস্থ্যবিধি চালু করা হবে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ফিফা বিশ্বকাপ সামনে রেখে আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, আগামী ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হতে আর এক মাসেরও কম সময় বাকি। কানাডা এই টুর্নামেন্টের অন্যতম সহ-আয়োজক দেশ হওয়ায় বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ দর্শনার্থী দেশটিতে প্রবেশ করবেন। এই অবস্থায় ইবোলার মতো প্রাণঘাতী ভাইরাস আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
প্রাথমিকভাবে কানাডার স্বাস্থ্য বিভাগ মনে করেছিল, ইবোলা সংক্রমণ দেশটিতে পৌঁছানোর ঝুঁকি খুবই কম। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর সেই মূল্যায়ন পুনর্বিবেচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন, ব্যাপক বিমানযাত্রা এবং সীমান্ত অতিক্রমকারী মানুষের সংখ্যা বাড়লে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা একযোগে কাজ করছেন। আক্রান্ত অঞ্চলে নজরদারি বৃদ্ধি, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সীমান্ত এলাকায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে বিশ্বকাপ আয়োজক দেশগুলোর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পর্যটন কেন্দ্র এবং স্টেডিয়াম এলাকায় স্বাস্থ্য নিরাপত্তা জোরদারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন না থাকলেও বৈশ্বিক সংযোগের যুগে যেকোনো সংক্রামক রোগ দ্রুত আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই আগাম সতর্কতা এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

