ছায়ানটের পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ: বর্ষবরণের আবহ কতটা পাল্টেছে?
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
রমনা বটমূলে ছায়ানটের গানের সাথে সাথে উৎসব শুরুর পর দিনভর হাজারও মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে বর্ষবরণ আয়োজন।
১৯৬১ সালের শীতকালে ঢাকার কাছে জয়দেবপুরে এক বনভোজনে জড়ো হয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের কিছু ব্যক্তি যারা সংস্কৃতির সাথে জড়িত ছিলেন। সে বনভোজনে সিদ্ধান্ত হয় যে তারা 'ছায়ানট' নামের এক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন।

কিন্তু সেসসময়টা অনুকূলে ছিলনা মোটেই। তখন পাকিস্তানী শাসকদের দোর্দন্ড প্রতাপ। তারা চাইছে বাঙ্গালী সংস্কৃতি নয়, ইসলাম ধর্মের ভিত্তিতে পরিচয় গড়ে উঠুক। এমন চিন্তাধারার বিপরীতে গড়ে ওঠে ছায়ানট।

ছায়ানটকে যতটা না সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করা হয়, তার চেয়ে বেশি মনে করা সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে। হারিয়ে যেতে বসা বাঙালী সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার লড়াই ছিল সেটি।

আন্দোলন থেকে উৎসব

১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে যখন ছায়নট প্রথমবারের মতো বর্ষবরণের অনুষ্ঠান করে তখন সেটি দেখেছেন ডা: সারোয়ার আলী। তিনি তখন ছায়ানটের সাথে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে জড়িত ছিলেন। মি: আলী তখন মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন।

প্রথম অনুষ্ঠানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানালেন, প্রথম অনুষ্ঠানে কোন মঞ্চ তৈরি করা হয়নি। ছায়ানটের শিল্পী এবং শিক্ষকরা সে অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেছিলেন।

মি: আলী জানালেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল শহরের সাধারণ মানুষের সাথে আবহমান বাঙালী সংস্কৃতির সংযোগ গড়ে তোলা। ছায়ানটের সে আয়োজন তখনকার সময় স্বাধীকারের আকাংখায় উন্মুখ বাঙালীদের জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে জোরদার করেছিল।

মি: আলী বলেন, " ১৯৬৭ সালে ছায়নট নগর-জীবনে যে আয়োজন করলো সেটা ছিল প্রতিবাদী রূপ। কিন্তু স্বাধীনতার পরে বাঙালী যখন তার স্বাধীন আবাসভূমি লাভ করলো তখন স্বাভাবিকভাবে এ আয়োজনটি আর প্রতিবাদী রুপে থাকলো না। এটি ধীরে ধীরে উৎসবে পরিণত হলো।"

স্বাধীন বাংলাদেশে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছিল ২০০১ সালে। তখন বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় অনেকে হতাহত হয়। কিন্তু তার পরেও সে অনুষ্ঠানের প্রতি মানুষের আগ্রহে কোন ভাটা পড়েনি।

ছায়ানটের বর্তমান প্রজন্মের একজন শিল্পী সামিয়া আহসান মনে করেন, নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ৫০ বছর টিকে থাকা অভাবনীয় বিষয়।

"শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড দিয়ে যে ৫০ বছর মানুষের হৃদয়ে বিচরন করা যায় এটা তো অদ্ভূত। এটা কোন বৈষয়িক বিষয় না। মানুষের মননের সাথে এটা জড়িত। সেজন্যই বিষয়টা আমাদের কাছে এতো গভীর," বলছিলেন সামিয়া আহসান।

সাংস্কৃতিক আন্দোলন: এখন

বিশ্লেষকরা মনে করেন, যে কোন সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরালো হয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

৫০ বছর আগে যে দর্শনের ভিত্তিতে ছায়ানটের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল সেটি এখনো প্রাসঙ্গিক আছে। কিন্তু প্রাসঙ্গিক হলেও বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আন্দোলন ধীরে ধীরে দূর্বল হচ্ছে।

সাংস্কৃতিক আন্দোলন দুর্বল হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক কারণ আছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের অধ্যাপক এম এম আকাশ।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে কমিউনিস্ট এবং বামপন্থীরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। সে সময় বামপন্থীদের সাথে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন একসাথে হওয়ার কারণে সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে।

কিন্তু স্বাধীনতার পরে বিষয়টি সেভাবে টিকে থাকেনি। ফলে যারা সাম্প্রদায়িক রাজণীতি করেছে তারা সে সুযোগটি নিয়ে নিজেদের সংগিঠত করেছে বলে মনে করেন অধ্যাপক আকাশ।

তিনি বলেন, " ঐসময় আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল ক্রম-অগ্রসরমান বিজয়ী ধারা।" অধ্যাপক আকাশ বলেন, ১৯৭৫ সালের পরে ইসলাম-পন্থীদের সুকৌশলী লড়াই এবং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় দক্ষিণপন্থীদের উত্থানের ঢেউ বাংলাদেশেও লেগেছে"।

বাংলাদেশের রাজনীতে দুটো বড় দলকে ইসলামপন্থীরা ব্যবহার করতে পেরেছে। অধ্যাপক আকাশের বর্ণনায়, একদল অর্থাৎ বিএনপি ইসলামপন্থীদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছে এবং অন্যদল অর্থাৎ আওয়ামী লীগ তাদের ছাড় দিয়েছে।

তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগ ইসলামপন্থীদের আদর্শ গ্রহণ না করলেও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তাদের ছাড় দিয়েছে। অন্যদল বিএনপি ক্ষমতায় যাবার জন্য ইসলামপন্থীদের আদর্শ গ্রহণ করেছে।

অধ্যাপক আকাশ বলেন, " সাংস্কৃতিক আন্দোলনে আগে বামপন্থীরা নেতৃত্ব দিতো। আমি বলছি যে, এ আন্দোলনকে এগিয়ে নেবার শক্তিটা বিভক্ত এবং আর্থিক ক্ষমতাশুন্য। অন্যদিকে এর বীপরীত শক্তিটা, যারা পরাজিত হয়েছিল,... সে ভাঙ্গা পিঁপড়ার কোমর জোড়া লেগেছে।"

২০০১ সালে বোমা হামলার পর গত ১৫ বছর ধরে ছায়ানটের অনুষ্ঠান নির্বিঘ্ন করতে কড়া সতর্কতা থাকে। গত ৫০ বছরের মতো ভবিষ্যতেও ছায়ানটের এ আয়োজন বর্ষবরণের প্রধান অনুষ্ঠান হয়ে থাকবে বলে আশা করেন আয়োজকরা।

১৪ এপ্রিল, ২০১৭ ০৫:৩৩:১২