পুরো ব্যয় বহন করেও গোর্ডি হাউ ব্রিজের মালিক কানাডা একা নয়

পুরো ব্যয় বহন করেও গোর্ডি হাউ ব্রিজের মালিক কানাডা একা নয় - the Bengali Times
২০১২ সালে স্বাক্ষরিত কানাডা মিশিগান ক্রসিং এগ্রিমেন্ট এর আওতায় কানাডা নতুন উইন্ডসর ডেট্রয়েট সংযোগ সেতুর অর্থায়ন নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব নেয়

উত্তর আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প গোর্ডি ইন্টারন্যাশনাল ব্রিজ আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। দীর্ঘ দুই দশকের পরিকল্পনা, গবেষণা, আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন পেরিয়ে নির্মাণাধীন এই সেতুর পুরো ব্যয় অগ্রিম পরিশোধ করেছে কানাডা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থায়ন কাঠামো ও মালিকানা ইস্যুতে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

২০১২ সালে স্বাক্ষরিত কানাডা-মিশিগান ক্রসিং এগ্রিমেন্ট-এর আওতায় কানাডা নতুন উইন্ডসর-ডেট্রয়েট সংযোগ সেতুর অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য ছিল বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পটিকে দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়া।

- Advertisement -

চুক্তি অনুযায়ী, সেতুর আমেরিকান অংশের নির্মাণ ব্যয়ও কানাডাই বহন করে। অর্থাৎ, সেতুর পুরো প্রকল্প ব্যয় যার মধ্যে নকশা, নির্মাণ, অর্থায়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত কানাডা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব মডেলে পরিচালনা করছে। বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৪০ কোটি মার্কিন ডলার। প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, যার পেছনে রয়েছে নির্মাণ বিলম্ব, বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট এবং ব্যয় বৃদ্ধির চাপ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, সেতুর কানাডিয়ান ও যুক্তরাষ্ট্র অংশের মালিকানা কানাডার হাতে এবং এটি নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত সেতু উন্মুক্ত করার অনুমতি দেওয়া হবে না।” পাশাপাশি প্রকল্পের অন্তত অর্ধেক মালিকানা যুক্তরাষ্ট্রের হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ২০১২ সালের চুক্তি অনুযায়ী, সেতুর মালিকানা যৌথভাবে কানাডা ও মিশিগান রাজ্যের। সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় আয়রন ও ইস্পাত দুই দেশ থেকেই সংগ্রহের বিষয়টিও চুক্তিতে উল্লেখ আছে।

উইন্ডসর-ডেট্রয়েট করিডোর উত্তর আমেরিকার অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যপথ। শূন্য দশকের গোড়ায় কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন সংস্থাগুলো আন্তঃসীমান্ত যান চলাচল নিয়ে একটি যৌথ গবেষণা পরিচালনা করে। এতে দেখা যায়, বিদ্যমান অবকাঠামো ভবিষ্যতের বাণিজ্য ও পরিবহন চাহিদা পূরণে অপ্রতুল।

২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় নতুন অবকাঠামো নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। এরপর ২০০৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পরিবেশগত মূল্যায়ন চলে। ২০০৯ সালে দুই দেশ থেকেই প্রকল্পটি পরিবেশগত অনুমোদন লাভ করে। তবুও অর্থায়ন জটিলতায় প্রকল্পটি দীর্ঘদিন আটকে ছিল। মিশিগানের আইনপ্রণেতারা সরকারি অর্থ বিনিয়োগে অনীহা প্রকাশ করেন। এতে করে কানাডা সরাসরি মিশিগান রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসে এবং অবশেষে ২০১২ সালের জুনে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

২০১২ সালে কানাডার ফেডারেল সরকার উইন্ডসর-ডেট্রয়েট ব্রিজ অথরিটি গঠন করে। এই কর্তৃপক্ষের ওপর সেতু নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়। ২০১৮ সালে একটি বেসরকারি কনসোর্টিয়ামকে নির্মাণকাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং একই বছরের শেষ দিকে কাজ শুরু হয়। নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও প্রকল্পের কাজ বর্তমানে শেষ পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে।

উইন্ডসর-ডেট্রয়েট সীমান্তপথ উত্তর আমেরিকার মোট বাণিজ্যের বড় অংশ বহন করে। বিশেষ করে অটোমোবাইল শিল্পের জন্য এই করিডোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সেতুটি চালু হলে পণ্য পরিবহন আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, কানাডার পুরো ব্যয় অগ্রিম বহন করার সিদ্ধান্তটি ছিল কৌশলগত যাতে দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায় এবং ভবিষ্যৎ টোল আদায়ের মাধ্যমে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়।

সেতুটি উদ্বোধনের আগে মালিকানা ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে। তবে চুক্তিভিত্তিক কাঠামো ও দ্বিপক্ষীয় অনুমোদন বিবেচনায় প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। গোর্ডি ইন্টারন্যাশনাল ব্রিজ কেবল একটি অবকাঠামো নয় এটি দুই প্রতিবেশী দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক। এখন দেখার বিষয়, চলমান বিতর্ক সেতুর উদ্বোধন ও পরিচালনায় কতটা প্রভাব ফেলে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles