
কানাডার আবাসন ও ভাড়াবাজারে চলমান মন্দা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে অভিবাসী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। বিশেষ করে গ্রেটার টরন্টো এলাকায় বহু বাংলাদেশি গৃহমালিক এখন বাড়তি সুদের চাপ, কমে যাওয়া ভাড়া এবং খালি ইউনিট বৃদ্ধির কারণে মর্টগেজ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে আরও অনেক সম্পত্তি ফোরক্লোজার বা ‘পাওয়ার অব সেল’ প্রক্রিয়ায় যেতে পারে।
কানাডা মর্টগেজ অ্যান্ড হাউজিং করপোরেশন–এর সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে ভাড়াবাড়ির খালি থাকার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.১ শতাংশে। ২০২৪ সালে যা ছিল ২.২ শতাংশ। গত এক দশকের গড়ের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, খালি ইউনিট বাড়ার অর্থ হলো ভাড়াটিয়াদের জন্য বিকল্প বাড়ছে, ফলে বাড়ির মালিকদের ভাড়া কমিয়ে প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগভিত্তিক সম্পত্তির আয়ে।
স্ট্যাটিসটিকস কানাডার ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪০টি বড় শহরের মধ্যে ২৪টিতেই দুই বেডরুমের বাসার গড় ভাড়া কমেছে। টরন্টোতে গড় ভাড়া প্রায় ৩.৯ শতাংশ কমে ২০২৩ সালের সর্বোচ্চ ২,৯২০ ডলার থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ২,৭২০ ডলারে।
মহামারির সময় স্বল্প সুদের সুযোগে বহু অভিবাসী যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি বিনিয়োগকারী একাধিক বাড়ি বা কন্ডো কিনেছিলেন। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল ভাড়ার আয়ে মর্টগেজ পরিশোধ করে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ গড়ে তোলা। কিন্তু ২০২২ সালের পর ব্যাঙ্ক অফ কানাডা ধারাবাহিকভাবে সুদের হার বাড়াতে শুরু করলে সেই হিসাব পাল্টে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মাসিক মর্টগেজ কিস্তি এক হাজার ডলার পর্যন্ত বেড়ে গেছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, কানাডায় প্রায় ৭৫ শতাংশ মর্টগেজ ২০২৬ সালের মধ্যে নবায়নের আওতায় আসবে। নতুন সুদের হারে নবায়ন হলে মাসিক কিস্তি আরও বাড়তে পারে, যা উচ্চ ঋণনির্ভর গৃহমালিকদের জন্য বড় ঝুঁকি।
গ্রেটার টরন্টো এরিয়াতে ২০২৫ সালে নতুন বাড়ি বিক্রি ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। একক পরিবারের বাড়ি বিক্রি কমেছে ৬৭ শতাংশ এবং কন্ডো বিক্রি কমেছে ৯২ শতাংশ পর্যন্ত যা বাজারের গভীর স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক মালিক সম্পত্তি বাজারে না তুলে ভাড়ায় দিচ্ছেন। ফলে ভাড়াবাজারে সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে গেছে। এর ফলেই ভাড়া কমছে এবং বিনিয়োগভিত্তিক সম্পত্তির নগদ প্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো) সংকুচিত হচ্ছে।
গ্রেটার টরন্টো এলাকায় বহু বাংলাদেশি পরিবার ভাড়ার আয়ের ওপর নির্ভর করে মর্টগেজ পরিশোধ করতেন। এখন অনেক ক্ষেত্রে ভাড়া কমাতে হচ্ছে ২০০ থেকে ৫০০ ডলার পর্যন্ত। একই সময়ে প্রপার্টি ট্যাক্স, কন্ডো ফি এবং ঋণের সুদ বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে কিছু মালিক বাধ্য হয়ে সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা করছেন। আবার অনেকে মর্টগেজ বকেয়া পড়ায় ফোরক্লোজার বা ‘পাওয়ার অব সেল’ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন। কমিউনিটি নেতারা বলছেন, এটি কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়; অনেক পরিবারের জীবনভর সঞ্চয়ের নিরাপত্তা বর্তমানে প্রশ্নের মুখে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, কানাডার আবাসন বাজার বর্তমানে একটি “সমন্বয় পর্যায়ে” রয়েছে। উচ্চ সুদের হার, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বাড়তি সরবরাহ সবকিছু মিলিয়ে বাজারকে ঠান্ডা করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুদের হার দ্রুত না কমলে এবং ভাড়াবাজারে পুনরুদ্ধার না এলে বিনিয়োগভিত্তিক গৃহমালিক বিশেষ করে নতুন অভিবাসী কমিউনিটিগুলো আগামী এক থেকে দুই বছরে আরও বড় আর্থিক চাপে পড়তে পারেন।
প্রবাসে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কেনা বাড়িই এখন অনেকের জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারের এই পরিবর্তন শুধু সংখ্যার হিসাব নয় এটি হাজারো পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।

