
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও জুলাই যোদ্ধা তাহরিমা জান্নাত সুরভী বলেছেন, আমি আওয়ামী লীগ, এনসিপি, বিএনপি, জামায়াত কিংবা গণঅধিকার পরিষদ-কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নই। আমি একজন অরাজনৈতিক মানুষ। কিন্তু দেশের স্বার্থে সব সময় প্রতিবাদ করেছি। এরপরও আমাকে ১১ দিন জেলে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে বুধবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ, মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামসহ অন্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
সুরভী আরও বলেন, আমি (ওইদিন) হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে বাসায় আসি। শরীর অনেক দুর্বল ছিল। ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম। রাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙে-দেখি আম্মু কান্নাকাটি করছেন, রুমভর্তি পুলিশ আর আর্মি। আমি ওনাদের জিজ্ঞেস করলাম আপনারা কেন এসেছেন? ওনারা বললেন, সার্চ ওয়ারেন্ট (তল্লাশি পরোয়ানা) আছে। আমি বললাম, সার্চ করেন। ওনারা লবণের প্যাকেট খুলে, বিছানার চাদর উঠিয়ে ৫০ কোটি টাকা খোঁজেন।
সুরভী জানান, প্রথমে তাকে গাজীপুর জেলা মহিলা কারাগারে নেওয়া হয়। রোববার ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে তার জামিন মঞ্জুর হওয়ার কথা থাকলেও সেখান থেকে তাকে রিমান্ডে পাঠানো হয়। রিমান্ড শেষে আবার আদালতে হাজির করা হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ফারুক পুনরায় রিমান্ড আবেদন করেন।
সুরভী বলেন, আমার আইনজীবীরা আদালতে আমার পক্ষে সব প্রমাণ উপস্থাপন করেন। ম্যাজিস্ট্রেট যখন তদন্ত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করেন, জবানবন্দি ছাড়া আর কোনো প্রমাণ আছে কি না, তিনি স্বীকার করেন যে কোনো প্রমাণ নেই। তারপরও আমার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
তিনি বলেন, আমার বয়স মাত্র ১৭ বছর। এছাড়া সামনে পরীক্ষা ছিল। এসব বিষয় আদালতে জানানো সত্ত্বেও আমাকে রিমান্ডে পাঠানো হয়। শেষ পর্যন্ত জামিন মঞ্জুর হলেও ১১ দিন পর আমাকে লাশের মতো করে জেল থেকে বের হতে হয়েছে। আমার কাছে জেল মানেই ছিল টর্চার (নির্যাতন)।
সুরভী বলেন, একদিন অনেক কষ্ট করে টাকা দিয়ে এক স্যারের মাধ্যমে আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পেরেছিলাম। সেদিন আমি মাকে বলেছিলাম-আম্মু, হয়তো আমি দুনিয়াতে আর থাকব না।
তিনি অভিযোগ করেন, যে মামলায় আমাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে, সেখানে প্রতারণা, চাঁদাবাজি, মারধর, চুরিসহ ছয়টি ধারা দেওয়া হয়েছে-যেগুলোর কোনোটিই আমি করিনি। বারবার রিমান্ড চাওয়ার একটাই কারণ-আমি টাকা দিইনি।
সুরভী বলেন, আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই স্বীকার করেছেন যে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই। তবুও রিমান্ড দেওয়া হয়েছে এই বলে যে, ওপর লেভেল থেকে অর্ডার আছে। এই ওপর লেভেলটা কে? তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়াই কীভাবে মামলা হয়? ১৭ বছরের মেয়েকে কীভাবে রিমান্ড দেওয়া হয়?
তিনি আরও জানান, কারাগারে তার সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তানজিলা তাবাসসুম নামের আরেকজন শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি বলেন, তাকে এমনভাবে আটকে রাখা হয়েছে যে তার পরিবার কিংবা তার বিশ্ববিদ্যালয় কেউ জানে না সে কোথায়। সেও আমাদের মতো প্রতিবাদী ছিল। আমাদের কণ্ঠ এভাবে রোধ করা হচ্ছে কেন?
সংবাদ সম্মেলনে ‘জুলাই যোদ্ধা’ মাহদী হাসান বলেন, সুরভীকে মুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু যারা এই ১৭ বছরকে ২১ বছর বানিয়েছিল, যারা ৫০ হাজারকে ৫০ কোটি টাকা বানিয়েছিল, এই কুশীলবদের পরিচয় জাতির কাছে উন্মোচন করতে হবে।
হবিগঞ্জে ‘বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম’ বলে আলোচনায় আসেন মাহদী হাসান। ৩ জানুয়ারি তাকে আটক করা হয়েছিল। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক এবং হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র। তার বাড়ি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ভাদৈ এলাকায়। ৪ জানুয়ারি তিনি জামিন পান।
মাহদী নিজের আলোচিত বক্তব্য প্রসঙ্গে বলেন, ৫ আগস্ট সারা দেশে যে বিধ্বস্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। জুলাইয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যারা নিহত বা শহীদ হয়েছিলেন, সেই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে মানুষ ১৭ বছরের নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে। সেই ক্ষোভই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি থানা ও জেলায় আমরা তার স্ফুলিঙ্গ ও বিস্ফোরণ দেখতে পাই। তিনি আরও বলেন, ওই জায়গা থেকে আমি একটা কথা বারবার বলেছি, একবারও আমি বলিনি যে আমি করেছি। আমি ‘আমরা’ দ্বারা সব আন্দোলনকারী সত্তাকে বুঝিয়েছিলাম।

