
শারীরিক জটিলতা এবং নির্ধারিত সময়ে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া নিয়ে সমস্যা হওয়ায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়া নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য গতকাল শুক্রবারের মধ্যেই লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা ছিল তাঁর। এর মধ্যে ৮০ বছর বয়সী বিএনপি নেত্রীর শারীরিক অবস্থা এবং এয়ার অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়। এসবের জেরে যাত্রার দিনক্ষণ পিছিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি উড়োজাহাজেও এসেছে বদল। তারপরও সার্বিকভাবে লন্ডনযাত্রা নিয়ে জটিলতা এখনো রয়েই গেছে বলে জানা গেছে।
কাতারের আমিরের পাঠানো বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে লন্ডনে যাওয়ার কথা ছিল খালেদা জিয়ার। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে কারিগরি ত্রুটির কারণে ওই এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ঢাকায় আসতে দেরি হবে বলে জানানো হয়। খালেদার শারীরিক অবস্থাও ভ্রমণের উপযুক্ত ছিল না। দুই কারণে যাত্রার তারিখ বদলের ঘোষণার পর জানা গেছে, কাতারের রাজপরিবারের ওই বাহনে লন্ডন যাচ্ছেন না বিএনপি চেয়ারপারসন। বরং অঙ্গীকার রক্ষা করতে এ জন্য জার্মানির একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করেছে কাতার সরকার। পশ্চিম এশিয়ার দেশ জর্জিয়া থেকে ওই এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ঢাকায় আসবে বলে জানা গেছে।
ঢাকায় কাতার দূতাবাসের জনসংযোগ কর্মকর্তা আসাদুর রহমান আসাদ জানান, কাতার সরকার এই এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে দিচ্ছে। আজ শনিবার বিকেলে সেটি ঢাকায় পৌঁছাতে পারে বলে দূতাবাস থেকে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি আরও বিলম্ব হতে পারে বলে জানা গেছে।
গত ২৩ নভেম্বর থেকে রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি আছেন খালেদা জিয়া। লিভার, কিডনি ও ফুসফুসের গুরুতর জটিলতায় ভুগছেন তিনি। গত ২৭ নভেম্বর থেকে রয়েছেন ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে। দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে তাঁর চিকিৎসা চলছে। যুক্তরাজ্য ও চীন থেকে আসা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলও যুক্ত হয়েছে চিকিৎসা তৎপরতায়।
দেশনেত্রীর লন্ডনযাত্রার দিনক্ষণ বাতিলের কারণ জানাতে গিয়ে এয়ারক্রাফটের ‘যান্ত্রিক ত্রুটি’র কথা তুলে ধরেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থার অবনতির কথাও বলেছেন তিনি। গতকাল শুক্রবার গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘এয়ারক্র্যাফটের সমস্যা আছে, একই সঙ্গে বৃহস্পতিবার রাত থেকে ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) শারীরিক অবস্থাও ভালো না। এই অবস্থায় যাত্রার তারিখ বদল করা হয়েছে। এখন মেডিকেল বোর্ড বললে, ফ্লাই করার মতো থাকলে রোববার তাঁকে (খালেদা জিয়া) লন্ডনে নেওয়া হবে।’
এদিকে সব জটিলতা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়া লন্ডন যেতে পারবেন কি না বা কবে যেতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বলে জানা গেছে। সূত্র বলছে, লন্ডন যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমত গুরুত্ব পাচ্ছে বিএনপির চেয়ারপারসনের স্বাস্থ্যের বিষয়টি। উড্ডয়ন করার মতো সক্ষম থাকতে হবে তাঁকে। কম-বেশি দীর্ঘ ১৩ ঘণ্টা ভ্রমণের মাধ্যমে তাঁকে সুস্থ অবস্থায় লন্ডনে নেওয়া সম্ভব হবে কি না–বিষয়টি মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। সবকিছু বিচার-বিবেচনা করেই শুধু মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত দেবে। অন্যদিকে জার্মানির যে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি ভাড়া করা হয়েছে, সেটির ধারণক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। চ্যালেঞ্জার-৬০ নামের ওই এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর সঙ্গে মাত্র চারজন ভ্রমণ করতে পারবেন। আগের পরিকল্পনায় চিকিৎসক ও ব্যক্তিগত সেবাদাতাসহ প্রায় ১৫ জনের যাওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল। এটি একটি বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে।
গতকাল রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সংলগ্ন মসজিদের সামনে সাংবাদিকদের কাছে বিএনপির মহাসচিব বলেন, চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করলেই চেয়ারপারসনকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হবে। খালেদা জিয়াকে সুস্থ করে তুলতে চিকিৎসকেরা ‘প্রাণপণ চেষ্টা করছেন’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁরা আশা করছেন রোববার তাঁকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের চিকিৎসকেরাই খালেদা জিয়ার চিকিৎসা করছেন উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, তারপরও এই চিকিৎসা আরও উন্নত হাসপাতালে করা প্রয়োজন বলে সবাই মনে করছেন।
এদিকে বিএনপির একটি সূত্র বলছে, খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য চীনে নেওয়ার একটি প্রস্তাব সে দেশ থেকে এসেছিল। তাঁকে বিদেশে নেওয়ার জন্য চীন এয়ার অ্যাম্বুলেস পাঠাতেও আগ্রহী ছিল। কিন্তু খালেদার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমিরের এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের পক্ষেই মত দেন। তাঁর যুক্তি ছিল ওই এয়ার অ্যাম্বুলেন্স জ্বালানি নিতে থামা ছাড়াই ঢাকা থেকে সরাসরি লন্ডনে পৌঁছাতে পারে।

