
১৯৯০ সালে দেয়া আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আট দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোট, এবং বামপন্থী পাঁচ দলীয় জোট মিলে তিন জোট ও জামাতে ইসলামীর দেয়া নিম্নলিখিত রুপরেখার কোনটা কোনটা বাস্তবায়ন হয়েছিল?
১। হত্যা, ক্যু, চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের ধারায় প্রতিষ্ঠিত স্বৈরাচারী এরশাদ ও তার সরকারের শাসনের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় দেশে পূর্ণ গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাঃ
ক. সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রেখে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী (৫১ অনুচ্ছেদ (ক) ৩ ধারা, ৫৫ অনুচ্ছেদ (ক) ১ ধারা ও ৫১ অনুচ্ছেদ ৩ নং ধারা অনুসারে) এরশাদ ও তার সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী আন্দোলনরত তিন জোটের নিকট গ্রহণযোগ্য একজন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে উপরাষ্ট্রপতির নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
খ. এই পদ্ধতিতে উক্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, যার মূল দায়িত্ব হবে তিন মাসের মধ্যে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সার্বভৌম জাতীয় সংসদ গঠনের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা।
২। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ হবেন, অর্থাৎ তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী বা দলের সাথে সম্পৃক্ত হবেন না এবং রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি বা সংসদ সদস্য পদের জন্য নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো মন্ত্রী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না।
৩। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুধুমাত্র প্রশাসনের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম ও দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করবে।
৪। ভোটারগণ যাতে নিজেদের ইচ্ছা ও বিবেক অনুযায়ী প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে, সেই আস্থা পুনঃস্থাপন ও নিশ্চয়তা দেবে।
৫। গণমাধ্যমকে সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষ রাখতে রেডিও-টেলিভিশনসহ সকল রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমকে স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় পরিণত করবে এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সকল রাজনৈতিক দলের প্রচার-প্রচারণার অবাধ সুযোগ নিশ্চিত করবে।
৬। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সার্বভৌম সংসদের নিকট অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবে এবং এই সংসদ সরকারের প্রতি জবাবদিহি থাকবে।
৭। জনগণের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে সাংবিধানিক শাসনের ধারা নিরঙ্কুশ ও অব্যাহত রাখা হবে এবং অসাংবিধানিক কোনো পন্থায় ক্ষমতা দখলের প্রতিরোধ করা হবে। নির্বাচন ব্যতীত সংবিধানবহির্ভূত কোনো পন্থায় কোনো নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে না।
৮। জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে। মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী সকল আইন বাতিল করা হবে।
৯। জোটভুক্ত দলসমূহ ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা ও অপর দলের দেশপ্রেম ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে কটাক্ষ করা থেকে বিরত থাকবে, সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেবে না এবং সাম্প্রদায়িক প্রচারণা সমবেতভাবে প্রতিরোধ করবে।
ব্যক্তির পরিবর্তে ব্যক্তির ক্ষমতা দখল ছাড়া আর কোন পরিবর্তন বিগত ৩৫ বছরে দেশে ঘটেছে? উত্তর যদি না হয়, তাহলে বর্তমান নামকাওয়াস্তে সরকার পরিবর্তন হলে যারা চতুর্থ বারের মত ক্ষমতার মসনদে আসীন হবেন তারা যে জুলাই সনদ বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সামান্যতম পরিবর্তন করবেন তার গ্যারান্টি কী? যে পরিবর্তন নিজেদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার পথে বাঁধা হবে, যে পরিবর্তন নিজেদের এবং দলের পালিত লোকদের অবৈধ অর্থ বিত্তের মালিক হতে বাঁধা দিবে, যে পরিবর্তন দুর্নীতি করলে সরকারের লোকদের হাতেও হাতকড়া পরাতে এক মিনিট দেরী করবে না, সেই পরিবর্তনের সনদ বাস্তবায়ন করা মানে তো নিজের গলায় নিজে ফাঁস লাগানো! এই কাজ কি জেনে শুনে কেউ করবে?
স্কারবোরো, কানাডা

