
হঠাৎ গুলির শব্দে ভেঙে গেল বিকেলের নিস্তব্ধতা। মুহূর্তেই আতঙ্কে ভারী হয়ে উঠলো থানা ভবনের বাতাস। জানালা দিয়ে নিচে তাকাতেই দেখি মানুষজনের চিৎকার। দিগবিদিক ছোটাছুটি। অনিরাপদ ভেবে নিজেও নিচে নেমে আসি। ঠিক তখনই একটি ভ্যানে দেখি লাশের স্তূপ। এমন সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘রাশেদ আপনার হাত খালি আছে, লাশগুলো ঢেকে দেন!’
হৃদয়বিদারক এমনই দৃশ্যের বর্ণনা উঠে এলো এবার কনস্টেবল রাশেদুল ইসলামের মুখে।
জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর আশুলিয়ায় ছয় লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১২তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন রাশেদ। এ মামলায় স্থানীয় সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে আটজনই রয়েছেন পলাতক।
এদিন বেলা ১১টা ১০ মিনিটে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বসেন। পরে সাক্ষীর ডায়াসে ওঠেন কনস্টেবল রাশেদুল। প্রথমে দেন পরিচয়।
সাক্ষ্যে রাশেদুল ইসলাম বলেন, গত বছর ৫ আগস্ট আশুলিয়া থানায় চালক (কনস্টেবল) হিসেবে কর্মরত ছিলাম। ওই দিন আমার কোনো ডিউটি ছিল না। থানা ভবনের চতুর্থ তলায় অবস্থান করছিলাম। বিকেল ৪টা কি সাড়ে ৪টায় হঠাৎ গুলির শব্দ শুনতে পাই। ওই সময় থানা ভবনের জানালা দিয়ে দেখি নিচে লোকজন হৈ চৈ করছে। সেখানে থাকা নিরাপদ না মনে করে নিচে নেমে আসি।
রাশেদুল বলেন, নিচে নামার পর থানার মূল ফটকের বাঁ-দিকে রাস্তার ওপর একটি ভ্যানে লাশের স্তূপ দেখতে পাই। আশুলিয়া থানার সাবেক ওসি সায়েদ স্যার বলেন, রাশেদ আপনার হাত খালি আছে, লাশগুলো ঢেকে দেন! তখন পাশে থাকা নীল রঙের ব্যানার দিয়ে লাশগুলো আমি ঢেকে দিই। ওই সময় ওসি সায়েদ স্যারের সঙ্গে ওসি (তদন্ত) মাসুদুর রহমান, ওসি (অপারেশন) নির্মল কুমার দাস, এএসআই বিশ্বজিৎ, কনস্টেবল মুকুল চোকদার, ডিবি ইন্সপেক্টর আরাফাত ছিলেন।
এই সাক্ষী আরো বলেন, লাশগুলো ঢাকার পর থানার পশ্চিম পাশে আট তলা একটি ভবনের নিচে এক ঘণ্টা ধরে অবস্থান করি। ওই ভবনের নিচতলার একটি ছেলেকে (যার বাড়ি জামালপুর) একটি পাঞ্জাবি ও টুপি দিতে আমি অনুরোধ করি। পরে পাঞ্জাবি ও টুপি পরে কাইচা বাড়ি রোড হয়ে জামগড়া রূপায়ণে বন্ধুর বাসায় গিয়ে উঠি। এরপর শুনতে পাই আশুলিয়া থানার ভ্যানভর্তি লাশগুলো পুলিশের গাড়িতে তুলে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যারা এ কাজ করেছে তারা অমানবিক কাজ করেছে।
সাক্ষ্য প্রদান শেষে তাকে জেরা করেন পলাতক আট আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী ও গ্রেফতার আসামিদের আইনজীবীরা। গতকাল মঙ্গলবার প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকট ফারুক আহাম্মদ ও সাইমুম রেজা তালুকদার। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ, সুলতান মাহমুদসহ অন্যরা।
রাশেদুলসহ এ মামলায় এ পর্যন্ত ১২ জনের সাক্ষ্য রেকর্ড করা হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য রয়েছে আজ (বুধবার)।
এ মামলায় গ্রেফতার আটজনকে গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বিচারের কাঠগড়ায় ওঠা আসামিরা হলেন- ঢাকা জেলার তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, ঢাকা জেলা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, ইন্সপেক্টর আরাফাত হোসেন, এসআই মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, আবজাল ও কনস্টেবল মুকুল চোকদার। তবে সাবেক এমপি সাইফুলসহ আটজন এখনো পলাতক।

