একজন মামুনুর রহমান ও তাঁর স্বপ্নসঙ্গিনী আনমনা ন্যাশ

একজন মামুনুর রহমান ও তাঁর স্বপ্নসঙ্গিনী আনমনা ন্যাশ - the Bengali Times
মেধাবী গুণী ও সৃজনশীলএই তিনটি শব্দেও সম্ভবত পুরোপুরি প্রকাশ করা যাবে না মামুনুর রহমান নামের মানুষটিকে

মেধাবী, গুণী ও সৃজনশীল—এই তিনটি শব্দেও সম্ভবত পুরোপুরি প্রকাশ করা যাবে না মামুনুর রহমান নামের মানুষটিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন, তাঁর উপস্থিতি ছিলো ঠিক যেন দীপ্তিমান এক চরিত্র। সহপাঠীরা ভালোবেসে ডাকত ‘ডি-ইউ’র যীশু’। হালকা লম্বাটে চেহারা, শান্ত মুখাবয়ব আর একটি স্বতন্ত্র আত্মপ্রকাশ তাঁকে করে তুলেছিলো ব্যতিক্রম।

বর্তমানে তিনি কানাডার টরন্টোতে বসবাস করছেন, পাশে আছেন তাঁর সহধর্মিণী ও একমাত্র কন্যা—আনমনা ন্যাশ। অথচ কর্মস্থল তাঁর হাজার মাইল দূরে—সিটি অফ ক্যালগারিতে, একজন এআই সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ হিসেবে।

- Advertisement -

তবে কাজের পরিচয়ই মামুনকে চেনার পুরো উপায় নয়। বাঁশির সুরে তিনি যেমন মুগ্ধ করতে পারেন, তেমনি ড্রইং, পেইন্টিং, বই পড়া—সবকিছুতেই তাঁর একটি গভীর মনোযোগ। যেন একাধারে বিজ্ঞানমনস্ক এবং সৃষ্টিশীল দুই জগতেই স্বচ্ছন্দে বিচরণ করছেন। কেউ কেউ হিমু সিনড্রোমের ছায়া দেখলেও, আমি বলবো—মামুন একজন জন্মগত গিফটেড।

আমার পরিচয় তাঁর সঙ্গে এক ঘরোয়া জন্মদিন অনুষ্ঠানে—আমার বড় নাতনির জন্মদিনে। আমার স্ত্রী যখন প্রশংসায় মুখর হয়ে মামুনকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, তখনই বুঝে গিয়েছিলাম, এই মানুষটিকে ভাল না লেগে উপায় নেই।

কথোপকথনের এক পর্যায়ে মামুন তাঁর মোবাইল ফোনে দেখালেন তিনি ও তাঁর কন্যা আনমনা ন্যাশ মিলে তৈরি করেছেন কিছু অনবদ্য ভাষ্কর্য—গাছের বাকল, কপার, লোহার পাত, নানা ধাতব উপাদানের সমন্বয়ে নির্মিত ‘আর্ট পিস’। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম সেইসব শিল্পকর্মের ছবি—তৈরি হয়েছে কেবল বাপ-বেটির টিমওয়ার্কে।

তখনই মনে পড়ে গেলো বরেণ্য ভাষ্কর প্রিয়ভাষিনী কিংবা জাতীয় জাদুঘরে হাশেম খানের ‘জোড়াতালির গল্প’ প্রদর্শনীর কথা। কিন্তু মামুন-আনমনার কাজ আলাদা—এখানে বিজ্ঞান আর কল্পনার, পিতা আর কন্যার, ভালোবাসা আর সৃজনশীলতার এক অসাধারণ সংমিশ্রণ।

সপ্তাখানেক পর, মামুন আমন্ত্রণ করলেন ডিনারে—টরন্টোর সুপরিচিত রেস্টুরেন্ট ‘লবঙ্গ’-এ। সঙ্গে আমার কন্যা অগ্নিলা, তাঁর স্বামী নাবিল ও তাঁদের দুই কন্যা। ডিনার আমন্ত্রণে যে কেউ খুশি হয়, কিন্তু যেটা ঘটলো তা আমার জীবনের স্মরণীয় এক মুহূর্ত হয়ে রইলো।

রেস্টুরেন্টের বড় টেবিলে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা একটি ভাষ্কর্য—নাম ‘Reflection of Life’। এটি মামুন ও আনমনা ন্যাশ আমাদের জন্য তৈরি করেছেন—আমার ও আমার স্ত্রী শাহানার জন্য। কেবল একটি শিল্পকর্ম নয়, এটি যেন এক জীবন্ত অনুভবের প্রতিচ্ছবি।

মেটাল, লোহা, কাঠ, কপার, ঘড়ির কাঁটা, ব্রাশ হোল্ডার, ছোট গাছ, আলো জ্বলা-নেভার তারসহ এক জাদুকরী নিখুঁত নির্মাণ। শুভেচ্ছা কার্ড, প্রিন্ট করা ফটো, রিবন মোড়ানো যত্ন—সব মিলিয়ে ভালোবাসার এক অনবদ্য নিদর্শন।

আনমনা ন্যাশ যখন ব্যাখ্যা করছিলেন ভাষ্কর্যের প্রতিটি শাখা-প্রশাখার প্রতীকার্থ, আমি ও শাহানা আবেগে নীরব। যেন বাবার মতোই স্বপ্রতিভ, তীক্ষ্ণ, মায়াবী মেয়ে সে। মেয়েটি জানালো—দুই সপ্তাহের কাজের মাঝেও সে দিয়েছে স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা, এবং সেদিন দোকান থেকে বিশেষ আলোও কিনে এনেছে, বাবার সঙ্গে শেষ মুহূর্তের সংযোজনের জন্য।

এমন উপহার, এমন ভালবাসা জীবনে প্রথম পেলাম। আর তখনই বুঝলাম—অগ্নিলার স্বামী নাবিলের পরম বন্ধু মামুন কেবল একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি নন, তিনি একজন মানবিক শিল্পী।

আমি, একজন ক্ষুদ্র আঁকিয়ে, ওদের জন্য আর কী-ই বা দিতে পারি? শুধু অন্তরের গভীর থেকে দোয়া করতে পারি।

আল্লাহ চাইলে হয়তো কোনো একদিন, বৃদ্ধ বয়সে, টিভির পর্দায় দেখে স্ত্রীর দিকে ফিরবো কাঁপা গলায়—“এই শাহানা, দেখো, মামুনের মেয়ে আনমনা ন্যাশ না ওটা? কী অসাধারণ কিছু করেছে মেয়েটা! কেবল মামুন নয়, গোটা বাংলাদেশি-কানাডিয়ান কমিউনিটির মুখ আজ সে আলোকিত করেছে!”

এই দোয়া, এই প্রার্থনাই রেখে গেলাম মামুনুর রহমান ও আনমনা ন্যাশের জন্য।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles