এক জটাধারী ফকির

এক জটাধারী ফকির - the Bengali Times
একদিন হাঁটতে হাঁটতে দেখি এক জটাধারী ফকির গায়ে গেরুয়া পোশাক হাতে ত্রিশূল

তখন আমার বয়স ছিল বাইশ।

একদিন হাঁটতে হাঁটতে দেখি এক জটাধারী ফকির। গায়ে গেরুয়া পোশাক – হাতে ত্রিশূল। আমাকে দেখে দূরে দাঁড়িয়ে রইল। সেকি লাল লাল চোখ লোকটার। বিচ্ছিরী কালো কালো দাঁত। শরীরটাও বেখাপ্পা হালকা পাতলা।

- Advertisement -

তখন অবশ্য ভয় পাবার বয়স ছিল না। তবুও নির্জন পথে ত্রিশূল হাতে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে ভয় পাবারই কথা।

ভেবেছিলাম পাশ কেটে চলে যাব কিন্তু হঠাৎ তার দুর্গন্ধ মাখা হাত আমার মাথার ওপর তুলে দিয়ে বলল- ‘তোর ভাগ্য দেখে ঈর্ষা হচ্ছে পুত্র’। তারপর দু’চারবার মাথা ঝাঁকিয়ে আশ্চর্য এক ভবিষ্যৎ বাণী করে বসল।

‘তুই তোর উনসত্তর বছর বয়সে প্রেমে পড়বি’।

বললাম পথ ছাড়। ওসব বলে কোন কাজ হবে না। আমার কাছে কোন টাকা পয়সা নেই। গরীব বাবার ছেলে আমি। সখ হয় প্রতিদিন এক প্যাকেট ক্যাপেস্টান সিগারেট খাই কিন্তু তার বদলে খাই বগা সিগারেট। সিজার ব্যান্ড হলেও চলতো। আমাকে

ওসব ভাগ্য-টাগ্য শুনিয়ে লাভ হবে না।

ঝোলা থেকে দুআনা পয়সা বের করে জটাধারী বলল, ‘এটা রাখ, আমার কথা যেদিন সত্যি হবে মাজারে গিয়ে সিন্নি দিস। তবে, এই পয়সা ফেলে দিলে তোর অমঙ্গল হবে’।

সেই থেকে ঘরের মধ্যে দুআনা পয়সা পাহাড় সমান বোঝা হয়ে বসে আছে।

ঠকঠক ঠকঠক ঠক।

এখন আমার বয়স উনসত্তর। এই মেয়ে শুনতে পাচ্ছ?

আচ্ছা বলতো সারাক্ষণ তুমি অমন করে নিচের দিকে চেয়ে থাক কেন? কোন এক আশ্চর্য কারণে সবসময় নীল রঙের শাড়ি পর। পাবলিক বাসে উঠতে গিয়ে বারবার নেমে পড় কেননা, পুরুষ মানুষগুলোর গায়ের গন্ধ তোমার ভালো লাগে না। তুমি পাতলা স্যান্ডেল পরে ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাও ছাতা মাথায় দিয়ে। একটা কালো চশমা থাকে চোখে।

আরও দেখছি, প্রতিদিন ফুটপাথ থেকেই বাজার সদাই কর। সপ্তাহে দু’দিন ওষুধের দোকানে গিয়ে ওষুধ কেন। নিশ্চয় একটা ছোট ভাই আছে নাহলে ছেলেদের খেলনা কিনতে না।

যাইহোক, এই বয়সে তোমার পাশে কারোর থাকার কথা। সেরকম লক্ষণও দেখছি না। তাই হৃদয়ে টোকা দিচ্ছি। সবে মাত্র উনসত্তরে পড়েছি। মনে হয় না তুমি কিছু শুনতে পাচ্চছো?।

হৃদয়ে টোকা না দিয়ে দরজায় টোকা দিলে কবেই হয়তো খুলে দিতে। হয়তো চোখে চোখ রেখে অবাক হতে। ঘর দেখিয়ে বলতে ‘ভেতরে গিয়েঁবসুনচ ’। খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে আপনাকে এক গ্লাস পানি এনে দেই?

কিন্তু আমিতো বসতে আসিনি। কিছু খেতেও আসি নি, শুধু ভালবাসতে এসেছি।

এখন বয়স টয়েসের যুক্তিতর্ক দিয়ে সব অপেক্ষার সমাপ্তি করে দিও না যেন। বসে বসে’তো দেখলাম অপেক্ষা কত দীর্ঘ হয়। কত মানুষের আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ গেল। চাষী থেকে ব্যাঙ্ক মালিক হলো কত আপনজন। কত চাকরিজীবী অসাধু উপায়ে পেল প্রমোশন। কত জীবন সময়ের আগে ঝরে গেল।

এসব দেখতে দেখতে আমার উনসত্তর বছর এলো সুফি দরবেশদের সাদা নিয়ম মেনে, চুলে পাক ধরিয়ে। কী করবো বল, ইচ্ছে করলেই কি কেউ টুপ করে বয়সের কোটা শেষ করতে পারে?

এই মেয়ে শুনতে পাচ্ছ? হৃদয়ের পাল্লা কি এতোই ভারী যে টোকা দিলেও শব্দ হয় না!

আগের জটাধারী নিশ্চয়ই এতদিনে অক্কা পেয়েছে। আবার নতুন কোন জটাধারী এসে বলবে ‘তোর ভাগ্য দেখে ঈর্ষা হচ্ছে পুত্র। নিরাশ হস না, এবার না পারলে একশো ষোল বছর বয়সে তুই প্রেমে পড়বি’।

আমার প্রেম-চক্র নাকি এরকমই। কিন্তু একবার প্রেমে পড়ার জন্য আমি এতদিন বাঁচতে চাই না। বেঁচে থাকতেই একবার প্রেম চাই।

এই মেয়ে তুমি কি বুঝতে পার দু’আনা পয়সার ওজন কত? দু’আনার ওজন বয়ে বয়ে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। আমি চাই জটাধারীর পয়সা দিয়ে মাজারে সিন্নি কিনে দিতে।

পারবে না একদিনের জন্য হলেও প্রেমের বাঁধুনিতে কাছে রাখতে?

ধর, ফুটপাথ দিয়ে তুমি যখন হেঁটে যাবে ছাতাটা নাহয় আমিই ধরে রাখবো। মাঝেমাঝে গিয়ে আমিই না হয় ওষুধ কিনে আনবো। দেরি হলে তুমি রাগ করবে, আমি তখন কথা খুঁজতে থাকবো। কি বললে তোমার রাগ পড়ে যাবে তেমন কিছু কথা। এরপর যদি সম্পর্কটা দীর্ঘস্থায়ী না হয় তবে সব দোষ আমার। তবুও যেন পরকালে গিয়ে বলতে পারি একদিন আমার সব ছিল মাটির পৃথিবীতে। একটি মেয়েকে ভালোবেসে রেখে এসেছি – আদম হাওয়ার দেশে।

ঠকঠক ঠকঠক ঠক।

 

স্কারবোরো, কানাডা

- Advertisement -
পূর্ববর্তী খবর
পরবর্তী খবর

Related Articles

Latest Articles