
বৃষ্টি-বৃষ্টি,ভেজা-ভেজ ছিলো ৯জুন সোমবার। আমার কিন্তু দারুণ কাটলো তিন স্বনামধন্য শিল্পীবন্ধুর সঙ্গে। বাংলাদেশ থেকে উড়ে আসা স্বনামধন্য বিমূর্ত শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস ,স্ত্রী লিটা ইউনুস সহ টরন্টো এসেছে সদ্য।
একমাত্র পুত্র হ্যামিলটনের ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স শেষ করলো। কনভোকেশনে উপস্থিত থাকতে। অন্য দুইজনের টরন্টোতে বসবাস। শিল্পী তাজউদ্দিন আহমেদ ও শিল্পী মোহাম্মদ মাযহারুল হক। অনেকদিন পর মানসিক যৌবনে ভরপুর চারজন বৃদ্ধ যুবক টরন্টো ডাউন টাউনকে কিমা বানাতে বেরুলাম। মাযহার ওরফে ডালিম মাস্টার গ্রাফিক আর্টিস্ট।
দামী আবাসিক বিল্ডিং গুলোর লবিতে এবং বিশাল জিমের দেয়ালে তার নিজের করা দশ বাই চল্লিশ ফুট মুরাল ঘুরে দেখালো। বেরুনোর আগে মাযহারের বাসায় বিশ পদের লাঞ্চ আমাদের পেট এতোটাই ভারী করে দিয়ে ছিলো যে ওর বাসা থেকে তিন কিলোমিটার পথ ডিস্টালারী আর্ট ডিস্ট্রিক যেতে উবার ডাকতে হলো। যেহারে টরন্টোতে বাংলাদেশীদের সংখ্যা বাড়ছে আবার টের পেলাম। উবার চালক মাযহারের প্রতিবেশী,সামান্য টাকা তবু নিতে চান না।
ডিস্টিলারী ডিস্ট্রিক মানে মদ্য তৈরীর শত বছর পুরনো কারখানা। বিশাল সব লাল ইটের পুরনো বাড়ি। যা তৈরী হয়ে ছিলো দেড় শত বছর আগে। কাছেই অন্টারিও লেক ইংল্যান্ড থেকে কাঠের বড় পিপা ভর্তি তৈরী মদ আবার তৈরী জিনিসপত্র আসতো পাল তোলা বড়-বড় জাহাজে। সেসব সময় আর কই এখন!গত শতাব্দীর সত্তর দশকের শুরুর দিকে সরকার সব ভেঙ্গে পরিষ্কার করে কমার্শিয়াল টাওয়ার তৈরী করতে চাইলো। জায়গাটা অতি মূল্যবান টরন্টো ডাউন টাউন লাগোয়া। বাঁধা দিলো টরন্টোর যত আর্টিস্টিস্ট আর ফ্যাশান ডিজাইনার ক্যাফে ওনার,ভাঙ্গতে দেবেনা।
যেমন আছে তেমনি থাকবে সব। শুধু এখানে এরই মধ্যে গড়ে উঠবে নতুন করে আর্ট গ্যালারী ক্যাফের পর ক্যাফে ফ্যাশান ডিজাইনারদের আউটলেটএবং বার আরো কতকি!সরকার হারলো জিতলো শিল্পীদল। এখন সেটাই জমজমাট ডিস্টালারী ডিস্ট্রিক। হাঁটা পথে এখনো দুইশত বছর আগের আগুনে পোড়ানোএ্যাবড়ো থ্যাবড়ো কালো ইট বিছানো রাস্তা গুলো তেমনি আছে। কফি শপের দরজা দেড়শ বছর পুরোনো। কফি কিংবা ওয়াইন-বিয়ার নিয়ে বাইরে পেতে দেয়া চেয়ার টেবিলে বসে বেশির ভাগ দর্শনার্থী। আমি ও তাজউদ্দিন শিল্পীদের মধ্যে দেশ থেকে যারাই আসে এখানে নিয়ে আসি। কতবার যে এসেছি হিসাব নেই। থম্পসন গ্যালারীর দুইটি ব্রাঞ্চ দু’টিই বন্ধ ছিলো। মূলত ইউনুসকে আমরা এজিও আর্ট গ্যালারী অফ অন্টারিও দেখানো ইচ্ছে নিয়ে এসে ছিলাম। কানাডার সব চেয়ে বড় আর নর্থ আমেরিকায় প্রাধাণ কয়েকটির একটি এই আর্ট মিউজিয়াম এজিও। দুর্ভাগ্য সোমবারে সেটিও বন্ধ। ইউনুসের খুবই ভালো লাগলো ডিস্টিলারী ডিস্ট্রিক্ট।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের একটি ট্রাক জং খেয়ে তামাটে হয়ে পড়ে আছে একদিকে। অনেক ছবি তোলা হলো।ইউনুস ছোট-ছোট গিফট কিনলো বেশ। এরপর বাইরে পাতা চেয়ার টেবিলে বসে চারজন যখন কর্সা আর কফি পান করছি তখন চার জনের ছবি এক সঙ্গে তোলার জন্যে আমি অনুরোধ করে ডেকে আনলাম কি দারুণ মেয়েটিকে। চেহারা দেখে ভারতীয় লেগে ছিলো। জিজ্ঞেস করতে বল্লো মরাক্কান মেয়ে পড়াশোনা শেষ করে থাকে এবং চাকরী করে প্যারিসে,দুই সপ্তার জন্যে টরন্টো বেড়াতে এসেছে। সবার কার্ড পেয়েতো অবাক! সবাই তোমরা আর্টস্ট ! আমিতো প্যারিসেও কখনো চারজন আর্টস্টের সাথে বসিনি,কথা বলিনি, পরিচিত হইনি,ভাগ্যবান মনে হচ্ছে।
প্রায় দেড় ঘন্টা ডিস্টিলারীতে থেকে টেক্সী নিয়ে এসে নামলাম টরন্টোর আইকন সি,এন টাওয়ারে নিচে। শিল্পী ইউনুস সাধারণ বাঙালীর চেয়ে বেশ লম্বা! তাই হয়তো লম্বা উঁচু জিনিসের প্রতি তার টান। ব্রুজ খলিফা ডুবাইয়ে মাথা তোলার আগে এই কানাডার সি,এন টাওয়ারই ছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু। জেটসেট ইঞ্জিন লাগানো এলিভেটর এক টানে যখন ওপরে নিয়ে যায় অনেকের মাথাা ঘুরে ওঠে। তাজউদ্দিনের শুধু মাথাই ঘোরেনা পায়ের তলাও শিরশির করে।
আমার এসব ওঠাউঠি বেশি হয়ে গেছে,আর ভালো লাগেনা। তাছাড়া টিকেট ও অনেক ডলার। শেষবার যখন উঠেছি পঞ্চাশ ডলার ছিলো এখন কত জানিনা। আমি আর তাজউদ্দিন হেঁটে কাছেই কিং স্ট্রিটে কানাডার বিখ্যাত কফিশপ টিম হর্টানে গিয়ে ঢুকলাম। সি,এন টাওয়ার লাগোয়া টরন্টো এ্যাকুরিয়াম। এক বিশাল সমুদ্রের তলদেশ যেন তুলে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে।
ত্রিশ হাজার প্রজাতীর মাছ রয়েছে,বড় ছোট সার্ক বা হাঙরই আট দশ প্রজাতীর। দেখার সময় কই! জুন মাসে সন্ধ্যা হয় টরান্টোতে ৯টা বাজলে। বাংলাদেশে ৯কে রাত বলে। এত লম্বাদিন তবু যেন কেমন দ্রুত পার হয়ে যায়। সাড়ে সাতটায় টরন্টো শহরের মধ্যিখানে সবচেয়ে জমজমাট আলোকিত বিশাল সব ডিজিটাল সাইনে ভরা ডানডাস স্কোয়ারকে নিউ ইয়র্কের টাইম স্কোয়ারের ছোট ভাই বলা যায় সেখানেই কিংবা তারই আশেপাশে লেবানিজ ‘প্যারামাউন্ট’ রেস্টুরান্টে মাযহারের বড় মেয়ে ও তার স্বামী আমাদের জন্যে ডিনার টেবিল বুক করে রেখেছে। সেখানে হাজির থাকতে দেরী করা যাবেনা।
শিল্পী মাযহারের দুই মেয়ে কিযে লক্ষী! বাবার জন্মদিনে উপহার দিয়েছে মেটা আর গোগোলের সদ্য উদ্ভাবিত রেবেন চশমায় লাগানো অদৃশ্য কিছু একটা। হাত তুলে চশমার ডান কোণে আঙ্গুল ছোঁয়ালে ফোন সেটে ছবি উঠে যায়। ফোন সেটটি সাথে না থেকে যদি ঘরে পড়ে থাকলেও ছবি উঠে বসে থাকবে। সামনে হেঁটে যাওয়া যার ইচ্ছে তার ছবি তুল্লে কেউ টের পায়না। আমার বেশ মজা লাগলো। ভাবলাম ৬০-৭০ ডলার হলে একটা কিনে ফেলি। সারাদিন সেই জাদুর চশমা পরে ঘুরবো। মাষহারকে দাম জিজ্ঞেস করতে বল্লো একখন দাম মাত্র ৭০০ ডলার। তোমাকে ঐদামে কিনতে বেশিনা এই তিনটা বছর অপেক্ষা করতে হবে! চশমার কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে তাজউদ্দিনে কথামত টরন্টো ডাউন টাউনের সাউথের শেষ মাথায় অন্টারিও লেকের জলে থৈথৈ হার্বারফ্রন্ট গিয়ে বসলাম সবাই ।
এখান থেকেই টরান্টো থেকে ভূমিকম্পে আলাদা হয়ে সরে যাওয়া সেন্টার আইল্যান্ডের বড় ফেরী আসাযাওয়া করে। সেন্টার আইল্যান্ড থেকে টরন্টো সিটিলাইন খুবই চমৎকার ভাবে দেখা যায়। সেটিতেও যাওয়ার সময় নেই। তাই হার্বারফ্রন্টে টুরিস্ট টুরের জন্যে দাঁড়িয়ে থাকা পালতোলা জাহাজ আর অন্টারিও লেকের দৃশ্যের ছবি তুলেই ক্ষান্ত দিতে হলো। টরন্টোর ট্রাম যাকে এখানে স্ট্রিটকার বলে।সেটিতে করে মাত্র একটি সটেশান পার করে ইউনিয়ন জংসন মেগা স্টেশানে এসে নামলাম। ইউনিয়নে টরন্টোর দূরপাল্লার ভিয়া রেইল,টরন্টো সাবওয়ে গো-বাস গো-ট্রেন সব কিছুর মহাস্টেশান।
ইউনিয়ন থেকে পাতালে নেমে সবাই সাবওয়েতে উঠে বসলাম। কিং,কুইন দুই স্টেশান পার হতেই ডানডাস। পাতাল থেকে আবার মাটির উপরে উঠে আসতেই কোলাহল, জমজমাট ডানডাস স্কোয়ার। ডানডাস ধরে এক ব্লক ইস্টে হাঁটলেই তিনতলা লেবানিজ রেস্টুরেন্ট ‘প্যারামাউন্ট’। মাযহারের বড় মেয়ে স্বামী ও ছোট বোনকে নিয়ে রেস্টুরান্টে অপেক্ষায় ছিলে চার আর তিন সাতজন হলাম। জোড়া দেয়া হলো দুই টেবিল। কাবাবের বাহার কত প্রকার ও কি-কি আর গার্লিক নানের সঙ্গে ভরে উঠলো টেবিল।
খাবার শেষে টার্কিশ বাকাল্বা সুইট। বিদায়ের পালা ঘটানো হলো আলো ঝলমলে রাতকে দিন করা ডানডাস স্কোয়ারে। ইউনুস ছবি তুলছে ঘুরেঘুরে,তার ছবি আমি তাজউদ্দিন ও মাযহার তুলছি। হাজার হোক প্রিয় ঢাকার অতিথি। এখানেই শেষ আমাদের একটি মজাময় দিন।মাযহার গেলো মেয়ে আর জামাইয়ের সাথে। ইউনুস উবার নিয়ে গেল সোয়া ঘন্টার ড্রাইভ আরেক শহর হ্যামিলটনে। আমি আর তাজউদ্দিন আবার নামলাম পাতালে সাবওয়ে ধরে এবং পরে বাস বাড়ি ফিরে যাবো। ডাউন টাউনে গাড়ি আনেনা কেউ যদি ঘুরেঘুরে ভালো ভাবে দেখার ইচ্ছা থাকে।
স্কারবোরো, কানাডা

