
কানাডার শ্রমবাজারে নতুন করে অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নভেম্বর ২০২৪-এ দেশের বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ স্তর। আগের মাস অর্থাৎ অক্টোবর ২০২৪-এ এই হার ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই বেকারত্ব বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হলো শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হারের বৃদ্ধি। নভেম্বর মাসে অংশগ্রহণের হার ০.৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে গেছে, যা বোঝায় যে আরও বেশি মানুষ সক্রিয়ভাবে চাকরি খুঁজতে নামছে। অর্থাৎ, নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও আরও বেশি মানুষ চাকরির বাজারে প্রবেশ করায় বেকারত্বের হার সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিতে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। নভেম্বর মাসে কানাডায় নতুন করে প্রায় ৫১ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই পূর্ণকালীন এবং সরকারি খাতে হয়েছে। টিডি ব্যাংকের অর্থনৈতিক পরিচালক জেমস অরল্যান্ডো বলেন, “একদিকে আমরা এক মাসে ৫০ হাজার নতুন চাকরি তৈরি হতে দেখছি, অন্যদিকে বেকারত্ব বাড়ছে। এর অর্থ, বিপুল সংখ্যক মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, ফলে চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা বেড়ে যাচ্ছে।”
কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব বাদ দিলে, নভেম্বরের এই বেকারত্বের হার ২০১৭ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ধারাবাহিকভাবে বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে; এ সময়ের মধ্যে হার বেড়েছে প্রায় ১.৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। ফলে চাকরিহীন অবস্থায় দীর্ঘ সময় পার করছেন বহু কানাডিয়ান। শ্রমবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নভেম্বরে বেকার থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৪৬.৩ শতাংশ গত এক বছর ধরে কোনো কাজে নিয়োজিত ছিলেন না, যেখানে এক বছর আগে এ হার ছিল ৩৯.৫ শতাংশ। এটি দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের প্রকটতা তুলে ধরেছে।
মজুরি বৃদ্ধির হারও মন্থর হয়ে গেছে। নভেম্বর মাসে ঘণ্টাপ্রতি গড় মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে আগের বছরের তুলনায় ৪.১ শতাংশ, যেখানে অক্টোবর মাসে এই হার ছিল ৪.৯ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, মজুরি বৃদ্ধির মন্থর গতি শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করবে, বিশেষ করে যখন মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে পরিস্থিতি ভিন্ন। অন্টারিও ও কুইবেকে চাকরির সুযোগ কিছুটা বেড়েছে, তবে প্রেইরি প্রদেশগুলোতে (আলবার্টা, সাসকাচুয়ান, ম্যানিটোবা) খনি ও জ্বালানি খাতে ছাঁটাইয়ের কারণে বেকারত্ব দ্রুত বাড়ছে। যুবসমাজের মধ্যে বেকারত্ব হার বিশেষভাবে বেশি; ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এই হার প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে ২০২৫ সালের শুরুতেই শ্রমবাজারে আরও বড় ধাক্কা আসতে পারে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি সত্ত্বেও শ্রমশক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাচ্ছে, এবং দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব মোকাবিলা করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, নভেম্বরের এই দ্বৈত চিত্র – চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি ও বেকারত্বের বৃদ্ধির সমান্তরাল বৃদ্ধি – কানাডার শ্রমবাজারের জটিল বাস্তবতা তুলে ধরেছে। একদিকে নতুন চাকরি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে আরও বেশি মানুষ চাকরি খুঁজছে, যা বোঝায় যে শ্রমবাজার এখন এক অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সরকারকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক নীতি ও বিনিয়োগ গ্রহণ করতে হবে।

