
কুইবেকের উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে শরব্রুক বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি ঘোষণা করেছে একটি নতুন স্নাতক স্তরের কোয়ান্টাম তথ্যবিজ্ঞান প্রোগ্রামের সূচনা। এটি কেবল কুইবেক প্রদেশেই নয়, পুরো কানাডাতেই প্রথমবারের মতো স্নাতক পর্যায়ে কোয়ান্টাম তথ্যবিজ্ঞান শিক্ষাদানের উদ্যোগ হিসেবে ধরা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, এই পদক্ষেপ কুইবেককে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও গবেষণার অগ্রভাগে স্থাপন করবে।
কোয়ান্টাম তথ্যবিজ্ঞান আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির একটি বিপ্লবাত্মক শাখা, যেখানে তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং গণনার জন্য ব্যবহার করা হয় কোয়ান্টাম কণার বৈশিষ্ট্য যেমন সুপারপজিশন এবং এন্ট্যাংলমেন্ট। বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যেই এই খাতে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ইউরোপ এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, এবং কানাডাও এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই।
শরব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণায় বলা হয়েছে, প্রথম ব্যাচে প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে, এবং আশা করা হচ্ছে আগামী পাঁচ বছরে এই সংখ্যা ৩০০ জনে পৌঁছাবে। প্রোগ্রামের কাঠামোতে তাত্ত্বিক শিক্ষা, ল্যাবরেটরি গবেষণা, এবং শিল্পখাতের সঙ্গে যৌথ প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত থাকবে। শিক্ষার্থীরা পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল শাখার সমন্বিত জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবেন।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কানাডার ফেডারেল সরকার ইতিমধ্যেই কোয়ান্টাম প্রযুক্তি উন্নয়নে প্রায় ৩৬০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা করেছে। কুইবেক প্রাদেশিক সরকারও আলাদা করে ১৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ২০৩০ সালের মধ্যে কানাডায় কোয়ান্টাম খাতে প্রায় ২০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
শিল্পক্ষেত্রও এই উদ্যোগে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। মন্ট্রিয়েল ও কুইবেক সিটির কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ঔষধশিল্প এবং টেলিযোগাযোগ খাতে কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতের তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা এবং চিকিৎসা গবেষণায় কোয়ান্টাম কম্পিউটিং হতে পারে এক “গেমচেঞ্জার”।
অধ্যাপক ও গবেষকরা মনে করছেন, এই প্রোগ্রাম কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতাই নয়, বরং বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা ও উদ্ভাবনী মানসিকতা গড়ে তুলবে। শরব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বলেন, “আমরা চাই শিক্ষার্থীরা শুধু বইপত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে ল্যাবরেটরিতে নতুন কিছু আবিষ্কার করুক। এই প্রোগ্রাম থেকে ভবিষ্যতের নোবেল বিজয়ীরাও উঠে আসতে পারে।”
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। কোয়ান্টাম তথ্যবিজ্ঞান অত্যন্ত জটিল একটি শাখা, যেখানে পাঠ্যক্রম তৈরি থেকে শুরু করে দক্ষ শিক্ষকমণ্ডলী নিয়োগ পর্যন্ত সবকিছুতেই অতিরিক্ত মনোযোগ প্রয়োজন। সমালোচকরা মনে করছেন, যদি পর্যাপ্ত গবেষণা অবকাঠামো তৈরি না করা যায়, তবে প্রোগ্রামটির সাফল্য বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
শরব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নতুন স্নাতক প্রোগ্রাম কুইবেকের উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তিতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। শরব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী জোসে হ্যারেম বেঙ্গলি টাইমসকে বলেন, এটি প্রমাণ করছে, কুইবেক কেবল ঐতিহ্যবাহী শিল্পনির্ভর অর্থনীতি নয়, বরং জ্ঞাননির্ভর আধুনিক অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই উদ্যোগ প্রদেশটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের এক শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

