
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কুইবেক প্রদেশে নতুন অভিবাসীদের ধরে রাখার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান ও গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, যারা নতুন করে কুইবেকে আসছেন তারা আগের তুলনায় বেশি সময় প্রদেশে থেকে যাচ্ছেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রবণতা দেখাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারা কুইবেকের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে কুইবেকে আগত অভিবাসীদের মধ্যে প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে প্রদেশ ত্যাগ করার হার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের মধ্যে মাত্র ৭ জনই দীর্ঘমেয়াদে এখানে অবস্থান করছিলেন। তবে ২০২৩ সালে সেই হার কমে মাত্র ২০ শতাংশে নেমেছে। ফলে বর্তমানে প্রতি ১০ জন অভিবাসীর মধ্যে অন্তত ৮ জন দীর্ঘমেয়াদে কুইবেকেই থেকে যাচ্ছেন। গবেষকরা বলছেন, কুইবেকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ, উন্নত সামাজিক সেবা এবং বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ অভিবাসীদের এই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমানে কুইবেকে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ বসবাস করছে, যার মধ্যে অভিবাসীর সংখ্যা ১৫ লাখের বেশি। অর্থাৎ প্রদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশই অভিবাসী। প্রতিবছর গড়ে ৫০ হাজার নতুন অভিবাসী কুইবেকে আসছেন। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ থেকে আসা অভিবাসীদের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি সম্প্রদায়ের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩ সালে প্রদেশে নতুনভাবে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে গৃহীত হয়েছে প্রায় ৫০০০ বাংলাদেশি অভিবাসী।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কুইবেকে শ্রমবাজারে অভিবাসীদের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও শিক্ষাক্ষেত্রে শ্রমশক্তির ঘাটতি রয়েছে, যা নতুন আগত অভিবাসীরা পূরণ করছেন। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কুইবেকে মোট কর্মসংস্থানের ১৪ শতাংশ পূরণ হয়েছে অভিবাসীদের মাধ্যমে।

তবে ভাষাগত বাধা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাদেশিক সরকার সাম্প্রতিক সময়ে ফরাসি ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি জোরদার করেছে। ২০২২ সালে যেখানে মাত্র ৪৫ শতাংশ অভিবাসী ফরাসি ভাষা কোর্সে অংশগ্রহণ করেছিলেন, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ শতাংশে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফরাসি ভাষায় দক্ষতা অর্জন নতুন অভিবাসীদের চাকরি পাওয়া, ব্যবসা শুরু করা এবং সামাজিকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হচ্ছে।
সামাজিক সংগঠনগুলোও অভিবাসীদের ধরে রাখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মন্ট্রিয়েল, কুইবেক সিটি ও ল্যাভাল শহরের কমিউনিটি সেন্টারগুলো নতুন আসা অভিবাসীদের আইনি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করছে। এসব উদ্যোগ অভিবাসীদের মধ্যে সামাজিক সংযোগ বাড়াচ্ছে এবং প্রদেশে স্থায়ীভাবে থাকার আগ্রহ জাগাচ্ছে।
তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আবাসন সংকট, উচ্চ ভাড়া এবং স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘ অপেক্ষা অভিবাসীদের জন্য বড় সমস্যা। মন্ট্রিয়েলে ২০২৪ সালে একটি গড় অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া মাসে প্রায় ১৭০০ ডলার, যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। অনেক অভিবাসী পরিবার এই খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রিমিয়ার ফ্রাঁসোয়া লেগো আইনসভায় বলেছেন, “কুইবেকের অর্থনীতি ও সমাজকে এগিয়ে নিতে অভিবাসীদের অবদান অপরিসীম। আমরা চাই, যারা এখানে আসছেন তারা যেন নিজেদের ভবিষ্যৎ এখানেই গড়ে তুলতে পারেন।” তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ফরাসি ভাষা শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সহায়তা আরও জোরদার করা হবে।
মন্ট্রিয়লে বসবাসরত একজন অভিবাসী ব্যবসায়ী আবিদ হাসান বেঙ্গলি টাইমসকে বলেন, কুইবেকে অভিবাসীদের ধরে রাখার হার বৃদ্ধি একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এটি প্রমাণ করছে যে প্রদেশটি কেবল অভিবাসীদের আকৃষ্ট করছে না, বরং তাদের স্থায়ীভাবে থাকার জন্য উদ্দীপনা যোগাতে সক্ষম হচ্ছে। তবে আবাসন ও জনসেবার ঘাটতি যদি সমাধান না করা যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে কুইবেক কানাডার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অভিবাসী গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।

