
কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো নভেম্বর মাসে রাজধানী অটোয়ায় ডাকেন একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক, যেখানে দেশের সব প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক নেতারা অংশ নেন। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল নবনির্বাচিত মার্কিন প্রশাসনের শুল্ক নীতি সংক্রান্ত হুমকির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী এবং ঐক্যবদ্ধ কৌশল গড়ে তোলা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই কানাডার গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও কৃষি খাতের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। বিশেষভাবে প্রভাবিত হতে পারে গাড়ি শিল্প, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং কৃষিপণ্য খাত।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড, কুইবেকের প্রিমিয়ার ফ্রাঁসোয়া লেগো, আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড এবি এবং আটলান্টিক প্রদেশগুলোর অন্যান্য নেতারা। প্রধানমন্ত্রী বৈঠকের শুরুতে বলেন, “আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের কর্মসংস্থান রক্ষা করা। মার্কিন শুল্ক কার্যকর হলে লাখ লাখ কানাডিয়ান পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই রাজনৈতিক পার্থক্য ভুলে আমরা এক কণ্ঠে কথা বলব।”
অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড বৈঠকে বলেন, “গাড়ি শিল্পে কয়েক লাখ মানুষ কাজ করছে। শুল্ক আরোপ হলে উৎপাদন কমে যাবে এবং হাজার হাজার পরিবার প্রভাবিত হবে। আমরা এটা হতে দিতে পারি না।” কুইবেকের প্রিমিয়ার লেগো যুক্ত করেন, “কৃষি এবং দুগ্ধশিল্প আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন শুল্ক নীতি কৃষকদের জন্য ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হতে পারে।” আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ বলেন, “আমাদের তেল ও গ্যাস রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। শুল্ক আরোপ হলে প্রাদেশিক বাজেট মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে।”
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যায়। ২০২৩ সালে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৮০ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার। এর মধ্যে গাড়ি শিল্প থেকে প্রাপ্ত রপ্তানি মূল্য প্রায় ৮০ বিলিয়ন, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন এবং কৃষিপণ্য থেকে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, নতুন শুল্ক কার্যকর হলে দেশের অর্থনীতিতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে।
বৈঠকে সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ পণ্য প্রবাহ এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণের বিষয়ও গুরুত্বসহকারে আলোচনা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো প্রাদেশিক নেতাদের আশ্বস্ত করেন যে ফেডারেল সরকার কূটনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান নেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানোর চেষ্টা করবে যে এই শুল্ক নীতি দুই দেশের জন্যই ক্ষতিকর। তিনি বলেন, “আমরা প্রতিবেশী, আমরা অংশীদার। আমাদের মধ্যে সহযোগিতা থাকা প্রয়োজন, প্রতিযোগিতা নয়।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি কানাডা এখনই ঐক্যবদ্ধভাবে মার্কিন প্রশাসনের কাছে অবস্থান তুলে ধরে, তবে শুল্ক আরোপ প্রতিহত করা সম্ভব। একই সঙ্গে, দেশের বিকল্প বাজার যেমন ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। কৃষিপণ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের বাজারে নতুন অংশীদার তৈরি না করলে ভবিষ্যতে অর্থনীতি আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সাধারণ মানুষও এই আলোচনা নিয়ে উদ্বিগ্ন। টরন্টোর এক গাড়ি কারখানার শ্রমিক বলেন, “আমাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। যদি শুল্ক বৃদ্ধি পায়, তবে কারখানা বন্ধ হতে পারে। আশা করি সরকার আমাদের পাশে দাঁড়াবে।” কৃষক সমিতির একজন সদস্য বেঙ্গলি টাইমস বলেন, “আমাদের দুধ, শস্য, সবজি সবই যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। যদি বাজার বন্ধ হয়, আমরা দেউলিয়া হয়ে যেতে পারি।”
নভেম্বর ২০২৪-এর এই বৈঠক কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক নেতৃত্ব একত্রিত হয়ে যে ঐক্য প্রদর্শন করেছে, তা প্রমাণ করে যে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সবাই সমানভাবে উদ্বিগ্ন। এখন দেখার বিষয়, ট্রুডো সরকার কতটা সফলভাবে কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করে মার্কিন শুল্ক হুমকি মোকাবিলা করতে পারে।

