
ভারতের কেরালার ছোট্ট শহর ত্রিশূরে জন্ম। মাত্র ছয় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেই মেয়েই এবার যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি নিত্যা রমন। বিদায়ী মেয়র কারেন বাসকে পরাজিত করে ইতিহাস গড়েছেন ৪৫ বছর বয়সী এই নগর পরিকল্পনাবিদ ও রাজনীতিক। তার জয়ের মধ্য দিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস প্রথমবারের মতো একজন দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত নারী মেয়র পেতে যাচ্ছে।
গত ৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেন কারেন বাস। সর্বশেষ ভোট গণনায় নিত্যা রমন পেয়েছেন ৫২ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে কারেন বাস পেয়েছেন ৪৮ শতাংশ। দুই দশকের বেশি সময় পর লস অ্যাঞ্জেলেসে কোনো ক্ষমতাসীন মেয়র পুনর্নির্বাচনে পরাজিত হলেন। আগামী ডিসেম্বরে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করার কথা রয়েছে রমনের।
কেরালা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে
নিত্যা রমনের জন্ম ভারতের কেরালা রাজ্যের ত্রিশূরে। ছয় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যে চলে যান তিনি। সেখানেই বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনার শুরু। উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০৩ সালে সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে নগর পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।
পড়াশোনা শেষে নগর পরিকল্পনা ও নাগরিক সেবার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেন নিত্যা। লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিরে শহরটির গৃহহীন মানুষের দুর্দশা তাকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়। এ সংকট মোকাবিলায় ২০১৭ সালে তিনি সহপ্রতিষ্ঠা করেন ‘সেলাহ নেবারহুড হোমলেস কোয়ালিশন’। সংগঠনটি গৃহহীন মানুষের জন্য আবাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে কাজ করে।
স্থানীয় রাজনীতি থেকে মেয়র পদে
নিত্যা রমনের রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয় তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজের মধ্য দিয়ে। ২০২০ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কাউন্সিলের চতুর্থ ডিস্ট্রিক্টের নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথমবার কাউন্সিল সদস্য হন তিনি। ওই নির্বাচনে তৎকালীন কাউন্সিল সদস্য ডেভিড রিউকে পরাজিত করেন।
এর মধ্য দিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কাউন্সিলের প্রথম দক্ষিণ এশীয় এবং প্রথম এশীয়-আমেরিকান নারী সদস্য হওয়ার ইতিহাস গড়েন রমন। ২০২৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদেও কাউন্সিল সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
কাউন্সিল সদস্য হিসেবে গৃহহীন মানুষের জন্য কার্যকর সেবা, সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ এবং নাগরিক সুবিধা উন্নয়নে কাজ করেন। নগর পরিকল্পনায় তার পেশাগত অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ধীরে ধীরে স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন তিনি।
যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে জয়
মেয়র নির্বাচনে নিত্যা রমনের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল আবাসন সংকট মোকাবিলা ও গৃহহীন মানুষের সংখ্যা কমানো। পাশাপাশি গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সড়ক ও ফুটপাত সংস্কার এবং নগরীর মৌলিক নাগরিক সেবা আরও কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
২০২৮ সালের অলিম্পিক আয়োজনের আগে লস অ্যাঞ্জেলেসের অবকাঠামো উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন রমন। তার পরিকল্পনায় রয়েছে গৃহহীন মানুষের জন্য আবাসন ও চিকিৎসাসেবার পরিসর বাড়ানো। অলিম্পিকের আগে রাস্তায় বসবাসকারী গৃহহীন মানুষের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও ঘোষণা করেছেন তিনি।
ব্যক্তিজীবন
রাজনীতির বাইরে নিত্যা রমনের পারিবারিক জীবনও বেশ পরিচিত। তার স্বামী ভালি চন্দ্রশেখরন টেলিভিশনের চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক। ‘মডার্ন ফ্যামিলি’ ও ‘থার্টি রক’-এর মতো জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিকে কাজ করেছেন তিনি। এই দম্পতির যমজ সন্তান রয়েছে।
কেরালায় জন্ম নেওয়া এক অভিবাসী পরিবারের সন্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরীর মেয়র—নিত্যা রমনের এই যাত্রা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। তবে নির্বাচনী বিজয়ের পর তার সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন পরীক্ষা। গৃহহীন সংকটের সমাধান, আবাসনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার মান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করতে পারেন, এখন সেদিকেই তাকিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসিন্দারা।

