
কানাডার টরন্টোতে বছরে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ রুপি আয় করতেন ভারতীয় দম্পতি দীপ্তি নায়ার ও ধনঞ্জয় মোরে। ভালো বেতন, প্রতিষ্ঠিত কর্মজীবন আর স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনে কোনো ঘাটতি ছিল না। তবু প্রচলিত জীবনের ছক ভেঙে চাকরি ছেড়ে ভারতের হিমাচল প্রদেশের পাহাড়ি এলাকায় নতুন জীবন শুরু করেছেন তারা। এখন সেখানে নিজেদের বসবাসের পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন একটি হোমস্টে ব্যবসা।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই দম্পতির ব্যতিক্রমী জীবনযাত্রার গল্প।
দীপ্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের নতুন জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। চাকরি ছাড়ার আগে আর্থিক পরিকল্পনা ও হিসাব-নিকাশের বিষয়টিও এক ভিডিওতে প্রকাশ করেছেন তিনি। দীপ্তির ভাষ্য, চাকরি নিয়ে তিনি অসুখী ছিলেন না। তবে যে পেশাকে একসময় স্বপ্ন মনে হয়েছিল, সেটিই কেন জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে উঠবে—এ প্রশ্ন তাকে ভাবিয়ে তুলেছিল।
দীপ্তির উপলব্ধি, জীবনের আনন্দ কেবল অর্থ উপার্জন বা পেশাগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো, ভ্রমণ, পছন্দের কাজ কিংবা কোনো তাড়া ছাড়াই অবসর যাপনের মধ্যেও জীবনের প্রকৃত আনন্দ রয়েছে। এসবের জন্য অর্থের প্রয়োজন আছে বলেই চাকরি ছাড়ার আগে নিজেদের আর্থিক সামর্থ্য যাচাই করেন তারা।
হিমাচল প্রদেশের বীর এলাকায় বসবাসের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগেভাগেই বাজেট তৈরি করেন এই দম্পতি। দীপ্তির হিসাব অনুযায়ী, বাড়িভাড়া, বাজার, জিম, গৃহকর্মীর বেতন, ইন্টারনেট, বাইরে খাওয়া, জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তাদের মাসিক ব্যয় প্রায় ৩৮ হাজার রুপি।
এই হিসাবে দুই বছর জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজন প্রায় ১২ লাখ রুপি। এর বাইরে ভ্রমণ, দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন বিষয়বস্তু তৈরি ও অন্যান্য খরচের জন্য আরও ১০ লাখ রুপি বরাদ্দ রাখেন তারা। সব মিলিয়ে পাহাড়ে দুই বছর কাটানোর পরিকল্পিত বাজেট দাঁড়ায় ২২ লাখ রুপি।
পাহাড়ে গিয়ে শুধু বসবাসেই সীমাবদ্ধ থাকেননি দীপ্তি ও ধনঞ্জয়। পর্যটন খাতে নতুন উদ্যোগ হিসেবে চালু করেছেন একটি হোমস্টে। আতিথেয়তা ব্যবসায় আগে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যান তারা।
এমন একটি বাড়ি খুঁজছিলেন, যেখানে নিজেরা থাকতে পারবেন, আবার অতিথিরাও পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। শেষ পর্যন্ত এমন একটি বাড়ির সন্ধান পান, যার প্রতিটি কক্ষ থেকেই পাহাড় দেখা যায়। হোমস্টেটির নাম রেখেছেন ‘আহিস্তা স্টেইজ’। দীপ্তি জানান, বাড়িটিকে অতিথিদের থাকার উপযোগী করে গড়ে তুলতে তাদের প্রায় ১০ লাখ রুপি বিনিয়োগ করতে হয়েছে।
নতুন জীবনে আনন্দ খুঁজে পেলেও আর্থিক অনিশ্চয়তা যে পুরোপুরি কাটেনি, সেটিও স্বীকার করেছেন দীপ্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি জানান, বর্তমান জীবন এখনো তার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। তবে নিয়মিত সঞ্চয়ে নতুন অর্থ যোগ না হওয়ায় প্রতি মাসেই দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। কখনো কখনো আগের চাকরির আয়ের কথাও মনে পড়ে।
দীপ্তির মতে, তাদের এই সিদ্ধান্ত সবার জন্য অনুসরণযোগ্য কোনো আদর্শ নয়। জীবনের পরিস্থিতি খারাপ ছিল কি না, সেটি তার কাছে মুখ্য বিষয় ছিল না। বরং বর্তমান জীবনযাত্রা আগামী পাঁচ বছর একই রকম থাকলেও তিনি সন্তুষ্ট থাকবেন কি না—নিজেকে এমন প্রশ্ন করেছিলেন।
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই চাকরি ছেড়ে পাহাড়ের জীবন বেছে নেন দীপ্তি ও ধনঞ্জয়। এখন নতুন পরিবেশে জীবনযাপন, নিজেদের উদ্যোগ এবং হোমস্টে ব্যবসার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

