দীর্ঘদিনের বান্ধবী, ডিএনএ পরীক্ষায় জানা গেল তাঁরা আপন দুই বোন

দীর্ঘদিনের বান্ধবী, ডিএনএ পরীক্ষায় জানা গেল তাঁরা আপন দুই বোন - the Bengali Times
একসময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সেই দুই বন্ধুর সম্পর্কের নতুন পরিচয় মিলল ডিএনএ পরীক্ষায়

কিশোর বয়সে প্রথম দেখা। চেহারায় অদ্ভুত মিল দেখে বন্ধুত্ব, এরপর বছরের পর বছর চিঠি বিনিময়। একসময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সেই দুই বন্ধুর সম্পর্কের নতুন পরিচয় মিলল ডিএনএ পরীক্ষায়। জানা গেল, তাঁরা শুধু ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নন, জন্মসূত্রে আপন দুই বোন।

ভারতে জন্ম নেওয়া মিনা গেলটিঙ্ক ও মিনাল টিজেনের জীবনের গল্প যেন সিনেমাকেও হার মানায়। আশির দশকে জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁদের ঠাঁই হয়েছিল মুম্বাইয়ের দুটি অনাথ আশ্রমে। পরে নেদারল্যান্ডসের দুটি পরিবার তাঁদের দত্তক নেয়। কাছাকাছি এলাকায় বেড়ে উঠলেও নিজেদের রক্তের সম্পর্কের কথা জানতেন না তাঁরা।

- Advertisement -

কিশোর বয়সে দত্তক নেওয়া শিশুদের নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রথম দেখা হয় মিনা ও মিনালের। দুজনের চেহারা, নাক ও হাসির অদ্ভুত মিল নজর কাড়ে তাঁদের বন্ধুদের। বন্ধুরাই প্রথম তাঁদের এই সাদৃশ্যের বিষয়টি দেখিয়ে দেন।

সেদিনের স্মৃতিচারণ করে মিনা জানান, রাতের খাবারের পুরো সময় তিনি মিনালের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। পরদিন দুজন নিজেদের ফোন নম্বর ও ঠিকানা বিনিময় করেন। তখন তাঁদের কেউই ভাবেননি, এই পরিচয়ের আড়ালে রয়েছে জন্মসূত্রের গভীর সম্পর্ক।

এরপর শুরু হয় তাঁদের বন্ধুত্ব। চিঠিতে স্কুল, বন্ধু, ভ্রমণ, নাচ শেখা ও পছন্দের খেলা নিয়ে গল্প করতেন তাঁরা। সংগীত নিয়েও ছিল দুজনের মিল। এমনকি দুজনেরই প্রিয় ব্যান্ড ছিল ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ। চিঠিতে একে অপরকে ‘বোন’ বলেও সম্বোধন করতেন তাঁরা। অথচ সেই সম্বোধনের প্রকৃত অর্থ তখনো অজানা ছিল।

একসময় জীবনের ব্যস্ততায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাঁদের। মিনাল ফ্রান্সে চলে যান। অন্যদিকে, সদ্য মা হওয়ায় সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মিনা। এভাবেই কেটে যায় দীর্ঘ সময়।

ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল শিকড়ের সন্ধান

২০১৭ সালে ভারত থেকে দত্তক নেওয়া ব্যক্তিদের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে জানতে পারেন মিনা। নিজের জন্মপরিচয় ও শিকড়ের সন্ধানে তিনি পরীক্ষাটি করান। তবে তখন কাঙ্ক্ষিত উত্তর পাননি।

দীর্ঘ বিরতির পর চলতি বছরের ২০ মে মিনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাবে একটি বার্তা আসে। প্রেরক মিনাল। বার্তায় লেখা ছিল, ‘আমাকে মনে আছে?’

মিনালও নেদারল্যান্ডসে নিজের দত্তক বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছিলেন। সেই পরীক্ষার ফলাফল তিনি মিনাকে জানান। এরপর মিনা আবার পরীক্ষার ফলাফল দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট অ্যাপে প্রবেশ করেন।

৪৩ বছর বয়সী মিনা জানান, এতটাই নার্ভাস ছিলেন যে প্রবেশের সংকেত দিতে গিয়ে ১০ বার ভুল করেছিলেন। পরে ফলাফল দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যান। পরীক্ষায় তাঁদের ডিএনএর শতভাগ মিল পাওয়া যায়।

মিনা বলেন, ফলাফল দেখে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। মিনাল ছিলেন তাঁর জীবনের হারিয়ে যাওয়া সেই অংশ, যার জন্য তিনি এত দিন অপেক্ষা করছিলেন। ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে বোন বলে ডাকলেও ডিএনএ পরীক্ষার ফল তাঁদের সম্পর্কের সত্যতা নিশ্চিত করে।

অন্যদিকে, ৪৪ বছর বয়সী মিনালও প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিনার ছবি দেখে তাঁর কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। বহু বছর আগে পরিচিত সেই কিশোরীই যে তাঁর নিজের বোন, তা বুঝতে পেরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।

‘মনে হলো, ঘরে ফিরে এসেছি’

আগস্টের এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে আবারও দেখা হয় দুই বোনের। তবে এবার তাঁরা আর শুধু পুরোনো বন্ধু নন—পরস্পরের হারিয়ে যাওয়া আপনজন।

তিন সন্তানের মা মিনা বলেন, অনুভূতিটি ছিল অসাধারণ। তাঁর মনে হয়েছিল, যেন ঘরে ফিরে এসেছেন। বছরের পর বছর তাঁরা দুজনই মনের ভেতর একটি শূন্যতা অনুভব করেছেন। এখন সেই শূন্যতা অনেকটাই দূর হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

প্রথমবারের মতো বোন হিসেবে দেখা হওয়ার দিন তাঁরা একসঙ্গে সেলফিও তোলেন। বর্তমানে মিনাল ফ্রান্সে তাঁর সঙ্গী ও দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন। আর মিনা বেড়ে উঠেছেন নেদারল্যান্ডসের একটি ছোট গ্রামে। তাঁর দত্তক বাবা-মা একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। কয়েক বছর আগে তাঁর বাবা মারা গেছেন। মা এখনো সেই গ্রামেই থাকেন।

নিজের জন্মপরিচয় জানতে ২০০৩ সালে, ১৯ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের সেই অনাথ আশ্রমে গিয়েছিলেন মিনা। সঙ্গে ছিলেন তাঁর দত্তক বাবা-মা ও গোয়া থেকে দত্তক নেওয়া ভাই। দুই সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন নথি খুঁজেও জৈবিক বাবা-মা সম্পর্কে কোনো তথ্য পাননি তাঁরা।

মিনা বলেন, কোথা থেকে এসেছেন, তা জানা তাঁর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু অনাথ আশ্রম কর্তৃপক্ষ তাঁকে কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

এবার একসঙ্গে শিকড়ের খোঁজে

ডিএনএ পরীক্ষায় সম্পর্ক নিশ্চিত হওয়ার পর এখন নিয়মিত একে অপরের খোঁজ রাখেন দুই বোন। কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেন তাঁরা। কথায় কথায় সময়ের হিসাব ভুলে যান। পরে মনে পড়ে, সন্তানদের স্কুল থেকে আনতে হবে কিংবা বাজারে যেতে হবে।

তবে নিজেদের জন্মপরিচয়ের অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি। দুই বোনের ইচ্ছা, একদিন একসঙ্গে ভারতে যাবেন, মুম্বাইয়ের রাস্তায় হাঁটবেন এবং নিজেদের শিকড়ের সন্ধান করবেন।

মিনার আক্ষেপ, জীবনের কঠিন সময়ে তাঁরা দুজনই একাকিত্ব অনুভব করেছেন। বাবাকে হারানো কিংবা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার মতো মুহূর্তে মনের কথা বলার মতো কাউকে প্রয়োজন হয়েছিল। অথচ তখন তাঁরা জানতেন না, পরস্পরের পাশে থাকার মতো একজন আপন বোন তাঁদের জীবনেই রয়েছেন।

আগে থেকে সত্যটি জানা থাকলে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করা যেত, কঠিন সময়ে একে অপরকে সাহায্য করা যেত—এমনটাই মনে করেন মিনা।

দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব যে শেষ পর্যন্ত রক্তের সম্পর্কের পরিচয় এনে দেবে, তা কল্পনাও করেননি দুই বোন। ডিএনএ পরীক্ষার একটি ফল তাঁদের জীবনের হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের দরজা খুলে দিয়েছে। এখন তাঁদের সামনে নতুন স্বপ্ন—একসঙ্গে শিকড় খুঁজে পাওয়া এবং হারানো সময়ের শূন্যতা ভালোবাসা দিয়ে পূরণ করা।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles